
|
মহিলা মাদরাসা: নিশ্চিত হোক বিতর্কহীন পথচলা
প্রকাশ:
০৪ এপ্রিল, ২০২৬, ০১:৪৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| জহির উদ্দিন বাবর || বাংলাদেশে কওমি মাদরাসার সূচনা প্রায় সোয়া’শ বছর আগে। কিন্তু এর মহিলা শাখার আনুষ্ঠানিক যাত্রা অনেক পরে। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে বাংলাদেশে প্রথম মহিলা মাদরাসার সূচনা হয়। ফলে এদেশে কওমি মাদরাসার ছাত্র শাখা যতটা বিস্তৃত হয়েছে ততটা হয়নি ছাত্রী শাখা। তবে গত প্রায় চার দশকে মহিলা মাদরাসার একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। সারাদেশে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার মহিলা মাদরাসা। লাখ লাখ নারী এখানে দীনি ইলম হাসিল করছেন। এমনকি বেফাকসহ অন্যান্য বোর্ডগুলোর পরীক্ষায় মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি। দিন দিন এই সংখ্যা শুধু বাড়ছেই। একটা সময় ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরও পড়ুন: কওমি সিলেবাসে ‘সিরাত’ অবহেলার শিকার হওয়া বেদনাদায়ক: মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন মহিলা মাদরাসার এই যে বিকাশ, এটা শুধু মাদরাসা শিক্ষার জন্যই নয়, দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও ইতিবাচক দিক। একটি শিক্ষিত ও আদর্শ জাতি গঠন করতে হলে নারী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী যেখানে নারী সেখানে তাদের অশিক্ষিত রেখে জাতিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। আপনার সন্তানকে যদি যোগ্য ও আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা করেন, তাহলে অবশ্যই আপনার স্ত্রীকে শিক্ষিত হতে হবে। আর শিক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকতার কোনো বিকল্প নেই। কেউ কেউ হয়ত তাদের মেয়েদের পারিবারিক পরিমণ্ডলে রেখেই শিক্ষা-দীক্ষার পক্ষে। কিন্তু বাস্তবে এটা পুরোপুরি সম্ভব নয়। তাছাড়া সবার পরিবারে সেই ব্যবস্থাপনাও নেই। ফলে মহিলা মাদরাসা বিকাশের কোনো বিকল্প নেই। মহিলা মাদরাসার সূচনালগ্নে এটার প্রয়োজন এবং বৈধতা নিয়ে কারও প্রশ্ন ছিল। তবে দিন যত গড়াচ্ছে ততই মহিলা মাদরাসার সংখ্যা বাড়ছে। ফলে এর প্রয়োজনীয়তা বা বৈধতা নিয়ে এখন আর খুব বেশির প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। এখন বরং এটাকে কীভাবে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা যায়, এই শিক্ষাব্যবস্থাকে কীভাবে শরিয়তসম্মত উপায়ে পরিচালিত করা যায় সেটা নিয়েই ভাবা উচিত। আমাদের জানামতে, দেশের সিংহভাগ আলেম-উলামা এখন মহিলা মাদরাসার পক্ষেই। তবে মহিলা মাদরাসার পরিবেশ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে অনেকের। সেই প্রশ্নগুলো উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। এজন্য কীভাবে সেই প্রশ্নের সমাধান বের করা যায় সেটা নিয়েই কর্তৃপক্ষের ভাবা উচিত। মহিলা মাদরাসার প্রসঙ্গ সামনে এলে মোটাদাগে যে অভিযোগটা প্রথমে উঠে সেটা হচ্ছে- এর পরিবেশ। বেশির ভাগ মহিলা মাদরাসার পরিবেশ খুবই ঘিঞ্জি। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় গড়ে ওঠা শত শহ মহিলা মাদরাসার বেশির ভাগেরই পরিবেশ সন্তোষজনক নয়। সেখানে অনেকটা মানবেতর জীবনযাপন করেন ছাত্রীরা। খুপড়ি খুপড়ি কামরায় গাদাগাদি করে ছাত্রীদের সেখানে পড়াশোনা করতে হয়। বেশির ভাগ মাদরাসাই আবাসিক। অথচ আবাসিক ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক নয়। যেহেতু নারীদের পক্ষে খোলামেলা পরিবেশে বের হওয়ার সুযোগ নেই, ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে আবদ্ধ জায়গায়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অবস্থান করতে হয়। এটা একদিকে তাদের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির যেমন কারণ তেমনি মানসিক বিকাশেও এর প্রভাব পড়ে। আজকের যে ছাত্রীটি আবদ্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে উঠছে আগামীতে সেই ছাত্রীটিই মা হবে। সুতরাং সেই প্রভাব তার সন্তানের ওপরও পড়াটা স্বাভাবিক। আর এটা হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর। বেশির ভাগ মহিলা মাদরাসায় পুরুষ শিক্ষক পড়ান। এতে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অভিযোগ ওঠে। এর কোনোটি সামনে আসে, কোনোটি অভ্যন্তরীণভাবেই মিটমাট হয়ে যায়। এ ধরনের অভিযোগ যাতে না উঠে সে ব্যাপারে প্রতিটি মাদরাসার কর্তৃপক্ষকে সজাগ থাকতে হবে। মহিলা মাদরাসায় মহিলা শিক্ষিকাদের দ্বারা পড়ানোই বেশি উপযোগী। সেটা না হলে অন্তত বয়স্ক উস্তাদ বেছে নিতে হবে। তারাও পর্দার আড়ালে থেকে পড়াতে হবে। প্রয়োজনে মেয়েদের কাছে একজন নারী শিক্ষিকা উপস্থিত থাকবেন। এটা অনেকটা মাদরাসায় করা হচ্ছে এবং এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে। বেশির ভাগ মহিলা মাদরাসা বাণিজ্যিক চিন্তা থেকে গড়ে উঠছে বলে অভিযোগ আছে। বিশেষ করে রাজধানীসহ শহরের মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ জোরালো। সাধারণত বাড়ি ভাড়া নিয়ে অল্প জায়গায় অধিক ছাত্রী রাখা হয়। কোথাও কোথাও মুহতামিম পরিবার নিয়ে সেই মাদরাসার কয়েকটি কামরা দখল করে থাকেন। একদিকে ছাত্রীদের কাছ থেকে খরচ নেওয়া হয় বেশি, অন্যদিকে তাদের সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। মাদরাসার মুহতামিমের টার্গেট থাকে বেশি পরিমাণে লাভ করা। আবার সেখানে শিক্ষিকা হিসেবে নেওয়া হয় নিজ পরিবারের নারী সদস্যদেরই। তাদের যোগ্যতা যতটুকুই থাকুক। তাছাড়া নারী শিক্ষিকাদের বেতন দেওয়া হয় খুবই সামান্য। যা দিয়ে সত্যিকারের কোনো প্রয়োজনই তারা পূরণ করতে পারেন না। যেহেতু নারীরা সাধারণত স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল, এজন্য অনেকটা বাধ্য হয়ে, বেকার বসে থাকার চেয়ে কিছু একটা কাজে নিয়োজিত থাকার জন্য মহিলা মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। এসব অভিযোগ যে ঢালাওভাবে সব সত্য তেমনটা না। তবে কিছু কিছু অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এজন্য এমন কোনো অভিযোগ যেন না উঠে সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। মহিলা মাদরাসাগুলোর মূল সমস্যা হলো, এসব মাদরাসা নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। নামকাওয়াস্তে বোর্ডগুলো তাদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করে। কিন্তু এসব মাদরাসার সার্বিক পরিবেশ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। এমনকি ছেলেদের মাদরাসার পড়াশোনাসহ সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে বেফাকসহ অন্যান্য বোর্ডগুলো যতটা আন্তরিক, মহিলা মাদরাসার ক্ষেত্রে এর সিকিভাগও চোখে পড়ে না। অনেকটা অভিভাবকহীনতার মধ্যে বিকশিত হচ্ছে দেশের মহিলা মাদরাসাগুলো। নারী শিক্ষার সম্ভাবনাময় এই অঙ্গনটি যেন বিতর্কিত না হয়ে পড়ে সে ব্যাপারে জাতির নেতৃস্থানীয় আলেম-উলামাকে ভাবতে হবে। মহিলা মাদরাসাগুলো যেন সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকে সে উদ্যোগ নিতে হবে। লেখক: আলেম লেখক, সাংবাদিক ও সম্পাদক আইও/ |