রোজা এলো বিধ্বস্ত গাজায়, চারদিকে বেদনা ও হাহাকার
প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৪৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

দুই বছর ধরে দখলদার ইসরায়েলি বর্বরতার সাক্ষী ফিলিস্তিনের গাজায় ধ্বংসস্তূপ ও চরম খাদ্য সংকটের মাঝেই পবিত্র রমজান মাসকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয়রা। স্বজন হারানোর বেদনা ও শত কষ্ট ও দুর্দশা ভুলে রমজান উপলক্ষে গাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের তাঁবুতে চলছে সাধ্য অনুযায়ী বিভিন্ন আয়োজন।  

মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী ক্যাম্পের একটি ছোট তাঁবুতে পরিবার নিয়ে বাস করেন মাইসুন আল-বারবারাউই নামে এক ফিলিস্তিনি নারী। তিনি জানান, পবিত্র মাসের আগমন উপলক্ষে ক্যাম্পের বাসিন্দারা কাপড়ের তৈরি তাঁবুগুলোতে সাধারণ সাজসজ্জর ব্যবস্থা করেছেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি তার নয় বছর বয়সী ছেলে হাসানকে একটি ছোট লণ্ঠন কিনে দিয়েছেন।

মাইসুন বলেন, ‘আমার সামর্থ্য সীমিত, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাচ্চারা যেন খুশি থাকে... আমি চেয়েছিলাম এই সাজসজ্জাগুলো যুদ্ধের সময় গত দুই বছর ধরে আমাদের সাথে থাকা শোক ও বিষণ্ণতার পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায় হোক’।

৫২ বছর বয়সী এবং দুই সন্তানের মা মাইসুনকে সবাই উম্মে মোহাম্মদ নামে চেনে- আল জাজিরাকে তিনি আরও বলেন, ‘আমার বড় ছেলের বয়স ১৫ বছর, আর ছোট ছেলের বয়স নয় বছর। ওরা আমার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। গত রমজানে একই সাথে দুর্ভিক্ষ এবং যুদ্ধ ছিল। আগের দুর্ভিক্ষের সময় আমি আমার সমস্ত টাকা খরচ করে ফেলেছিলাম। সেই সময় আমার ছোট ছেলে খাবারের জন্য আকুল হয়ে মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করত। কল্পনা করতে পারো?’

আলজাজিরা জানায়, গাজার অন্যান্য ফিলিস্তিনিদের জন্যও এবারের রমজান মাস গত দুই বছরের চেয়ে একটু আলাদা। গত ১০ অক্টোবর থেকে চলমান যুদ্ধবিরতির কারণে উপত্যাকাটি তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে।

আগের দুই বছরের রমজানে চরম পরিস্থিতি ও দুর্দশার কথা স্বরণ করে মাইসুন বলেন, ‘পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত নয়, সবাই জানে যুদ্ধ সত্যিই থামেনি; এখনও মাঝে মাঝে গোলাগুলি চলছে। কিন্তু গত দুই বছরের যুদ্ধের তীব্রতার তুলনায় পরিস্থিতি সহনীয়।’

রমজানের প্রথম দিনে মাগরিবের আযানের আগে শরণার্থী ক্যাম্পের কেন্দ্রীয় রান্নাঘরে ইফতারের জন্য রুটি তৈরিতে সাহায্য করার সময় আল জাজিরাকে মাইসুন বলেন, ‘এটা আমাদের তৃতীয় রমজান, যা বাস্তুচ্যুতির মধ্যে কাটিয়েছি। আমরা আমাদের ঘরবাড়ি, পরিবার এবং অনেক প্রিয়জনকে হারিয়েছি। কিন্তু এখানে ক্যাম্পে, আমাদের প্রতিবেশী এবং বন্ধুবান্ধব আছে যারা একই রকম যন্ত্রণা ও কষ্ট ভাগ করে নেয় এবং আমরা সবাই সামাজিকভাবে একে অপরকে সমর্থন করতে চাই।’

আক্ষেপ নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শূন্য থেকে জীবন এবং আনন্দ তৈরি করার চেষ্টা করছি। রমজানও ঈদ আসে এবং যায়, কিন্তু আমাদের পরিস্থিতি একই থাকে।’

রমজানের প্রথম দিনে, তিনি এখনও সিদ্ধান্ত নেননি যে তিনি তার পরিবারের জন্য কী রান্না করবেন, কারণ সীমিত সামর্থ্যের কারণে সামান্য ও সাধারণ খাবারই খেতে পারে তার পরিবার।

এদিকে পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথে দুই বছরের যুদ্ধের পর গাজার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রীয় বাজার আল-জাওইয়া মার্কেটে নতুন করে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। তবে সেখানেও খাদ্য পণ্যের সরবরাহ প্রয়োহনের তুলনায় অনেক কম এবং দামও অনেক বেশি, যা বেশিরভাগ গাজাবাসীর ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। এছাড়াও গাজার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনও মৌলিক চাহিদা মেটাতে মানবিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) জানিয়েছে,  যুদ্দবিরতির পর আগের সময়ের তুলনায় নির্দিষ্ট কিছু খাদ্য সামগ্রীর প্রাপ্যতার তুলনামূলক উন্নতি হয়েছে। তবে ইসরায়েলি বাধার কারণে গাজায় ত্রাণসহ অনান্য সামগ্রী প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য ও ধীর গতিতে প্রবেশ করেছে।

হানান আল-আত্তার নামে আরেক ফিলিস্তিনি নারী রমজানের প্রথম দিনে তিনি একটি ত্রাণ সংস্থা থেকে একটি খাবারের প্যাকেট পেয়েছিলেন। প্রশস্ত হাসি দিয়ে প্যাকেটটি খুলে, সে এর ভেতরে থাকা জিনিসপত্রগুলো দেখে তিনি উতচ্ছসিত ছিলেন। প্যাকেটের মধ্যে ফাভা বিনস, হালুয়া, খেজুর, তাহিনি, তেল, মসুর ডাল, বিনস, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পনির, মর্টাডেলা ছিল।

সন্তান এবং নাতি-নাতনি সহ ১৫ জন পরিবারের সদস্যের সাথে একটি তাঁবুতে বসবাসকরী হানান বলেন, ‘আজ, আল্লাহকে ধন্যবাদ, আমরা সাহায্য পেয়েছি। এতে আমরা কী দিয়ে ইফতার করব তা নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা কমবে।’

প্রথম ইফতারের জন্য মাংসের কিমা এবং ভাত দিয়ে আলুর ট্রে তৈরি করার জন্য গোপনে অল্প কিছু টাকা আলাদা করে রেখেছিলেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি আগামীকাল এক কেজি মাংস কিনতে অল্প পরিমাণ সঞ্চয় করেছি। রোজা রাখার জন্য প্রোটিনের প্রয়োজন।’সূত্র: আলজাজিরা

এনএইচ/