প্রাথমিকে গানের  শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণায় ক্ষুব্ধ আলেমরা
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:৫৮ সকাল
নিউজ ডেস্ক

যাকারিয়া মাহমুদ

এদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। তাদের হৃদয়ে বরফের মতো জমাট বেঁধে থাকে ধর্মপ্রেম। দীনের জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েও অসংখ্যবার রোপণ করেছে তারা সে প্রেমের বীজ। তারপরও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র আমাদের এই সোনার বাংলা। এখানকার সভ্যতা-সংস্কৃতিতে, শিক্ষা ও শিল্পে, কর্ম ও অবসরে, সবকিছুতেই লেগে আছে—ইসলামি মূল্যবোধ বা মুসলিমদের ধর্মপ্রেম। যেহেতু এ-দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম, তাই এখানকার স্কুল-বিদ্যালয় থেকে নিয়ে করপোরেট অফিস-আদালত, সবকিছুই পরিচালিত হওয়া চাই ইসলামি রীতি মেনে।

কিন্তু সাম্প্রতিকালে দেশের বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্কুল-বিদ্যালয়গুলোতে নাচ ও গানের শিক্ষক নিয়োগের দুঃসংবাদ। এ-সংবাদের পর দেশের অভিভাবকদের অন্তরে জ্বলছে ব্যথার আগুন। চারদিকে শোনা যাচ্ছে অসন্তোষ ও উদ্বেগ নিংড়িত মন্তব্য। আলেমরা যেহেতু জনসাধারণের রাহবার, তাই তারা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করছেন নানাভাবে। স্যোশাল মিডিয়াজুড়ে এরই গুঞ্জন। রক্তের মতো ছোপছোপ ক্ষোভের দাগ!

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির, আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান বলেন, ধর্মপ্রাণ মুসলিম অভিভাবকদের অমতে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সঙ্গীত শিক্ষা চালু করলে তা মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করার নামান্তর।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই মন্তব্য করেন তারা। 

পাঠানো সেই বিবৃতিতে তারা বলেন, ইসলামে বাদ্যযন্ত্র অনুমোদিত নয় বিধায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে ঢালাওভাবে সঙ্গীত শিক্ষার বিষয়টি আপামর ধর্মপ্রাণ মুসলিম অভিভাবকদের কাছে প্রধানত একটি ধর্মীয় ইস্যু। তাই তাদের মতামত উপেক্ষা করে বিদ্যালয়ে গান-বাদ্য শেখানো হলে, তা মুসলিম শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করা ছাড়া কিছু নয়।

যদি এমন দাবি তোলা হয়, তাহলে তো সকল ধর্মের শিক্ষার্থীকেই ইসলাম শিক্ষা দিতে হবে!

এতদ্ব যুক্তি ভিত্তিহীন বিবেচনা করে তারা যা বলেন, তার সারকথা হলো, সব ধর্মের শিক্ষার্থীকে ইসলাম শেখানো যেমন যৌক্তিক নয়, তেমনি ধর্মীয় স্বাধীনতা বিবেচনায় সব ধর্মের শিক্ষার্থীকে গান শেখানোটাও অযৌক্তিক । এখানে মূলত ধর্মতাত্ত্বিক ইস্যু ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি জড়িত। অর্থাৎ যে যে ধর্মের তাকে সেটাই শেখানো শেখানো হোক। বিষয়টা সংস্কৃতিমন্ত্রীর বিবেচনায় নেয়া জরুরি। এমন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া নতুন সরকারের জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়।

যদি দাবি তোলা হয়, অনেক অভিভাবক তো এমনও রয়েছেন, যারা তাদের সন্তানকে গান শেখাতে আপত্তি নেই! উপরন্তু তারা এতে আগ্রহী!

এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নেতৃদ্বয় বলেন, সঙ্গীত শিক্ষার জন্য দেশে দেশে আছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। যারা সন্তানদের গান শেখাতে আগ্রহী, তারা ওখানে পড়াতে পারেন।

মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্মশিক্ষার গুরুত্ব প্রদানের লক্ষে নেতৃদ্বয় বলেন, সঙ্গীত শিক্ষা শিশু-কিশোরের জন্য আবশ্যক নয়। কিন্তু ইমানদার ও আদর্শ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠা অপরিহার্য। আর এর জন্যই ধর্মশিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। তাই স্কুল-বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগের ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। সকল আলেমের মনোবাসনা ও দাবিও এটা।

প্রাইমারি বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার অনুরূপ দাবি জানিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটি বলেছে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার বিকাশে প্রাথমিক স্তরে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

শুক্রবার (0৩ এপ্রিল) গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি শাইখুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী এই দাবি জানান।

একই রকম দাবি জানিয়ে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির ও শায়খে চরমোনাই মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, গানের শিক্ষক নয়, বরং ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ আজ সময়ের দাবি। প্রতিটি মুসলমানের জন্য দ্বীনি ইলম শিক্ষা করা ফরজ। আমাদের দেশে ৯২ শতাংশ মুসলমানের বসবাস, অথচ স্কুলগুলোতে  ফরজে আইন পরিমাণ জ্ঞানার্জনেরও ব্যবস্থা নেই। এ কাজ আঞ্জাম দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের।

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোত গানের শিক্ষক নিয়োগের কথা বলেন। তারপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে অভিভাবক ও আলেমগণের এসব ক্ষোভ ও মন্তব্য।

জেডএম/