পবিত্র শবে বরাত: আত্মার জাগরণ, জীবনের হিসাব ও রবের দিকে প্রত্যাবর্তন
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৫:৩৫ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

|| মুফতী আনোয়ার হুসাইন || 

আত্মার দরজায় করুণার আলো, করুণার নীরব দরজা যখন খুলে যায়; ইসলামের সময়ধারায় কিছু রাত আসে, যেগুলো কেবল অন্ধকার আর নীরবতার প্রতীক নয়; বরং সেগুলো মানুষের অন্তর্লোকে আলো জ্বালিয়ে দেয়, আত্মাকে জাগিয়ে তোলে, হৃদয়কে ফিরিয়ে নেয় তার সৃষ্টিকর্তার দিকে। তেমনি এক মহিমান্বিত রজনী হলো শাবান মাসের পনেরোতম রাত—পবিত্র শবে বরাত।

২০২৬ সালের এই বরকতময় রজনী আমাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছে এক গভীর আহ্বান নিয়ে—থেমে দাঁড়াও, নিজের দিকে ফিরে তাকাও, আর সমস্ত ক্লান্তি ও অপরাধবোধ নিয়ে রবের দরবারে আত্মসমর্পণ করো।

মানুষ প্রতিদিন ব্যস্ত থাকে জীবনের অসংখ্য হিসাব নিয়ে। লাভ-লোকসান, সাফল্য-ব্যর্থতা, হাসি-কান্না—এই চক্রেই কেটে যায় দিন ও রাত। কিন্তু এই ব্যস্ততার ভিড়ে সবচেয়ে অবহেলিত থেকে যায় আত্মার হিসাব। শবে বরাত সেই বিরল সুযোগ এনে দেয়, যখন মানুষ নিঃশব্দে নিজের ভেতরের আয়নায় তাকাতে পারে, নিজের অবস্থান নিজেই বিচার করতে পারে।

শবে বরাত : অর্থ  ও তাৎপর্যের গভীরতা 
‘বরাত’ শব্দের অর্থ ভাগ্য রজনী,বন্টন, মুক্তি, অব্যাহতি ও নিষ্কৃতি। অর্থাৎ গুনাহের ভার থেকে মুক্তি, আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা এবং তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় লাভ। শবে বরাতের মূল দর্শন এখানেই—মানুষ যত বড় অপরাধীই হোক না কেন, যদি সে আন্তরিক অনুশোচনা নিয়ে তাওবার পথে ফিরে আসে, তবে আল্লাহ তায়ালার দরবারে তার জন্য আশার দ্বার খোলা থাকে।

হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, শাবান মাসের মধ্যরাতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতের প্রতি বিশেষ দৃষ্টিতে তাকান এবং অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। তবে শিরকে লিপ্ত, অহংকারে নিমজ্জিত কিংবা অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারীরা এই মহামূল্যবান সুযোগ থেকেও বঞ্চিত থাকে। এখানেই শবে বরাতের মূল শিক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি কোনো যান্ত্রিক ইবাদতের রাত নয়; বরং অন্তরের সংস্কার ও আত্মার শুদ্ধতার রাত।

আত্মাসমালোচনার নীরব রজনী
শবে বরাত মূলত নিজের সঙ্গে নিজের সাক্ষাতের রাত। এই রাতে মানুষ নিঃসংকোচে নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে—
আমি কি সত্যিই আল্লাহর বান্দা হয়ে বেঁচে আছি?
আমার নামাজ, আমার লেনদেন, আমার আচরণ—সবকিছু কি ইসলামের আলোয় পরিচালিত?
আমি কি অজান্তে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কারও হক নষ্ট করেছি, কারও হৃদয়ে কষ্ট দিয়েছি?
এই প্রশ্নগুলোই শবে বরাতের প্রাণ। কেবল দীর্ঘ নামাজ বা অশ্রুসিক্ত দোয়া নয়; বরং নিজের ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই এ রাতের প্রকৃত সাফল্য।

