
|
হাফেজ নুরুল হকের আলাপচারিতায় জামিয়া পটিয়ার আকাবির
প্রকাশ:
০৭ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:৩৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| খন্দকার মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ || আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার প্রাঙ্গণ থেকে বহু দূরে, মরুভূমির দেশ কাতারে মাওলানা হাফেজ নুরুল হক সাহেবের বসবাস দীর্ঘদিনের। কিন্তু তাঁর সঙ্গে যখনই কোনো আলাপ জমে, অবধারিতভাবেই সেখানে পটিয়া মাদরাসার প্রসঙ্গ চলে আসে। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনেও তাঁর মনটা যেন এখনো সেই জামিয়ার সবুজ চত্বরেই পড়ে আছে। হযরতের সঙ্গে আমার যতোবারই কথা হয়, তার সিংহভাগ জুড়ে থাকে জামিয়া পটিয়ার সেই বরেণ্য মুরব্বিদের স্মৃতিচারণ। তাঁদের তাকওয়া, গভীর ইলম, দ্বীনদারি আর আমানতদারির সেসব গল্প যখন হযরতের মুখ থেকে শুনি, তখন মনে এক গভীর হাহাকার জাগে। মনে হয়, আমরা কত বড় বড় দ্বীনি ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে ফেলেছি! আমাদের নিজেদের অযোগ্যতার কারণেই হয়তো তাঁদের থেকে আমরা যথাযথ ফায়দা হাসিল করতে পারিনি। আমার আফসোসের কথা কী আর বলবো, খোদ হাফেজ সাহেবও মনে করেন যে, সময়ের অনেক আগেই আমরা এই অভিভাবকতুল্য মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলেছি। শুধু পটিয়া নয়, দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী কিংবা দারুল উলুম দেওবন্দের মুরব্বিদের গল্পগুলোও তিনি এমনভাবে করেন যে, সব আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কথায় কথায় বর্তমানে জামিয়া পটিয়ার নবনিযুক্ত মহাপরিচালক মাওলানা ইকরাম হোসাইন ওয়াদুদী সাহেব হাফিযাহুল্লাহর দায়িত্বভার গ্রহণের বিষয়টিও উঠে আসে। এ নিয়ে ছাত্র বা সাধারণ মানুষের মধ্যে যে কিছুটা কানাঘুষা চলছে, সে বিষয়েও হযরত অবগত। এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে তিনি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেওবন্দের আদর্শের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘দারুল উলুম দেওবন্দের ‘দস্তুরে আমল’ বা নিয়ম হলো শুরার মাধ্যমে মুহতামিম নির্বাচন করা। শুরা যাকে উপযুক্ত মনে করে দায়িত্ব দেবে, তাকেই নিঃসংকোচে মেনে নেওয়া সবার কর্তব্য। মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বা নেজাম বজায় রাখার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।’ অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মাওলানা হাফেজ নুরুল হক সাহেব আমাদের আকাবিরদের উদারতার একটি চমৎকার দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমাদের পূর্বসূরিদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দ্বীনি বিষয়ে ছিল অটুট ঐক্য। তাঁরা একে অন্যকে কেবল সহযোগিতা করতেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রে নিজের উপর অন্যকে প্রাধান্য দিতেন—যা বর্তমান সময়ে ভাবাও কঠিন। আকাবিরদের সেই আদর্শিক ঐক্যের একটি অনন্য উদাহরণ দিতে গিয়ে হাফেজ নুরুল হক সাহেব দেশভাগের সময়কার এক অবিস্মরণীয় ঘটনার কথা শোনালেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের উত্তাল সময়ে হযরত মাওলানা কারী তৈয়ব সাহেব রহ. ছিলেন মুসলিম লীগের সমর্থক, মুসিলিম লীগের অবস্থান ছিল আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে, এবং দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানে চলে আসেন। এই কারণে ভারত সরকার তাঁর নাগরিকত্ব পর্যন্ত বাতিল করে দিয়েছিল। অন্যদিকে, শায়খুল ইসলাম মাওলানা সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর অবস্থান ছিল অখণ্ড ভারতের পক্ষে। ভারত সরকারে তাঁর ছিল ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তি। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য তাঁদের ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাবোধে বিন্দুমাত্র চিড় ধরাতে পারেনি। মাওলানা মাদানী রহ. তাঁর সেই রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে কারী তৈয়ব সাহেব রহ.-কে পাকিস্তান থেকে সসম্মানে ভারতে ফিরিয়ে আনেন এবং তাঁর নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, শুরার মাধ্যমে তাঁকে পুনরায় দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মনোনীত করার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে, আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও দ্বীনি স্বার্থে এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কে আকাবিররা কতটা উদার ও মহানুভব ছিলেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে হযরত বলেন, "কোনো ব্যক্তি কেবল বড় আলেম হলেই যে তিনি মুহতামিম হওয়ার যোগ্য হবেন, এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। প্রশাসনিক যোগ্যতা এবং দ্বীনি প্রজ্ঞা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।" এই প্রমাণের জন্য তিনি জামিয়া পটিয়ার ইতিহাসের দিকে আলোকপাত করেন। জামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মুফতি আজিজুল হক রহ. তাঁর জীবদ্দশাতেই হযরত হাজি ইউনুস সাহেব রহ.-কে মুহতামিম হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। অথচ সেই সময়ে পটিয়া মাদ্রাসায় হাজি সাহেব হুজুর রহ.-এর চেয়েও বড় বড় ইলমি ব্যক্তিত্ব বা আলেম উপস্থিত ছিলেন। যেমন হযরত মাওলানা আহমদ (ইমাম সাহেব) রহ., হযরত আমির হোসাইন (মীর সাহেব) রহ. এবং হযরত ওবায়দুর রহমান (নায়েব সাহেব) রহ.—যিনি বর্তমানে পটিয়ার শিক্ষক মাওলানা কারী আব্দুল্লাহ সাহেবের আব্বা এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার (হাবিবুল্লাহ) নানা শ্বশুর। আরো ছিলেন হযরত মাওলানা ইসহাক গাজী রহ., হযরত মাওলানা দানিশ সাহেব রহ., হযরত মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব রহ., মাওলানা আলী আহমদ খিলী রহ.সহ আরো অনেক বড় বড় আলেম ছিলেন জামিয়া পটিয়ায়। এই বরেণ্য আলেমরা কেবল বড় আলেমই ছিলেন না, বরং তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন ছিলেন বড় মাওলানা সাহেব (মাওলানা জমির উদ্দিন) রহ.-এর খলিফা এবং মুফতি সাহেব রহ.-এর পীরভাই। আবার কেউ ছিলেন শায়খুল হিন্দ রহ.-এর শাগরিদ। আমি যখন কৌতূহলবশত বললাম যে, নায়েব সাহেব রহ. যে এত বড় আলেম ছিলেন, সেটি তো বর্তমান সময়ে সেভাবে লোকমুখে চর্চিত নয়। তখন মাওলানা হাফেজ নুরুল হক সাহেব বললেন, "নায়েব সাহেব হুজুর অত্যন্ত উঁচু স্তরের আলেম ছিলেন। তিনি মুফতি সাহেব রহ.-এর জীবদ্দশায় পটিয়া মাদ্রাসায় 'আবু দাউদ শরিফ' পড়াতেন। ইলমি মহলে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, আবু দাউদ শরিফ পড়ানো বাস্তবিকভাবে বুখারি শরিফ পড়ানোর চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ও জটিল। মাওলানা হাফেজ নুরুল হক সাহেব পটিয়া মাদ্রাসার ইতিহাসের এক অনন্য ও শিক্ষণীয় অধ্যায় আমাদের সামনে তুলে ধরলেন। তিনি বললেন, ‘মজার ব্যাপার হলো, হযরত মুফতি আজিজুল হক সাহেব রহ.