আলেম তারকা প্রার্থীদের মধ্যে কার সম্ভাবনা কতটুকু?
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:১৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

||বিশেষ প্রতিনিধি||

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দুয়ারে হাজির। আগামীকালই শেষ হচ্ছে ভোটের প্রচার-প্রচারণা। আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। শেষ মুহূর্তে রাজনীতির মাঠে বিরাজ করছে চরম উত্তেজনা। চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। নানা জরিপ ও ভবিষ্যদ্বাণী দ্বারা অনুমান আঁচ করা যাচ্ছে এবারের নির্বাচন টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হবে। এই অবস্থায় শেষ হাসি কারা হাসবেন সেটা নিয়ে চলছে বিচার-বিশ্লেষণ। এবারের নির্বাচনে সর্বোচ্চসংখ্যক আলেম প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে রয়েছেন বেশ কয়েকজন তারকা প্রার্থীও। তাদের সবশেষ অবস্থা জানার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

মাওলানা মামুনুল হক: এবারের নির্বাচনে তুমুল আলোচিত হচ্ছে ঢাকা-১৩ আসনটি। এই আসনে জামায়াত জোট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হক। তার সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবশেষ জরিপে ববি হাজ্জাজ কিছুটা এগিয়ে থাকলেও মাওলানা মামুনুল হকের জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকেই। কয়েকটি সমীকরণে তিনি এগিয়েও আছেন।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক: জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তার নিজ এলাকা সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসন থেকে। আগেও তিনি এই আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচন করলেও এবার বেশি আলোচিত হচ্ছেন। বিএনপি থেকে ছাড় পেলেও এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। পাশাপাশি জামায়াত জোট থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী আলেম মুফতি আবুল হাসান। ফলে এই আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। শেষ হাসি কে হাসবেন সেটা নিয়ে নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারছেন না।

মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির ও শায়খে চরমোনাই মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এবার লড়ছেন বরিশালের দুটি আসনে। বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসনে তিনি হাতপাখা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দুটি আসনেই তিনি মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। দুটির যেকোনো একটি বা দুটিতেই তিনি বিজয়ী হতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।

মাওলানা আব্দুল বাসিত আজাদ: খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাসিত আজাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) আসনে। তিনি জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় নেতা ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটিতে বিএনপির প্রার্থীকে ঠেক্কা দিয়ে তিনি কতটা জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে পারবেন সেটা নিয়ে রয়েছে সন্দেহ।

মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু: এবার আলেমরা যেসব আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এর মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ) আসনটি। এখানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে রিকশা প্রতীক নিয়ে জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তরুণ আলেম মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু। হজরত গহরপুরী রহ.-এর সাহেবজাদা হিসেবে এবং জামায়াত জোটের সমর্থনে তিনি বেশ শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছেন। বিএনপির প্রার্থী এম এ মালেকের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন তিনি। মাওলানা রাজু জয়ের মুখ দেখতে পারেন বলে আশা করছে এলাকাবাসী।

মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী: জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবারের নির্বাচনে বিএনপির কাছ থেকে যে চারটি আসনে ছাড় পেয়েছে এর একটি নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা)। এই আসনে খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন দলটির মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, জাতীয় পার্টির কোণঠাসা অবস্থায় থাকা এবং বিএনপির কাছ থেকে ছাড় পাওয়ায় এমপি হওয়ার দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে মাওলানা আফেন্দী। তবে জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী তাঁর পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মাওলানা আকরাম আলী: ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন এগার দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাওলানা আকরাম আলী। তিনি এলাকায় ‘ধলা হুজুর’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় এই নেতা রিকশা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ। আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে ধানের শীষের প্রার্থীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে প্রবীণ আলেম মাওলানা আকরাম আলীর।

মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব: এবারের নির্বাচনে আলোচিত আসনগুলোর একটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ)। এখানে বিএনপির সমর্থনে জমিয়ত থেকে খেজুর গাছ প্রতীকে নির্বাচন করছেন মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। তার বিপরীতে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত দলটির আলোচিত নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপির সমর্থন পেলেও মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবের জন্য পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন রুমিন ফারহানা। এখানে শেষ হাসি কে হাসবেন সেটা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী: জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। তিনি বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন। তবে তার বিজয়ের পথে বাঁধ সেধেছেন একাধিক বিএনপি নেতা। এই আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থীর পাশাপাশি আছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীও। মূল লড়াইয়ে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী থাকলেও শেষ পর্যন্ত জয়ের মুখ দেখবেন কি না তা নিশ্চিত করে এখনই বলা যাবে না।

মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী: চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময় উপনির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের টিকিটে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী। এরপর একাধিকবার নির্বাচন করলেও আর সংসদে যাওয়া হয়নি। এবারও তিনি প্রার্থী হয়েছেন সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একসময়ের ডাকসাইটে এই নেতা চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে। সেই দল থেকেই রিকশা প্রতীকের প্রার্থী হয়েছেন তিনি। তার দল ১১ দলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত হলেও এই আসনটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও এবি পার্টির মধ্যে ‍উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ফলে জোটের দুজন প্রার্থী এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এতে সাবেক এমপি পাশার পক্ষে বিজয়ী হওয়া একটু কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছে।

মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী: ঢাকা-৪ আসনে হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী। এই আসনে আলোচিত তিনজন প্রার্থীর একজন তিনি। ইসলামী আন্দোলনের বেশ ভালো ভিত থাকলেও ধানের শীষ এবং দাঁড়িপাল্লাকে টপকে বিজয়ের দেখা পাওয়া একটু কঠিনই বটে।

মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন: খুলনা-৪ (রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন। তিনি খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির। জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। তার বিপরীতে রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ধানের শীষের প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল। বিএনপির রিকশার সঙ্গে খেলাফত মজলিসের দেওয়ার ঘড়ির মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখানেও বিএনপির পাল্লা ভারী।

মাওলানা রশীদ বিন ওয়াক্কাস: যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাওলানা রশীদ বিন ওয়াক্কাস। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশের কেন্দ্রীয় নেতা। তার বাবা জমিয়তের দীর্ঘদিনের মহাসচিব এবং একাংশের সভাপতি মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। বাবার আসনে তিনি বিএনপির সমর্থন এবং জনপ্রিয় প্রতীক ধানের শীষ পেলেও শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন কি না তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। স্থানীয় বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী বিদ্রোহী হওয়ায় তার সংসদে যাওয়ার পথ মসৃণ নয়।

মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ: বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ শরীয়তপুর-১ (পালং–জাজিরা) আসন থেকে ১১ দলীয় জোটের হয়ে নির্বাচন করছেন। এখানে ধানের শীষের প্রার্থী জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আহমেদ আসলাম। প্রায় চার লাখ ভোটারের আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় আসনটিতে ধানের শীষের সঙ্গে রিকশা প্রতীকের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। আওয়ামী লীগের ভোট যিনি বেশি টানতে পারবেন তিনিই বাজিমাত করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ: লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা। তিনি কমলনগর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান। ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের প্রার্থী রয়েছে। এখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

মাওলানা নূরে আলম হামিদী: মৌলভীবাজারের ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান মাওলানা শেখ নূরে আলম হামিদী। বরুণা পীর পরিবারের এই সন্তান এবার মৌলভীবাজার-৪ আসনে নির্বাচন করছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীক নিয়ে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য আসনটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে উন্মুক্ত রেখেছে। এখানে বিএনপি প্রার্থীর পাশাপাশি এনসিপির প্রার্থীর সঙ্গেও লড়াই করতে হচ্ছে মাওলানা শেখ নূরে আলম হামিদীকে। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটিতে চা শ্রমিকদের ভোট বড় ফ্যাক্টর হবে।  

মাওলানা নাসির উদ্দীন মনির: চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা নাসির উদ্দীন মনির চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে রিকশা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা হলেও ভোটের আগে আগে যোগ দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে। তিনি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির ব্যারিস্টার মীর হেলালের সঙ্গে। দুজনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে ধানের শীষের পাল্লা ভারী বলে জানা গেছে।

এনএইচ/