
|
সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়নে কী ভাবছেন কওমি মুরব্বিরা?
প্রকাশ:
০৫ এপ্রিল, ২০২৬, ০১:১৪ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| জহির উদ্দিন বাবর ||
কওমি সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়নের বিষয়টি অনেকটা কওমি কর্তৃপক্ষের কারণেই আটকে আছে। যারা কওমি মাদরাসার নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারাই মূলত এ ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেননি। ২০১৮ সালে যখন সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় তখন কওমি মুরব্বিদের দাবি ছিল, কোনো ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবেন না। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে এই দাবি মেনেই স্বীকৃতি দেয়। যেহেতু স্বীকৃতি কার্যকর করতে হলে সরকারি হস্তক্ষেপের একটা প্রশ্ন আসে, এজন্য শুরু থেকেই কওমি কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে তেমন কোনো তৎপরতা দেখায়নি। আনুষ্ঠানিক একটি স্বীকৃতি ঘোষণা হয়েছে, এটাতেই তারা তৃপ্ত-এমনটা আঁচ করা গেছে বিভিন্ন সময় তাদের সঙ্গে কথা বলে। যেহেতু যারা কওমি মাদরাসাগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের নিজেদের স্বীকৃতির তেমন কোনো প্রয়োজন নেই, সুতরাং তাদের মধ্যে এই স্বীকৃতি বাস্তবায়নের গরজও কম লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু যাদের জন্য এই স্বীকৃতি, সেই ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে এই স্বীকৃতি নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে যখন এই স্বীকৃতি ঘোষণার পরও তারা কোথাও কোনো সুবিধা পাননি তখন পুরোই হতাশ হয়েছেন। এই হতাশা ও ক্ষোভের বিষয়টি আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেতেও দেখেছি। শিক্ষার্থীদের দাবি ও চাপের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আল-হাইয়্যাতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের পক্ষ থেকে একটি চিঠি নিয়ে একটি প্রতিনিধি দল শিক্ষাসহ কয়েকজন উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিল। প্রতিনিধি দল দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃত সনদের কার্যকারিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশসেবা ও উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টার সহযোগিতা কামনা করে। তারা সরকারের সব মন্ত্রণালয়সহ সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সনদের মান কার্যকর করার জন্য প্রজ্ঞাপন জারিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানায়। কওমি সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়নে কিছু জটিলতা শুরু থেকেই চলে আসছে। সরকার শুধু দাওরায়ে হাদিসকে স্বীকৃতি দিয়েছে, নিচের স্তরগুলোকে স্বীকৃতি দেয়নি। সরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করলে শুধু মাস্টার্সের সার্টিফিকেট দিলেই হয় না, নিচের স্তরগুলোর সার্টিফিকেটও প্রদান করতে হয়। কিন্তু যেহেতু কওমিপড়ুয়াদের নিচের স্তরের কোনো সার্টিফিকেট নেই এজন্য তারা কোথাও আবেদন করতে পারেন না। সরকারি স্বীকৃতি কার্যকর করতে চাইলে এই সমস্যার সমাধান সবার আগে করতে হবে। কিন্তু কওমি কর্তৃপক্ষ নিচের স্তরের স্বীকৃতির ব্যাপারে সম্মত হতে পারেনি। অনেকেই মনে করেন, এভাবে স্বীকৃতি কার্যকর করলে কওমি মাদরাসার পরিণতি আলিয়া মাদরাসার মতো হবে। কওমিপড়ুয়ারা শেষ পর্যন্ত এখানে থাকবে না। সরকারি স্বীকৃতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলে কওমি মাদরাসা যে আলিয়া মাদরাসার মতো পরিণতি হতে পারে সেই শঙ্কা শুরু থেকেই করা হচ্ছে। মুরব্বিদের অনেকেই এজন্য কওমি সনদের স্বীকৃতির পক্ষেই ছিলেন না। এ কারণেই মুরব্বিদের একটি বড় অংশ এখনো মনে করেন, শুধু দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতি পর্যন্তই ঠিক আছে, স্কুল-কলেজ ও আলিয়ার সঙ্গে মিল রেখে সব স্তরে স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই। কেননা এটা বাস্তবায়ন করতে গেলে কওমি শিক্ষার কারিকুলামে হাত দিতে হবে। এখানে অনেক কিছু রদবদল করা লাগবে। দারুল উলুম দেওবন্দের যে উসুলে হাশতেগানা বা অষ্টমূলনীতি আছে সেটা থেকে বিচ্যুত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে কওমি মাদরাসা তার স্বকীয়তা ও আদর্শ হারাবে। কওমি সনদকে রাতারাতি স্কুল-কলেজ বা আলিয়া মাদরাসার সনদের সমতুল্য করা যাবে না। আর এটা করা উচিতও হবে না। তবে এই সনদ দিয়ে নিজেদের গণ্ডির ভেতরে থেকে, আদর্শ ও স্বকীয়তা বিসর্জন না দিয়ে কোথায় কোথায় কীভাবে সুবিধা নেওয়া যায় সেটা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। দাওরায়ে হাদিসের সনদের স্বীকৃতি যখন দেওয়া হয় তখন কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেওয়া হয়নি। শুধু ইসলামিক স্টাডিজ ও অ্যারাবিকে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ ও অ্যারাবিকে পড়াশোনা করে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়, কওমি শিক্ষার্থীরাও সেটা পাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সেই দুই বিষয়ের সুবিধাও কওমিপড়ুয়ারা পাচ্ছেন না। এই জটিলতা কীভাবে কাটানো যায়, সেটা সরকারের সঙ্গে কওমি কর্তৃপক্ষ আলোচনা করতে পারে। এই সনদ দিয়ে প্রাসঙ্গিক আর কোন কোন জায়গায় কওমি শিক্ষার্থীরা চান্স পেতে পারেন সেটা নিরূপণ করা যেতে পারে। যেমন সরকারি মসজিদের ইমাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন পদ, বিয়ের কাজী, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর ধর্মীয় শিক্ষক, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক এসব পদে কওমিপড়ুয়ারা উপযুক্ত হতে পারেন। এছাড়া এই সনদ যেন দেশে-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রহণযোগ্য হয় সেটাও নিশ্চিত করা যেতে পারে। পুরোপুরি না হোক, অন্তত নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখে কোন কোন জায়গায় কওমিপড়ুয়ারা তাদের ন্যায্য অধিকারটুকু হাসিল করতে পারে- এটা নিয়ে বেফাক-হাইয়্যাসহ বিভিন্ন বোর্ডের কর্তৃপক্ষকেই ভাবতে হবে। সুযোগ থাকার পরও এ ব্যাপারে না ভাবলে অবশ্যই আগামী প্রজন্ম সংশ্লিষ্টদের ক্ষমা করবে না।
|