-এর জীবদ্দশাতেই নায়েব সাহেব হুজুর (মাওলানা ওবায়দুর রহমান রহ.) নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাধারণ যুক্তি ও নিয়ম অনুযায়ী তো মুফতি সাহেবের পরে নায়েব সাহেবেরই মুহতামিম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মুফতি সাহেব হুজুর রহ. নিজেই সেই প্রথা ভেঙে হযরত হাজি ইউনুস সাহেব রহ.-কে মুহতামিম হিসেবে মনোনীত করলেন।’ এতে নায়েব সাহেব কিছুই মনে করলেন না। তিনি সবসময় মুফতি সাহেব রহ -এর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেন এবং পরামর্শ করে চলতেন। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, হাজি সাহেব রহ.-এর চেয়ে অনেক বড় বড় আলেম ও ব্যক্তিত্ব তখন মাদ্রাসায় উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কেউ কোনো প্রকার দ্বিমত পোষণ করেননি কিংবা বিন্দুমাত্র আপত্তি জানাননি। এটিই ছিল সেই যুগের মানুষের ইখলাস ও মুরব্বীদের প্রতি অবিচল আস্থা। এক বার্ষিক সভায় মুফতি সাহেব রহ. উপস্থিত সবার সামনে মুহতামিম হিসেবে হাজি সাহেব রহ.-এর নাম ঘোষণা করে দিলেন। পরবর্তীকালে গোটা বিশ্ববাসী দেখেছে যে, হাজি সাহেব রহ.-এর হাতের ছোঁয়ায় পটিয়া মাদ্রাসা শুধু নয়, বরং সারা বাংলাদেশের দ্বীনি ময়দানে আল্লাহ তায়ালা কত বড় বড় খেদমত নিয়েছেন। হযরত মাওলানা হাফেজ নুরুল হক সাহেব এ পর্যায়ে ইসলামী ইতিহাসের এক শাশ্বত উপমা টেনে পটিয়া মাদ্রাসার প্রশাসনিক কাঠামোর যৌক্তিকতা তুলে ধরলেন। তিনি বলেন, "খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসন আমল যদি আমরা লক্ষ্য করি, তবে দেখব সেখানে খলিফা নির্বাচনের পদ্ধতি সবসময় এক ছিল না। কখনো বিদায়ী খলিফা নিজেই যোগ্য কোনো ব্যক্তিকে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করে গিয়েছেন (যেমন হযরত আবু বকর রাযি. কর্তৃক হযরত উমর রাযি.-এর মনোনয়ন), আবার কখনো শুরার মাধ্যমে পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত হয়েছেন (যেমন হযরত উমর রাযি. পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য একটি শুরা বা পর্ষদ গঠন করে দিয়েছিলেন)।" তিনি যোগ করেন যে, জামিয়া পটিয়ার মুহতামিম নিয়োগের ইতিহাসও ঠিক এই সুন্নাহর আলোকেই পরিচালিত হয়েছে। কখনো আগের মুহতামিম তাঁর জীবদ্দশায় নিজের প্রজ্ঞা ও ইলহামের ভিত্তিতে কাউকে মনোনীত করেছেন, আবার কখনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুরা কমিটির মাধ্যমে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। সুতরাং, পদ্ধতি যেটাই হোক—তা যদি মুরব্বীদের মনোনয়ন বা শুরার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়, তবে তার প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখাই হলো দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বা 'নেজাম' রক্ষার মূল চাবিকাঠি। এই পর্যায়ে হযরত মাওলানা হাফেজ নুরুল হক সাহেব একটি হাদিস উল্লেখ করলেন: عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ رضي الله عنه قَالَ: دَعَانَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَبَايَعْنَاهُ، فَقَالَ فِيمَا أَخَذَ عَلَيْنَا: أَنْ بَايَعَنَا عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ، فِي مَنْشَطِنَا وَمَكْرَهِنَا، وَعُسْرِنَا وَيُسْرِنَا، وَأَثَرَةً عَلَيْنَا، وَأَنْ لاَ نُنَازِعَ الأَمْرَ أَهْلَهُ، إِلاَّ أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا عِنْدَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانٌ অনুবাদ উবাদাহ ইবনে সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী কারীম (সা.) আমাদের ডাকলেন এবং আমরা তাঁর কাছে বায়আত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করলাম। তিনি