ইতিকাফের নিয়ম: ফাজায়েল ও মাসায়েল
প্রকাশ: ০৯ মার্চ, ২০২৬, ০৩:২৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| মুফতি আল আমীন বিন সাবের আলী ||

চলছে কোরআন নাজিলের মাস নেকি ও পুণ্য অর্জনের বসন্তকাল মাহে রমজান। রহমত ও মাগফেরাতের দশকগুলো পেরিয়ে আমরা এখন নাজাতের দশকের-শেষ দশকের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। যে দশকগুলো শুরু হলেই ঘোষণা করা হয়েছে, 'তোমরা রমাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রগুলোতে লাইলাতুল ক্বদর তালাশ কর।' (বুখারী, হা. ২০১৭)

যে রাত্রিতে ইবাদত করলে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'হাজার মাস (৮৩ বছর ৪মাস) ইবাতের সওয়াব আমলনামায় লেখা হয়।' (সূরাতুল ক্বদর, ৩)

আর এ রাত হাসিল করার সর্বোত্তম ব্যবস্থাপত্র হলো, রমজানের শেষ দশকগুলোতে (সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়া) ইতিকাফে বসে যাওয়া।

ইতিকাফ মানে হলো, অবস্থান করা বা অভিমুখী হওয়া। অর্থাৎ– দুনিয়াবী যাবতীয় ব্যস্ততাকে পাশে ঠেলে সওয়াবের নিয়তে (পুরুষরা) মসজিদে অবস্থান করা –যে মসজিদে জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা হয়– বা  (মহিলারা) ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা। (রদ্দুল মুহতার ২/৪৬৯)

বুযুর্গরা বলে থাকেন, ইতিকাফ হলো, বিছানা নিয়ে আল্লাহর রহমতের দরজায় অবস্থান করা। কেমন যেন বান্দার দাবি, আয় আল্লাহ। আপনি যতক্ষণ মাগফিরাত না দিবেন। আমি আপনার দরজা থেকে যাবো না। অনেকটা– দাবি আদায়ে অনশন বা অবরোধ করার মতো।

 

ইতিকাফের নিয়ম

সার্বিক পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা অর্জন করে বিছানাপত্র (যতটুকু না হলেই নয়, অন্যের দ্বারস্থও হতে হয় না) সঙ্গে নিয়ে ২০ রমজান বেলা ডুবার আগে মসজিদে ঢুকতে হয়। কারণ, ইতিকাফের সময় শুরু হয় ২০ তারিখ বেলা ডুবার সাথে সাথে। আর শেষ হয় ২৯ তারিখ, যদি ঈদের চাঁদ দেখা যায়। যদি এদিন চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে ৩০ তারিখ যখন বেলা ডুববে, তখন। সেদিন আর চাঁদ দেখতে হবে না।

 

ইতিকাফের ফজিলত

১। ইতিকাফ শিআরে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত একটি মাসনূন আমল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর এ দিনগুলোতে ইতিকাফ করতেন, তাই একে সুন্নত ইতিকাফ বলা হয়। (আবু দাউদ, হা. ২৪৬৩)

ইতিকাফের ফযিলত সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে,

২। ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইতিকাফকারীর ব্যাপারে বলেছেন,

'ইতিকাফকারী গুনাহকে প্রতিরোধ করেন। ইতিকাফকারীকে সকল নেক আমলকারীর ন্যায় নেকী দেয়া হবে।' (ইবনে মাজাহ, ১৭৮১)

৩। তাবারানী (৭৪২০), হাকিম (৪/২৬৯) ও বায়হাকী (৩/৪২৪) ইবনে আব্বাস রা. থেকে হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন ইতিকাফ করে আল্লাহ্‌ তার মাঝে ও জাহান্নামের আগুনের মাঝে তিনটি পরিখার দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন; যা পূর্ব-পশ্চিমের চেয়েও বেশি দূরত্ব।'

৪। ইতিকাফকারী অত্যন্ত পবিত্র ও গোনাহমুক্ত পরিবেশে থাকে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এখানে তার অবস্থানটিই এক ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। তাই সে অবসর সময়ে কোনো আমল না করলেও দিনরাত তার মসজিদে অবস্থান করাটাই ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। কেমন যেন সর্বাবস্থায় তার জন্য ইবাদতের মিটার চালু করে দেয়া হয়। সুবহানাল্লাহ!