ইবাদত ও আত্মাশুদ্ধির সুসমন্বয়
শরীয়তের আলোকে শবে বরাতে নফল ইবাদত করা ফজিলতপূর্ণ। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে বান্দা তার রবের নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। তবে এই ইবাদত যেন লোকদেখানো না হয়, যেন অহংকারের জন্ম না দেয়—সে বিষয়ে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

ইসলাম কখনোই প্রান্তিকতা বা বাড়াবাড়িকে সমর্থন করে না। অতিরঞ্জিত আয়োজন, নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে আবশ্যক মনে করা কিংবা ভিত্তিহীন বিশ্বাস ও কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়া—এসব শবে বরাতের শিক্ষা নয়। বরং নীরবতা, বিনয় ও গভীর আত্মসমর্পণের মধ্যেই এই রাতের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত।

মানুষের হক ও সম্পর্কের সংশোধন 
শবে বরাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আল্লাহর হক আদায়ের পাশাপাশি মানুষের হক আদায়ও অপরিহার্য। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, প্রতিবেশীর সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে কিংবা অন্তরে বিদ্বেষ জমিয়ে রেখে আল্লাহর ক্ষমা প্রত্যাশা করা আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল। এই রাত হোক ক্ষমা করার রাত। যারা আমাদের কষ্ট দিয়েছে, তাদের ক্ষমা করার চেষ্টা করাই আত্মার পরিশুদ্ধি। সম্পর্কের জট খুলে দেওয়া, অহংকার ভেঙে বিনয়ের পথে আসা—এসবই শবে বরাতের মৌলিক শিক্ষা।

শবে বরাত ও নৈতিক সমাজগঠন 
শবে বরাত কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের রাত নয়; বরং এটি সমাজ সংস্কারের এক নীরব আহ্বান। ব্যক্তি সংশোধিত হলে পরিবার শুদ্ধ হয়, পরিবার শুদ্ধ হলে সমাজ আলোকিত হয়। দুর্নীতি, অবিচার, মিথ্যাচার ও নৈতিক অবক্ষয়ের এই সময়ে শবে বরাত আমাদের নৈতিক পুনর্জাগরণের বার্তা দেয়। ২০২৬ সালের শবে বরাত আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকব, নাকি ইসলামের নৈতিক চেতনাকে জীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়ন করব?

মৃত্যুচেতনা ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার
শবে বরাত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের অনিশ্চয়তার কথা। মৃত্যু অনিবার্য, সময় সীমিত। আজ যে সুযোগ রয়েছে, কাল তা নাও থাকতে পারে। তাই এই রাত হোক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সূচনা।
আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন—আমি মিথ্যা পরিহার করব, অন্যায় থেকে দূরে থাকব, নামাজে যত্নবান হব, মানুষের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করব।

উপসংহার
পবিত্র শবে বরাত কোনো উৎসবের রাত নয়, কোনো প্রদর্শনীর সময়ও নয়। এটি নীরব কান্নার রাত, ভাঙা হৃদয় নিয়ে রবের দরবারে ফিরে যাওয়ার রাত। এই রজনী আমাদের শেখায়—আল্লাহর রহমত সীমাহীন, তবে সে রহমত লাভের জন্য হৃদয়কে শুদ্ধ করতে হয়।

২০২৬ সালের শবে বরাত হোক আমাদের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা—গুনাহমুক্ত জীবনের পথে যাত্রা, নৈতিক পুনর্জাগরণ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের দৃঢ় প্রত্যয়ের এক অনন্য মুহূর্ত।
শবে বরাত হোক আমাদের আত্মার মুক্তি, জীবনের সংশোধন এবং পরকালের পাথেয় সংগ্রহের এক বরকতময় রজনী।

লেখক: সিনিয়র মুফতী ও আদীব, দারুল হিদায়া আল-মাদানিয়া মিরপুর-২, ঢাকা