আমাদের থেকে যে বিষয়ে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো— ‘আমরা যেন নেতার কথা শুনি ও তাঁর আনুগত্য করি—আমাদের পছন্দ বা অপছন্দের অবস্থায়, কষ্টে বা স্বাচ্ছন্দ্যে এবং আমাদের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও। আর আমরা যেন (নেতৃত্ব বা শাসনের) কর্তৃপক্ষের সাথে বিবাদে লিপ্ত না হই বা বিদ্রোহ না করি; তবে তোমরা যদি তাদের মধ্যে প্রকাশ্য কুফরি দেখতে পাও, যে ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে (তবে ভিন্ন কথা)।’ (সহিহ বুখারি: ৭০৫৬, সহিহ মুসলিম: ১৭০৯) সংক্ষেপে মূল শিক্ষা— এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে বিশৃঙ্খলা রোধ এবং উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখার স্বার্থে শাসকের আনুগত্য করা ওয়াজিব, যতক্ষণ না তারা প্রকাশ্য কুফরিতে লিপ্ত হয়। তবে এই আনুগত্য কেবল বৈধ কাজের ক্ষেত্রে; অন্যায় বা নাফরমানির কাজে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। কিন্তু ব্যক্তিগত অসন্তোষ বা পার্থিব অভাব-অভিযোগের কারণে বিদ্রোহ করা বা ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়াকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। হাফেজ নুরুল হক সাহেবের মতে, হাজি সাহেব রহ.-কে এই গুরুদায়িত্বের জন্য নির্বাচন করাটা নিছক কোনো জাগতিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি ছিল নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক বিশেষ 'ইলহাম' বা ঐশ্বরিক ইশারা। হযরত তাঁর স্মৃতির ঝুলি খুলে আরও একটি ব্যক্তিগত ঘটনার কথা শোনালেন। তিনি বললেন, "মুফতি সাহেব রহ.-এর এক ব্যক্তিগত খাদেম একদিন আমাকে জানিয়েছিলেন যে, হযরত মুফতি সাহেব রহ. বছরের পর বছর ধরে শেষ রাতে তাহাজ্জুদের মোনাজাতে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করতেন। তিনি দোয়া করতেন যেন আল্লাহ তায়ালা নিজ কুদরতে মাদরাসার জন্য সঠিক ও উপযুক্ত মানুষটি চিনিয়ে দেন।" সেই দীর্ঘ ত্যাগের দোয়াই হয়তো আল্লাহ কবুল করেছিলেন এবং মুহতামিম হিসেবে হাজি ইউনুস সাহেবকে নির্বাচিত করার তাওফিক দান করেছিলেন। হাফেজ সাহেব অত্যন্ত বিশ্বাসের সাথে বললেন, ‘আল্লাহওয়ালা মানুষদের অন্তরে আল্লাহ তায়ালা সঠিক পথ প্রদর্শন করেন। তাঁদের হৃদয়ে ইলহাম ঢেলে দেন বলেই তাঁরা সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের কাঁধে সঠিক দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন।’ মাওলানা হাফেজ নুরুল হক সাহেব পটিয়ার ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনা আমাদের সামনে তুলে ধরলেন। তিনি বললেন, হযরত হাজি সাহেব রহ. ছিলেন একজন 'সাহেবে দিল' বা আধ্যাত্মিক হৃদয়ের মানুষ। তিনি অনেক দিন আগে থেকেই মনে মনে জামিয়া পটিয়ার পরবর্তী মুহতামিম হিসেবে ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান সাহেব রহ.-কে নির্বাচন করে রেখেছিলেন। কেবল মনে মনেই নয়, বরং তাঁকে নায়েবে মুহতামিমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও অর্পণ করেছিলেন। এবং সফরেও প্রায় সময় উঁনাকে সাথে নিয়ে যেতেন। মুফতি আব্দুর রহমান সাহেব রহ. ছিলেন অসামান্য কর্মঠ এক ব্যক্তিত্ব। হাফেজ সাহেবের ভাষায়, "তিনি একাই যেন হাজার জনের কাজ করতে পারতেন। ‘কিন্তু নিয়তির লিখন হয়তো ভিন্ন ছিল। তিনি বলেন, "হযরত মুফতি সাহেব রহ. ছিলেন অসামান্য যোগ্যতাসম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব। পটিয়া থেকে তাঁর বিদায় নেওয়া—সেটি স্বেচ্ছায় হোক কিংবা পরিস্থিতির চাপে, যেভাবেই আমরা দেখি না