ইসলামী আন্দোলনের তৃণমূলে হতাশা ও ক্ষোভ!
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৪২ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

||বিশেষ প্রতিনিধি||

এবারের নির্বাচনের আগে তুমুল আলোচনায় ছিল পীর সাহেব চরমোনাই নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি দল নিয়ে ঐক্য করার পেছনে দলটির মুখ্য ভূমিকা ছিল। ইসলামপন্থীদের ভোট একবাক্সে আনতে জোর চেষ্টা ছিল দলটির। এজন্য অতীতের সব তিক্ততা ভুলে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করতেও প্রস্তুত ছিল দলটি। তবে শেষ মুহূর্তে আসন সমঝোতাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বনিবনা না হওয়ায় নির্বাচনী ঐক্য থেকে বেরিয়ে যায় ইসলামী আন্দোলন। আড়াই শতাধিক আসনে দলটির প্রার্থীরা এককভাবে হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করেন। 

এককভাবে নির্বাচন করলে খুব বেশি সুবিধা করা যাবে না-সেটা আগেই মাথায় ছিল ইসলামী আন্দোলনের। তবে আদর্শগত কারণ এবং জামায়াতের হঠকারিতার কারণে দলটি শেষ পর্যন্ত অনেকটা বাধ্য হয়ে এককভাবে নির্বাচন করে। তাদের প্রত্যাশা ছিল, এককভাবে নির্বাচন করলেও দুই চার পাঁচটি আসনে বিজয়ী হওয়া সম্ভব। তবে নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেল, মাত্র একটি আসনে জয় পেয়েছে হাতপাখা। অন্য যে কয়টি আসনে বিজয়ী হয়ে আসার প্রত্যাশা করা হচ্ছিল, সেগুলোতে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এমনকি যতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার কথা ছিল, সেটাও অনেক জায়গায় সম্ভব হয়নি।

এদিকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল করতে না পারায় ইসলামী আন্দোলনের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকটা হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। কেউ কেউ বলছেন, ঐক্যটা ধরে রাখতে পারলে অনেক বেশি ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হতো। অনায়াসে ১০/১৫টি আসনে জিতে আসা যেতো। দেশের অন্যতম বৃহৎ দলে পরিণত হওয়ার পরও একটি মাত্র আসনে সন্তুষ্ট থাকা উচিত নয়। তবে দলের নেতারা বলছেন, এবারের নির্বাচনে দল তার আদর্শগত জায়গায় সটান দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে। সাময়িক ক্ষতি হলেও এর সুফল ভবিষ্যতে মিলবে।

ইতোমধ্যে এবারের নির্বাচনে কোন দল কত শতাংশ ভোট পেয়েছে এর পরিসংখ্যান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সেখানে দেখা যায়, ইসলামী আন্দোলন ২.৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। দলটির জন্য আগের যেকোনো নির্বাচনের চাইতে এটি বেশি। তবে এবার যে প্রত্যাশা ছিল সেটার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। আর এতেই মূলত দেখা দিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ। 

ঢাকা-৫ আসনে হাতপাখার প্রার্থী ছিলেন হাজী মুহাম্মদ ইবরাহীম। ইসলামী আন্দোলন এবার যে কয়টি আসনকে প্রচুর সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছিল এর মধ্যে এই আসনটি রয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট ভেঙে যাওয়ার পরও অনেকে আশা দেখছিলেন এই আসনটি নিয়ে। ধারণা করা হচ্ছিল, বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর পাল্লাপাল্লির মধ্যে সাবেক দুইবারের এই কমিশনার বিজয়ী হয়ে আসতে পারেন। তবে ভোটের ফলাফলে তিনি মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেননি। এখানে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াত প্রার্থী কামাল হোসেন। হাজী ইব্রাহীম পেয়েছেন ১৪ হাজার ২০৬ ভোট। বিজয়ী প্রার্থী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৬৪১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নবী উল্লা নবী পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৪৯১ ভোট। 

এই ফলাফলে অনেকটা হতাশ হাজী ইবরাহীম। তিনি নিজের ফেসবুক পেইজে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে আপাতত বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। লিখেছেন- ‘আপাতত (দলটি রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করা পর্যন্ত) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সকল কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম।’

আরেকটি পোস্টে তিনি লিখেন- ‘দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগঠন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাথে লক্ষ লক্ষ মানুষের শ্রম, ঘাম ও স্বপ্ন জড়িয়ে আছে। তাই আমি ঘোষণা দিয়েই বলছি, এই সংগঠনকে এগিয়ে নিতে তিনশ টাকার একটি স্টাম্পে আমি আমার নিজের জীবন, সময় এবং সম্পদ ইসলামী আন্দোলনের নামে লিখে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু শর্ত হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করে আমাদেরকে দিতে হবে। আমরা সুস্পষ্ট কোনো টার্গেট এবং পরিকল্পনা ছাড়া আর একটি দিনও অতিবাহিত করতে চাই না। এভাবে সফলতা আসবে না ভাই।’

একই ধরনের হতাশা ফুটে উঠেছে আরেকজন প্রার্থী মাওলানা বদরুজ্জামানের কণ্ঠে। তিনি ফেসবুকে লিখেন- ‘জোট হলে এবারই হয়তো সরকার গড়তে পারতেন, দুই দলের ইগো আর ভুল সিদ্ধান্তে
দিনশেষে ভেঙে গেল দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এমন সুযোগ-
আবার কবে আসবে, হয়তো পঞ্চাশ বছরেও নয়…। মিনিমাম বোধ আর বিবেক থাকায় জোট ভাঙ্গার দিন থেকে মনের আগুনে পুড়ছি। এভাবে আর কতদিন পুড়ে যাবো জানি না।’

বদরুজ্জামান এবার নরসিংদী-৫ আসনে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। জোট অক্ষুণ্ন থাকলে এখানে তার মনোনয়ন পাওয়া প্রায় নিশ্চিত ছিল। অনেকটা মাঠ গুছিয়েও এনেছিলেন। তবে ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় তাকে এককভাবে নির্বাচন করতে হয়। ফলে এখানে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় জোট প্রার্থীর। হাতপাখা তৃতীয় হয়। হাতপাখা ও জোটের ভোট একসঙ্গে হলে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিজয়ের দেখা পাওয়া অনেকটা সহজ হতো। 

শুধু হাজী ইবরাহীম কিংবা বদরুজ্জামানই নন, দলটির বেশ কয়েকজন প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে হতাশার ছাপ লক্ষ্য করা গেছে। তারা চান, দল আরও ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবে এবং ধারাবাহিক কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখবে। 

ইসলামী আন্দোলন এবার ২৫৮টি আসনে সরাসরি হাতপাখা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। সারাদেশেই দলটির সংগঠন বিস্তৃত রয়েছে। ইসলামি দলগুলোর মধ্যে জামায়াতের পরই তাদের অবস্থান। গত কয়েক বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেটার প্রমাণও দেখিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। এবারের নির্বাচনে দলটির বিশাল অর্জনের প্রত্যাশা ছিল। তবে ফলাফলে সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। এতেই তৃণমূলের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। কেউ কেউ দলীয় সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধও। তবে দলের নেতৃস্থানীয়রা বলছেন, তাদের মধ্যে কোনো হতাশা নেই। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে অবিচল থাকাই ইসলামী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। সেই প্রশ্নে দল যেহেতু আপস করেনি, এর সুফল ভবিষ্যতে মিলবে।

 এমএম/