কাশ্মীরি অ্যাকটিভিস্ট আসিয়া আন্দ্রাবির শাস্তি: একটি বিশ্লেষণ
প্রকাশ: ২৬ মার্চ, ২০২৬, ০৬:৫৮ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

||মুহাম্মাদ শোয়াইব ||

পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)-এর সভাপতি মেহবুবা মুফতি কাশ্মীরি হুরিয়ত নেত্রী আসিয়া আন্দ্রাবি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিসের তথ্যমতে, শ্রীনগরে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, একজন মানুষকে সারাজীবন কারাগারে রাখার মতো যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ধারণা বাতিল করা উচিত। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আসিয়া আন্দ্রাবি একজন বয়স্ক নারী এবং তিনি ইতোমধ্যে বহু বছর কারাগারে কাটিয়েছেন—তাই তার সাজা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
তিনি মানবিক কারণে আন্দ্রাবির প্যারোলে মুক্তির আহ্বান জানান। মুফতি বলেন, আমি অনুরোধ করছি, তার সাজা পুনর্বিবেচনা করা হোক। শর্তসাপেক্ষ হলেও তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া উচিত এবং তার দণ্ডাদেশ পুনরায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থার একটি বিশেষ আদালত জাতিসংঘ সনদের অধীনে জম্মু ও কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে ‘ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে বিবেচনা করে আন্দ্রাবিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
এর আগে, পিডিপি প্রধান একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে জনগণকে গাছ লাগানোর আহ্বানও জানান।

আসিয়া আন্দ্রাবির বিরুদ্ধে ভারতের পক্ষ থেকে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, সেগুলো মূলত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট। নিচে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রধান অভিযোগগুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো—
ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (NIA) এর তদন্ত অনুযায়ী, আন্দ্রাবি কাশ্মীরকে ভারতের থেকে আলাদা করার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন, যা ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ (Separatist Activities) লিপ্ত ছিলেন বলে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং গণভোট (plebiscite) দাবির পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। সেটাই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ রাষ্রে্ র বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে শামিল বলে গণ্য করেছে। অথচ কাশ্মীরের প্রায় সব রাজনৈতিক দল এই দাবি করে থাকেন।  যারা কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে একটিভিজম করেন তাদেরকে সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য ও সমর্থন UAPA আইনের মতো কঠোর আইনের অধীনে সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য (Section 38) সন্ত্রাসী সংগঠনকে সহায়তা (Section 39) সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্র (Section 18) নিয়োজিত ছিল বলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই আইনটাকে মূলত ব্যবহার করা হয় তাদের বিরুদ্ধে যারা কাশ্মীরের স্বাধীনতা অথবা ভারতীয় সংবিধানের 370 ধারা যেটি কাশ্মীরকে স্বায়ত্ব শাসনের ক্ষমতা প্রধান করে সেটি পুর্নবহাল করার দাবি তোলেন। 

সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও উস্কানি (Terror Funding & Incitement) দানে তিনি যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করা হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, তিনি ও তার সংগঠন বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা কাশ্মীরে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ব্যবহার করেছেন এবং জনগণকে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে উস্কানি দিয়েছেন। অবৈধ সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতা একটি অপরাধ। এবং এই অপরাধেও তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়।  তিনি Dukhtaran-e-Millat নামক একটি সংগঠনের প্রধান, যেটিকে ভারত সরকার নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি বিভিন্ন সময়ে এমন বক্তব্য দিয়েছেন যা সহিংসতা বা রাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবকে উসকে দিতে পারে।

এই অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে তাকে ভারতের কঠোর আইন, বিশেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় বিচার করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ভারতের সরকার ও তদন্ত সংস্থাগুলো তাকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে, কিছু কাশ্মীরি গোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংগঠন তাকে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বিবেচনা করে এবং তার বিরুদ্ধে মামলাগুলোকে বিতর্কিত বলে মনে করে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভারত সরকারের কঠোর আইন, বিশেষ করে UAPA (Unlawful Activities Prevention Act) এর ব্যবহার এবং মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। 
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অবস্থান 
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ভারত সরকারের ওপর UAPA আইনকে অপব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে এই আইন অসংলগ্নভাবে মানবাধিকার কর্মী, সমালোচক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে এবং তা মূল অধিকারকে ধ্বংস করছে।

সেই প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছেন: অধিকার রক্ষার্থে কাজ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করা উচিত; UAPA এর শর্তগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিধানের সঙ্গে মিলিয়ে সংশোধন করা দরকার।

 হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অবস্থান 
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বলেছে যে, UAPA ও অনুরূপ কঠোর আইন ভারতের মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রায়ই রাজনৈতিক মতভিন্নতা ও শান্তিপূর্ণ dissent (বিরোধ) কে দমন করতে ব্যবহার হচ্ছে।

তারা উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে UAPA ও অন্যান্য কঠোর আইন ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বাকস্বাধীনতা ও সুশৃঙ্খল বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের মন্তব্য

জাতিসংঘের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে UAPA ও কঠোর আইনের আওতায় নিপীড়িত মানবাধিকার কর্মী জনের অবিলম্বে মুক্তি দিতে এবং তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে বলেছে।
তাদের বক্তব্য ছিল, কর্তৃপক্ষ মানবাধিকার কর্মীকে দমন করা বন্ধ করে তাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করুক।

 এমএম/