কেন—আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে যে, এই পুরো ঘটনার পেছনে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলার কোনো গূঢ় 'হেকমত' বা রহস্য লুকিয়ে ছিল। ইতিহাসের এমন বাঁক পরিবর্তনের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কখনো কাউকে সতর্ক করেন, কারো মর্যাদা বুলন্দ করেন, আবার কাউকে রূহানি উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেন। এমনকি কারো মাধ্যমে অন্য কোনো বৃহত্তর পরিসরে দ্বীনের বড় কোনো খেদমত গ্রহণ করেন। আবার এর বিপরীতে অবাধ্যতার কারণে কাউকে লাঞ্ছিতও করতে পারেন।’ তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নসিহত করলেন যে, যেহেতু আমরা আল্লাহ তায়ালার হেকমত সম্পর্কে অবগত নই, তাই এই ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে আমাদের কথা বলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারো পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার আগে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা জরুরি। হাফেজ সাহেবের মতে, "প্রায়োগিক ক্ষেত্রে আবেগের বশবর্তী হয়ে কারো পক্ষে-বিপক্ষে লেখালেখি করা, মিছিল-মিটিং বা আন্দোলন করা মোটেও সমীচীন নয়। যাদের ওপর মীমাংসার জিম্মাদারি বা দায়িত্ব আছে, তারা অবশ্যই আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। কিন্তু যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নেই, তারা যদি অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে যান, তবে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে এবং সমস্যা আরও জটিল রূপ ধারণ করে।" মাওলানা হাফেজ নুরুল হল সাহেব কোরআন মজিদের আয়াতটি পড়েন, وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ ‘হয়তো তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার হয়তো তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আসলে আল্লাহই (সবচেয়ে ভালো) জানেন, আর তোমরা জানো না।’ এই আয়াতের মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা রাখা। মানুষ হিসেবে আমরা অনেক সময় তাৎক্ষণিক আবেগ বা লাভের ওপর ভিত্তি করে কোনো কিছু ভালো বা মন্দ বিচার করি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই বিষয়টি আমাদের জন্য কী ফল বয়ে আনবে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই জীবনে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি এলে বা মনের মতো কিছু না ঘটলে ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রাখাই একজন মুমিনের পরিচয়। এটি আমাদের মানসিক প্রশান্তি দেয় যে, যা ঘটেছে তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ইতিবাচক রহস্য রয়েছে। কথায় কথায় আমি বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি প্রশ্ন তুললাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হযরত, বর্তমানে বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসায় ছাত্রদের মধ্যে মুহতামিমদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার এক ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার সুচিন্তিত মতামত কী?’ আমার প্রশ্ন শুনে হাফেজ সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর হলেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি মাদ্রাসার মুহতামিম নিয়োগ দেওয়া বা পরিবর্তন করার পূর্ণ দায়িত্ব ও এখতিয়ার কেবল শুরা কমিটির। শুরার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত এবং শিরোধার্য। সেই সিদ্ধান্ত কারও মনের মতো হোক বা না হোক, প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বা নেজাম অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে তা মেনে নেওয়া সবার জন্য অনিবার্য।’ আমি (হাবিবুল্লাহ) তখন হযরতকে আবার প্রশ্ন করলাম, ‘হযরত, বর্তমানে তো অনেক জায়গায় এমনও দেখা যাচ্ছে যে, পুরাতন শুরাকে পাশ কাটিয়ে কিছু মানুষ নিজেদের পছন্দমতো নতুন শুরা গঠন করে নিচ্ছে। একে আপনি কীভাবে দেখেন?’ হযরত মাওলানা হাফেজ নুরুল হক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘এটিও মোটেও সঠিক পদ্ধতি নয়। তবে প্রতিষ্ঠানের নেজাম বা স্থিতি রক্ষার খাতিরে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু বিষয় মেনে নিতে হয়। তবে আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, কেউ যেন ইচ্ছামতো শুরার গঠন পরিবর্তন করতে না পারে, সেজন্য আইন ও নীতিমালা আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। যারা নিয়ম অমান্য করবে, তাদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান থাকাও জরুরি।’ হযরত আরও একটি গভীর তাত্ত্বিক কথা বললেন যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুব প্রাসঙ্গিক। তিনি বললেন, ‘মনে রাখবে, ইলমি যোগ্যতা আর মুহতামিমের প্রশাসনিক যোগ্যতা—দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এই দুই গুণের সমন্বয় যদি একাধারে কারো মধ্যে পাওয়া যায়, তবে তা সোনায় সোহাগা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত খুব কম মানুষের মধ্যেই এই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটে।’ হাজি সাহেব রহ.-এর কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ইলমি ময়দানে হাজি সাহেব রহ. তাঁর সমসাময়িক অনেক উস্তাদের চেয়ে হয়তো পিছিয়ে ছিলেন। তিনি খুব একটা গুছিয়ে কথাও বলতে পারতেন না। আরবি, ইংরেজি কিংবা অন্য কোনো ভাষায় তাঁর তেমন কোনো বিশেষ পারদর্শিতা ছিল না। কিন্তু তাঁর সম্বল ছিল তাকওয়া, পরহেজগারি এবং আল্লাহর সঙ্গে এক গভীর রূহানি সম্পর্ক। তাঁর রিয়াজত আর মুজাহিদাই তাঁকে অন্য সবার চেয়ে উঁচুতে নিয়ে গিয়েছিল। এর বরকতেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর দ্বারা দ্বীনের এমন সব খেদমত নিয়েছেন, যা অনেক বড় বড় তুখোড় পণ্ডিতের দ্বারাও সম্ভব হয়নি।’ হাজি সাহেব রহ.-এর আধ্যাত্মিকতার প্রভাবে ইলমি জটিলতা কীভাবে কেটে যেত, তা বোঝাতে হাফেজ সাহেব একটি অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা শোনালেন। মাওলানা মুফতি মুজাফফর সাহেব রহ. তখন ছাত্র; তিনি হাজি সাহেব রহ.-এর কাছে 'শরহে বেকায়া' পড়তেন। ক্লাসে হাজি সাহেব হুজুর যখন কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করতেন, মুজাফফর সাহেব ঠিক বুঝতে না পেরে বারবার প্রশ্ন করতেন। একই ক্লাসে হাটহাজারীর মাওলানা হাবিবুল হক সাহেবও (রহ.) ছিলেন। তিনিও অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি মুজাফফর সাহেবকে বারবার ইশারা করতেন যেন কোনো প্রশ্ন না করা হয়। কিন্তু পরের দিনও যখন মুজাফফর সাহেব আবার প্রশ্ন শুরু করলেন, তখন ক্লাস শেষে মাওলানা হাবিবুল হকসহ কয়েকজন ছাত্র তাঁকে ধরে শাসন করলেন। তাঁরা বললেন, ‘তুই যদি হুজুরের ক্লাসে আর কোনো প্রশ্ন করিস, তবে তোকে আমরা পেটাবো! খবরদার, হুজুর যা বলছেন শুধু চুপ করে শুনে যাবি।’ মুজাফফর সাহেব তখন অসহায়ভাবে বললেন, ‘আমি তো বুঝতে পারছি না, তাই প্রশ্ন করছি।’ ছাত্ররা জবাব দিল, ‘না বুঝলেও চুপ করে থাকবি। রুমে গিয়ে একা কিতাব দেখবি, দেখবি সব বুঝে গেছিস’ মুফতি মুজাফফর সাহেব রহ. পরবর্তীকালে নিজেই স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, "সত্যিই তাই হতো! ক্লাসে হয়তো কিছু বুঝতাম না, কিন্তু রুমে গিয়ে কিতাব খুললেই সব জট খুলে যেত। এমনকি সেই বছর পরীক্ষায় শরহে বেকায়া কিতাবেই আমি সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছিলাম।’ এটিই ছিল হাজি ইউনুস সাহেব রহ.-এর রূহানিয়াতের বরকত। আলাপের এই পর্যায়ে এসে হযরত মাওলানা হাফেজ নুরুল হক সাহেব মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী রহ.-এর একটি বিখ্যাত ফারসি শের আবৃত্তি করলেন। তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই আবৃত্তি পুরো পরিবেশকে এক আধ্যাত্মিক আমেজে ভরিয়ে দিলো— داد او را قابلیت شرط نیست بلک شرط قابلیت داد اوست উচ্চারণ: ক্বাবিলিয়াত দাদে উরা শর্ত নীস্ত, বালকে শর্তে ক্বাবিলিয়াত দাদে উস্ত। অনুবাদ ও ব্যাখ্যা: হযরত শেরটির মর্মার্থ বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, "আল্লাহর দান বা অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য মানুষের নিজস্ব কোনো যোগ্যতা পূর্বশর্ত নয়; বরং আল্লাহর দান বা অনুগ্রহই হলো মানুষের যোগ্যতা লাভের একমাত্র শর্ত।" অর্থাৎ, আল্লাহ যাকে পছন্দ করেন, তাকে তিনি নিজ দয়ায় যোগ্য বানিয়ে নেন। পটিয়ার সেই মনিষীদের জীবনে এই সত্যটিই বারবার প্রতিফলিত হতে দেখেছি। আলাপের এ পর্যায়ে আমি আলোচনাকে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে নিয়ে এলাম। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের বিভিন্ন অদূরদর্শী লেখালেখি নিয়ে হযরত হাফেজ নুরুল হক সাহেবের অভিমত জানতে চাইলাম। হযরত কিছুটা বিষণ্ন কণ্ঠে বললেন, "ব্যক্তিগতভাবে আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব একটা সময় দেই না। তবে কওমি মাদ্রাসা বা দ্বীনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর থাকলে আমার আহলিয়া আমাকে সেগুলো দেখান। সেখানে আমাদের ছাত্রদের বিভিন্ন নেতিবাচক ও সমালোচনামূলক পোস্ট দেখে আমার খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় মনে হয়, তারা ভালোর চেয়ে মন্দই বেশি করছে।" তবে তিনি সবাইকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করতে চাইলেন না। তিনি যোগ করলেন, "অবশ্যই অনেক ছাত্র আছেন যারা খুব চমৎকার ও গঠনমূলক লেখেন, আমি তাঁদের আন্তরিকভাবে মোবারকবাদ জানাই। কিন্তু যারা অহেতুক সমালোচনায় মেতে থাকেন, তাঁদের প্রতি আমার সবিনয় প্রশ্ন—আপনারা কী লিখছেন এবং কেন লিখছেন? এই লেখার দ্বারা দ্বীনের ফায়দা কতটুকু আর ক্ষতিই বা কতটুকু, তা কি একবারও ভেবে দেখেছেন?" তরুণ প্রজন্মের কলম সৈনিকদের প্রতি নসিহত করে হাফেজ সাহেব বলেন, "বিশেষ করে যে বিষয়টি আপনার দায়িত্বের পরিধির মধ্যে পড়ে না, তা নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা না করাই শ্রেয়। বরং ইতিবাচক বিষয় নিয়ে লিখুন। নিজের আসাতিজায়ে কেরাম বা মুরব্বীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন এবং তাঁদের সাথে পরামর্শ করে তবেই কোনো বিষয়ে কলম ধরুন। অফলাইনে বা সরাসরি তাঁদের সাথে সম্পর্ক যত গভীর হবে, আপনার লেখায় তত বেশি পরিপক্কতা আসবে।" আলাপচারিতার একদম শেষ প্রান্তে এসে হযরত হাফেজ নুরুল হক সাহেব অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মোনাজাতের সুরে বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাঁর দ্বীনের প্রকৃত খাদেম হিসেবে কবুল করে নিন। আমাদের প্রতিটি কাজ যেন কেবল তাঁরই সন্তুষ্টি বা রেজামন্দি হাসিলের জন্য হয়। আমিন।’ লেখক: আলেম, লেখক, অনুবাদক ও চিন্তক জেডএম/ |