
|
আমরা গাজায় যা করেছি, লেবাননেও তাই করব: ইসরায়েলি কর্মকর্তা
প্রকাশ:
০৪ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:৪৬ রাত
নিউজ ডেস্ক |
একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তার এই মন্তব্য শুধু হুমকি নয়, বাস্তবতার ইঙ্গিতও বহন করছে। লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে গাজার পুনরাবৃত্তি; প্রথমে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ, তারপর মুহূর্তের মধ্যে আবাসিক ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া। নিহত হচ্ছেন চিকিৎসক ও উদ্ধারকর্মীরা, লুটপাটের অভিযোগ উঠছে সেনাদের বিরুদ্ধে, ধ্বংস হচ্ছে সেতু-সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এক মাসেই নিহতের সংখ্যা ১২০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ১২০ জনের বেশি শিশু। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। এই অভিযান যদি চলতেই থাকে, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে; এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। গাজা ও পশ্চিম তীরের অভিজ্ঞতা বলছে, দখল করা ভূখণ্ড ফেরত না দিয়ে ধীরে ধীরে বসতি স্থাপন ও সংযুক্তির পথে হাঁটার ঝুঁকি রয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন এতটাই স্পষ্ট যে, একের পর এক পশ্চিমা রাষ্ট্রও অবস্থান বদলাচ্ছে। আইসল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলায় সমর্থন দিয়েছে, যেখানে গাজায় গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এমনকি জার্মানির মতো দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্রও শেষ পর্যন্ত তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, লেবাননের মাটিতে চলমান সহিংসতা ও সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন কী বলবে? এর বড় অংশ নির্ভর করছে লেবানন শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যোগ দেয় কি না, অথবা অন্তত এর বিচারিক এখতিয়ার গ্রহণ করে কি না। ফিলিস্তিন ২০১৫ সালে আইসিসির সদস্য হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের আওতায় তাদের লড়াই নতুন মাত্রা পায়। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, এমনকি গণহত্যার অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার একটি কাঠামো তৈরি হয়। এর ফলাফল হিসেবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োআভ গ্যালান্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। লেবাননের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো আইনি কাঠামো এখনো কার্যকরভাবে সামনে আসেনি। আন্তর্জাতিক মহলে সহানুভূতি থাকলেও, জবাবদিহির প্রশ্নটি আলোচনার কেন্দ্রে নেই। এর একটি বড় কারণ, লেবানন নিজেই এখনো আন্তর্জাতিক আইনের সব পথ ব্যবহার করেনি। ২০২৪ সালের এপ্রিলে লেবাননের মন্ত্রিসভা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। তারা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দেয়, ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার গ্রহণের ঘোষণা দিতে। ইসরায়েলের হাতে সাংবাদিক ইসাম আবদাল্লাহ নিহত হওয়া এবং বেসামরিক মানুষের ওপর সাদা ফসফরাস ব্যবহারের অভিযোগের প্রেক্ষাপটেই এই উদ্যোগ। কিন্তু মে মাসেই সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই থেমে যায় প্রক্রিয়াটি। এই মুহূর্তে আইসিসিতে যোগ দেওয়া বা অন্তত এর এখতিয়ার মেনে নেওয়া লেবাননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত, এটি যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসবে। এতে ইসরায়েলি বাহিনী হোক বা লেবাননের অভ্যন্তরীণ কোনো গোষ্ঠী; সব পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের সুযোগ তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, লেবাননের সাধারণ নাগরিকদের জন্য এটি একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে, যেখানে তারা প্রমাণ জমা দিতে পারবে, ন্যায়বিচারের দাবি তুলতে পারবে। তৃতীয়ত, বারবার সীমান্ত লঙ্ঘন ও সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লেবাননের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে আগ্রাসনের শামিল হতে পারে। আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র বর্তমানে ১২৫টি। এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হলে লেবানন তার কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারবে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে যেমন বহু দেশ আইসিসিকে সমর্থন দিয়েছে, তেমনি লেবাননের ক্ষেত্রেও সমর্থনের পরিসর বাড়তে পারে। সবশেষে, এটি প্রতীকী কিন্তু শক্তিশালী বার্তা দিতে সক্ষম। কেননা লেবানন আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করে এবং জবাবদিহির পক্ষে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে অবস্থান নেয়, সেখানে লেবাননের এই পদক্ষেপ তাকে ভিন্ন এক নৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস সম্প্রতি বলেছেন, গাজায় যা ঘটেছে, তা বিশ্বের আর কোথাও ঘটতে দেওয়া যাবে না। আইসিসি কোনো ‘জাদুর কাঠি’ নয়। এটি যুদ্ধ থামাতে পারে না, শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। কিন্তু এটি জবাবদিহির পথ খুলে দিতে পারে; যেটির অভাবই অনেক সময় আরও সহিংসতাকে উসকে দেয়। এই বাস্তবতায়, লেবাননের জন্য এখনই সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পথে হাঁটার। এটি শুধু একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি ন্যায়বিচারের ঘোষণা। জেডএম/
|