
|
মাদরাসা মানেই পেটানোর জায়গা, বিষয়টি এমন নয়
প্রকাশ:
০৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:১৪ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
মুফতি এনায়েতুল্লাহ নরসিংদী সদরে ৭ বছর বয়সী এক মাদরাসা শিক্ষার্থীকে বেত দিয়ে পেটানোর ঘটনায় শিক্ষক নাজমুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ভেলানগর জেলখানা মোড়ে এলাকার মাদরাসাতুল আবরার এরাবিয়া মাদ্রাসায় এ ঘটনা ঘটে। মাদরাসাটি ভাড়া নেওয়া ভবনে অবস্থিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী পেটানোর ঘটনা নতুন নয়। স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটে। তবে তুলনামূলকভাবে প্রচার বেশি পায় মাদরাসা শিক্ষার্থী পেটানোর ঘটনা। এর ফলে জনসাধারণের মাঝে একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে, মাদরাসা মানেই পেটানোর জায়গা, মাদরাসার শিক্ষক মানেই নির্দয় মানুষ। তার কোনো দয়ামায়া নেই, থাকতে পারে না। তাদের কাজই ছাত্র পেটানো। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন, শুধু মাদরাসা নয় স্কুল-কলেজেও কিছু শিক্ষক বিবেকহীনভাবে নানা কারণে শিক্ষার্থীদের পেটায়। ‘শিক্ষকের লাঠির আঘাতে ছাত্রের চোখ নষ্ট,’ ‘শিক্ষকের বেত্রাঘাতে শিক্ষার্থী রক্তাক্ত, ছাত্রদের বিক্ষোভ, অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেপ্তার,’ ‘ছাত্রকে পিটিয়ে আহত, শিক্ষক গ্রেফতার’ ও ‘প্রধান শিক্ষকের বেতের আঘাতে স্কুলছাত্রীর মৃত্যু’- এ জাতীয় খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে আসে। ছাত্র জীবনে আমিও পিটান খেয়েছি। আমার ফেসবুকে অনেক মেধাবী ও সফল শিক্ষার্থী আছেন তারাও একটু-আধটু পিটান নিশ্চয়ই খেয়েছেন। কিছু শিক্ষকের শাসন ছিলো মানুষ হওয়ার জন্য, এবং সেটা কাম্য। কিন্তু শাসন মানে গরু পেটানো নয়, অপমানজনক কথা কিংবা গালি নয়। প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই এক-দুইজন পাগলা শিক্ষক থাকেন, তারা পেটানোর উস্তাদ। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে তাদের কোনো সাফল্য নেই। পরে বড় হয়ে এমন দুই-একজন শিক্ষকের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ওই শিক্ষক পরিবারের অশান্তির ঝাল স্কুলের শিক্ষার্থীর ওপর ঝাড়তেন। এখনও যে এমন হয় না, তা হলফ করে বলার সুযোগ নেই। লেখার শুরু যে ঘটনা দিয়ে, ওই মাদ্রাসাটি আবাসিক এবং ভবন ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হয়। বলতে দ্বিধা নেই, গণমাধ্যমে কিংবা লোকমুখে যেসব মাদরাসা শিক্ষার্থী পেটানোর খবর আসে কিংবা আমরা পাই, এর বেশিরভাগই মাদরাসা ভাড়া ভবনে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ মাদরাসাগুলো ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। এখন প্রশ্ন হতে পারে, ভাড়া ভবনে মাদরাসা পরিচালনার সঙ্গে শিক্ষার্থী পেটানোর কী মিল রয়েছে? বলছি সেটাই। প্রথম কথা হলো, ভাড়ায় চালিত মাদরাসাগুলোর সঙ্গে এলাকার জনসম্পৃক্ততা থাকে খুব কম। কোনো কার্যকর কমিটি থাকে না, তা পরিচালিত হয় পরিচালকের ইচ্ছামাফিক। সঙ্গত কারণে খরচ কমানোর জন্য শিক্ষক নিযোগ দেওয়া হয় কম বেতনে, আবার এক শিক্ষককে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, শিক্ষক নিয়মিত ছুটি পান না। এমন নানা কারণে শিক্ষকরা বিরক্ত হলে তার ঝাল ছাত্র পিটিয়ে তুলেন। হ্যাঁ, আমি শক্তভাবেই বলছি, আপনি খোঁজ নিন; দেখুন। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী পেটানো ও নির্যাতনসহ অস্বস্তিকর যা কিছু ঘটে, এর বেশিরভাগই ভাড়ায় চালিত মাদরাসায় ঘটে। সত্যিকারের কওমি মাদ্রাসায় এ জাতীয় ঘটনা খুব একটা ঘটে না। হলেও এর হার অনেক কম। ওই যে বললাম, তাদের জবাবদিহিতার জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। পরিচালক নিজ ইচ্ছায় মাদরাসার শিক্ষক নিয়োগ-বিয়োগ করেন, পরিচালনা বিধি নির্ধারণ করেন। অনেকটা মুদি দোকান চালানোর মতো করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালান। কিন্তু ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটলে এর পুরো দায়ভার আসে মাদরাসার ওপর। মানুষ বাঁকা কথা বলে, গালি দেয় মাওলানাদের-হুজুরদের। একসময় অভিভাবকরা স্কুলে কিংবা মাদরাসায় তার সন্তানদের নিয়ে বলতেন, ‘গোশত আপনার, হাড় আমার।’ এই বাক্যের মাধ্যমে বুঝানো হতো, সন্তানকে মানুষ করতে তাকে শাস্তি দিয়ে হলেও করতে হবে। আর এটা নিয়ে সমাজে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ছিল না। বরং কোনো শিক্ষার্থী স্কুল কিংবা মাদরাসায় কোনো অন্যায়ের কারণে শাস্তি খেলে সে বাড়িতে গোপন রাখত। কেননা, অভিভাবকরা স্কুলে-মাদ্রাসায় শাস্তি পেয়েছে শুনলে তারাও শাস্তি দিত। তবে এটা ঠিক শিক্ষকদের ওপর অভিভাবকদের আস্থা-বিশ্বাস এত দৃঢ় ছিল যে, নিশ্চয়ই তার সন্তান অন্যায় বা ভুল করার কারণেই শিক্ষক শাস্তি দিয়েছে। কখনোও কোনো অভিভাবক তার সন্তানকে কেন শাস্তি দেওয়া হলো- তার জবাবদিহীতা শিক্ষকদের কাছে চায়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা আর যাতে অনুরূপ অন্যায় বা ভুল না হয় সেদিকে সচেষ্ট থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেত। ইতোমধ্যে পৃথিবীর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শিখন-শেখানোর নবতর ধ্যান-ধারণার প্রচলন হওয়ায় বিশ্বব্যাপী আওয়াজ উঠেছে শাস্তি শিশুশিক্ষার পরিপন্থী। এর পর খবর আসতে থাকে, শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়ার কারণে অনেক অভিভাবক শিক্ষকদের ওপর চড়াও হচ্ছেন। এভাবেই শাস্তি আস্তে-ধীরে উধাও হওয়ার পথে। আমি মনে করি, অন্যায় বা ভুলের বিবেচনায় শাস্তি থাকা উচিৎ। যেই শাস্তি তাকে পরোক্ষভাবে ইতিবাচক উন্নতি করতে পারে। তাহলে করণীয় কী? ** মাদরাসা নির্বাচনের বিষয়ে সতর্ক থাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড দেখলেই সেখানে সন্তানকে ভর্তি না করা। ** শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। ** শিক্ষার্থীর কোনো অন্যায়ের জন্য মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে জানানো। নিজে সিদ্ধান্ত না নেওয়া। ** শিক্ষার্থীর মেধা, মনোযোগ, আচার-আচরণ ইত্যাদি কোনো অভিযোগ থাকলে- তা সরাসরি অভিভাবককে জানানো। ** সবচেয়ে বড় কথা, যার ধৈর্য্য কম, শিক্ষার্থী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না- এমন লোকদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না দেওয়া। ** যেহেতু মাদরাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় পুরো দায়ভার আলেমসমাজের ওপর আসে, তাই নেতৃস্থানীয় আলেমদের বিশেষ করে মাদরাসার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসা। লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক আরএইচ/ |