৫। দুনিয়ার জীবন ব্যস্ততাবহুল। জীবনের সকল অনুষঙ্গই এমন, যা মানুষের ধ্যান ও চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, স্বপ্ন, কর্ম, লক্ষ্য ইত্যাদি বহু বিষয় মানুষকে শতধা-বিক্ষিপ্ত করে রাখে। তাই সহজেই সুযোগ হয় না পরকালীন জীবন নিয়ে ভাবার; কিংবা একান্ত মনোযোগের সাথে ইবাদতে মগ্ন হওয়ার। ইতিকাফ সেই সুযোগকেই অবারিত করে। বান্দাকে আল্লাহর জন্য নিবেদিত হতে সাহায্য করে।

৬। ইতিকাফের মাধ্যমে রোযার যাবতীয় হক ও আদাব রক্ষা করার তাওফীক হয়।

 

ইতিকাফকারীর জন্য করণীয়-বর্জনীয়

যতক্ষণ মসজিদে থাকবে অজুর সাথে থাকার চেষ্টা করবে। মসজিদের আদব পূর্ণ রক্ষা করে চলবে। বেহুরমতি হয় এমন কোনো কাজ, খাবার ইত্যাদি গ্রহণ না করা। অহেতুক গল্প-গুজব, কথাবার্তা, উচ্চস্বরে কথাবার্তা, ঝগড়াঝাটিসহ মুখের যাবতীয় গুনাহ ইত্যাদি পরিহার করা। অযথা চুপচাপ বসে না থেকে তাসবিহ-তাহলিল, জিকির আজকার, কোরআন তেলাওয়াতে মগ্ন থাকবে। তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত, যাওয়াল, আওয়াবীন সহ নফল নামাজগুলোতে মনোযোগী হবে। এছাড়াও সালাতুল হাজত, সালাতুশ শোকর, সালাতুত তওবা, সালাতুত তাসবিহ আদায়ের চেষ্টা করবে। বিশেষ করে ফরজ নামাজগুলো তাকবীরে উলার সহিত আদায়ের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে।

 

কিছু জরুরি মাসায়ালা

১। ইতিকাফ অবস্থায় শরয়ী ওজর ছাড়া মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। যেমন, শুধু পেশাব করার জন্য বা বড় ইস্তিঞ্জা (পায়খানা) করার জন্য বের হওয়া যায়।

২. খাবার পৌঁছানোর জন্য কেউ না থাকলে, খাবার নিয়ে আসার জন্য যেতে পারবে।

৩. যদি কারো পেটের গ্যাসে খুব চাপ আসে, মসজিদের ভিতরে ছাড়া যাবে না। নাজায়েয। মসজিদের বাহিরে গিয়ে ছাড়তে হবে।

৪. জুমু‘আর গোসল ও ফরয গোসলের জন্য বাহিরে বের হওয়া যাবে। কিন্তু অন্য কোনো গোসলের জন্য বাহিরে যাওয়া যাবে না। নফল গোসল করার অনুমতি আছে যদি অজু করতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময়ের ভেতরে গোসল সারতে পারে। তাহলে ইতিকাফও নষ্ট হবে না।

৫. জানাযার নামায পড়ার জন্য বের হতে পারবে না।

৬. এই ইতিকাফ সহীহ হওয়ার জন্য রোযা শর্ত। আল্লাহ না করুক। কোনো কারণে ইচ্ছাধীন বা ইচ্ছার বাহিরে রোযা ভেঙ্গে যায় তাহলে ইতিকাফও ভেঙ্গে যাবে।

৭. মহল্লার কিছু লোককে সুন্নতে মুয়াক্কাদা ইতিকাফ করতেই হবে। তাহলে সবাই গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে। যদি কেউ না করে তাহলে সবাই গুনাহগার হয়ে যাবে।

৮. চিকিৎসার জন্য বের হওয়া যাবে না।

৯. রোগী দেখতে বা নিজের পিতা অসুস্থ তাকে দেখতে বাহিরে বের হওয়া যাবে না। বের হলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।

১০. মামলার তারিখ পরেছে। বের হওয়া যাবে না। বের হলে সুন্নত ইতিকাফ বাতিল হয়ে যাবে। সুন্নত ইতিকাফ বাতিল হয়ে গেলে তা নফল ইতিকাফ হয়ে যাবে। –রমাযান: একটি মহিমান্বিত মাস।

 

লক্ষ্যণীয় কিছু বিষয়

১। কারো যদি রোযা ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে সুন্নত ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যায় তাহলে রমাযানের পরে কোনো এক সময় রোযা রাখবে একদিন এবং একদিন ইতিকাফ করবে। একদিন নফল রোযা রাখবে বা এই রোযার কাযা রাখতে পারে। রোযা রেখে মসজিদে একদিন ইতিকাফ করবে। শুধু যেই দিনের রোযা ভেঙ্গেছে ঐ দিনের কাযা করতে হবে।

২। ইতিকাফের আরো দুটি প্রকার রয়েছে,

(ক) নফল ইতিকাফ। রমযানের শেষ দশকে পূর্ণ দশ দিনের কম ইতিকাফ করা। অথবা বছরের অন্য যেকোনো সময় যতক্ষণ ইচ্ছা, ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা।

(খ) ওয়াজিব ইতিকাফ। মান্নতকৃত ইতিকাফ এবং সুন্নত ইতিকাফ ফাসেদ হয়ে গেলে তার কাযা আদায় করা। উক্ত ইতিকাফের জন্যও রোযা শর্ত।

লেখক: পরিদর্শক, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক)

আইএইচ/