প্রধানমন্ত্রী, নায়েবে আমির, জামায়াত ও উলামায়ে কেরাম: কিছু পর্যবেক্ষণ
প্রকাশ: ১৫ মার্চ, ২০২৬, ১২:৫৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| শায়খ মিসবাহ উদ্দীন মাদানী ||

প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমিরকে সম্মানিত করা এবং নায়েবে আমির কর্তৃক তৈলাক্ত বক্তব্য না দিয়ে সম্মানের সাথে দরকারি কথাগুলো বলে আসা– খুবই দারুণ ছিল। নায়েবে আমির সাহেব ৫ আগস্টের পরে তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে কঠিন সমালোচনা ও তাতে কিছুটা বাড়াবাড়ি ছিল বলে মনে হয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক শায়খে চরমোনাই মুফতী ফয়জুল করীম সাহেবকে সম্মানিত করা ঐক্যবদ্ধ জাতীয় শক্তি নির্মাণের ভাল অনুশীলন মনে করি। মুসলিম সমাজে পারস্পরিক সমালোচনা, নসিহত ও সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ থাকতে হবে, তবে তা যেন চরিত্র হনন ও পরিস্থিতিকে সম্পর্কের নো-রিটার্নিং পয়েন্টে নিয়ে না যায়। মনে রাখতে হবে আমরা মুসলমান, বিভিন্ন মতপার্থক্য এবং পারস্পরিক নসিহত-সমালোচনার পরও আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অন্যথায় আমাদের চূড়ান্ত শত্রুরা তার সুযোগ নেবে।

যাইহোক, উলামায়ে কেরামকে নিয়ে ইফতার আয়োজন ও ইমাম-মুআজ্জিনদের সম্মানিত করা এবং উল্লেখযোগ্য সব ধারার গ্রহণযোগ্য উলামায়ে কেরামকে কথা বলতে সুযোগ দেওয়া এবং তাদের মূল্যবান পরামর্শ গ্রহণে আন্তরিক প্রচেষ্টার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সত্যিই প্রশংসা ও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব, পীর সাহেব মধুপুরী সাহেব, শায়খ আহমদুল্লাহ সাহেব ও আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ সাহেবসহ অসংখ্য আলেমকে তিনি কাছে ডেকে এনে তাদের কথা ও নসিহতগুলো মন দিয়ে শোনার দৃশ্য একজন মুসলিম নাগরিক হিসেবে খুবই আনন্দের। আল্লাহ তায়ালা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার দল যেন বিরোধী দলকে সাথে নিয়ে ৯২% মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন তাওফিক দান করুন। আমিন।

জমিয়তকে বিএনপি সরকার দৃশ্যমান কোনো মূল্যায়ন করেনি, এটাও কিন্তু আগামী রাজনীতির হিসাব নিকাষে মন্দ প্রভাব ফেলবে। জমিয়তের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী সাহেবকে টেকনোক্রেট প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের কোনো পদ দিতে পারতেন। এই কৃতজ্ঞতা বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে ভবিষ্যতে উলামায়ে কেরামকে কাছে পেতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখত।

অন্যদিকে আরেকটা কথা বলতে চাচ্ছি, জামায়াতে ইসলামীর প্রতি উলামায়ে কেরামের অনেক অভিমান-অভিযোগ আছে। সেসব অভিযোগের সমালোচনা গঠনমূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে থাকা উচিত। জামায়াতে ইসলামীরও উচিত উলামায়ে কেরামের অভিযোগগুলোকে পাশ না কাটিয়ে গুরুত্ব দেওয়া। আন্তরিকভাবে নেওয়া। ৫ আগস্টের পরে জামায়াতে ইসলামী ও উলামায়ে কেরামের মধ্যে সম্পর্কের এত কঠিন অবনতি কাম্য ছিল না। এতে কার দায় কতটুকু নিরপেক্ষ পর্যালোচনা আসা উচিত। দিনশেষে উলামায়ে কেরাম আমাদের অভিভাবক। আবার জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোও উম্মাহর সম্পদ। তাদের অনেক কাজ ও ত্যাগ আছে, সুশৃঙ্খল শক্তিশালী সাংগঠনিক প্র্যাকটিস ও অবস্থান আছে। জোর করে তো কাউকে সমাজ থেকে নাই করে দেওয়া যাবে না, তাই ভুলত্রুটি থাকলে বেশি দূরত্ব না বাড়িয়ে সংশোধন ও সমন্বয় করে পথচলা ভাল। আবার কেউ পরামর্শ বা সমালোচনা গ্রহণ করতে না চাইলে জোর করার তো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ থেকে দূর মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমীন, ফিলিস্তিনের হামাস বা যেকোনো ভিন দেশের মুসলমানদের কোনো দীনি তৎপরতা ও সংগঠনের প্রতি আমরা যে উম্মাহ-দরদ ও ইসলামি ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টিতে তাকাই, সেরকম আমাদের দেশের জামায়াতে ইসলামীও নিজেদের মতো করে দ্বীনি প্রচেষ্টা পরিচালনাকারী একটা পুরাতন সংগঠন। জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আমার কিছু সুনির্দিষ্ট সবিনয় পরামর্শ আছে, যা টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন লেখায় লিখেছি, স্বতন্ত্র অন্য কোনো লেখায়ও লিখব, ইনশাআল্লাহ।

যাইহোক, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মাননা ভাতা প্রদান প্রোগ্রামের কথায় আসি। মাশাআল্লাহ! অনুষ্ঠানে নায়েবে আমিরের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সুনির্দিষ্ট। তিনটা দাবি সুস্পষ্ট, যা মূলত সমস্ত  আইম্মা ওলামার দাবি-

১| মিম্বারে কথা বলার স্বাধীনতা।

২| চাকরি থেকে অব্যাহতির সুনির্দিষ্ট নীতিমালা।

৩| চারিত্রিক সনদ যেন ইমামদের কাছে থেকেই নেওয়া হয়।

পাশাপাশি তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ভাতা দিয়ে যেন ইমামদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না হয় সে দাবিও তুলেছেন। বরাবরের মতো তার কথায় দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রতিফলন ছিল।

বিশ্রী লাগে কোনটা জানেন? কোনো আলেম বা দাঈ কর্তৃক ক্ষমতাসীনের তোষামোদী। উলামায়ে কেরাম ও সরকারের সম্পর্ক হবে– পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও নসিহতের সম্পর্ক।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তার একনিষ্ঠ গোলাম হিসেবে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব রক্ষা করে ইসলাম, দেশ ও জাতির সেবা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: প্রধান, আরবি ভাষা ও ইসলামি দাওয়াহ বিভাগ, জামিয়া আরাবিয়া জিরি মাদরাসা, চট্টগ্রাম

আইএইচ/