ক্ষমার বৃষ্টি বর্ষণ হলেও কিছু মানুষ দুর্ভাগা!
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০২:১৮ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

||মুহাম্মাদ ইমাম হাসান ||

শবে বরাত। রাতটি অদ্ভুত এক প্রশান্তির বার্তা নিয়ে আসে। আকাশ যেন নীরবে খুলে দেয় তার দরজা, রহমতের স্রোত নেমে আসে পৃথিবীর বুকে। বান্দারা সিজদায় অবনত হয়, অশ্রুভেজা চোখে প্রার্থনা করে—‘হে পরম দয়ালু, আমাদের অপরাধগুলো মাফ করে দিন।’ অনুতাপের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস, আর অসংখ্য গুনাহগার ডুবে যায় আল্লাহর অসীম করুণার ছায়ায়।

তবু এই সার্বজনীন ক্ষমার আহ্বানের মধ্যেও কিছু মানুষ থেকে যায় বঞ্চিত। রহমতের বৃষ্টি সবার ওপর ঝরে, কিন্তু সবার অন্তর তা গ্রহণ করতে পারে না। ঘোষিত হয়—দুটি শ্রেণি নিজেদের কর্মের কারণেই আজ মাগফিরাতের স্বাদ পাবে না।
প্রথমত তারা, যারা স্রষ্টার একত্বে আঘাত হানে—তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে। ঈমানের মূলভিত্তিই যেখানে টলমল, সেখানে ক্ষমার দরজা কেমন করে উন্মুক্ত হবে?

কিন্তু আরেকটি শ্রেণি আছে, যাদের কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। বাহ্যিকভাবে তারা হয়তো নামাজি, রোজাদার, ইবাদতে নিয়োজিত। অথচ তাদের অন্তরের কোণে জমে আছে বিদ্বেষের অন্ধকার। হিংসা, ঘৃণা, প্রতিশোধস্পৃহা—এসব বিষাক্ত আবেগ তাদের হৃদয়কে কঠিন করে তুলেছে।

একবার ভাবুন—সারারাত ইবাদতে কাটালেন, কোরআন তিলাওয়াত করলেন, চোখের পানি ফেললেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানা গেল, আপনার আমল আকাশ ছুঁতে পারেনি। কেননা হৃদয়ের ভেতর লুকিয়ে ছিল কারও প্রতি অনমনীয় ক্ষোভ।
বিদ্বেষ এমন এক নীরব আগুন, যা আগে নিজের ভেতরটাকেই জ্বালিয়ে দেয়। মানুষ বাইরে স্বাভাবিক আচরণ করলেও অন্তরে বহন করে দহন। ছোট্ট একটি কথা, তুচ্ছ কোনো ভুল—এসবকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর সম্পর্ক ভেঙে রাখা, অভিমান লালন করা—এ যেন আত্মাকে অন্ধকারে বন্দি করে রাখা।

সমাজের দিকে তাকালেই এর প্রমাণ মেলে। আত্মীয়তার বন্ধন শিথিল, বন্ধুত্বে অবিশ্বাস, সামান্য মতভেদে সম্পর্কের ইতি। সামাজিক পরিসরে কটু বাক্য, দ্বীনি অঙ্গনেও বিভাজন। সহনশীলতা ও উদারতার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। অথচ আমরা ভুলে যাই—অন্তরের কলুষতা নিয়ে যখন রবের দরবারে দাঁড়াই, সেই কলুষতাই আমাদের প্রার্থনার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

এই পবিত্র সময় তাই শুধু নফল ইবাদতের নয়; এটি আত্মশুদ্ধিরও মুহূর্ত। নিজের হৃদয়কে প্রশ্ন করার সুযোগ—আমি কি কারও প্রতি অন্যায়ভাবে কঠোর হয়ে আছি? কারও ভুলকে ক্ষমা করতে অস্বীকার করেছি? অহংকারের কারণে সম্পর্ক নষ্ট করেছি?

যদি উত্তর ইতিবাচক হয়, তবে আজই পরিবর্তনের সময়। একটি আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা, একটি মিলনের উদ্যোগ—হয়তো সেটিই আপনার মুক্তির কারণ হবে। সম্পর্ক জোড়া লাগানো দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং তা আত্মার মহত্ত্বের প্রমাণ।
স্মরণ রাখা উচিত, যে অন্তর অন্যের কল্যাণ কামনা করে, যে হৃদয় ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলতে পারে—সেই হৃদয়ই রহমতের যোগ্য। আল্লাহর ক্ষমা পেতে চাইলে নিজের ভেতরের অন্ধকারও দূর করতে হবে।

আসুন, আমরা নিজেদের সংশোধন করি। ভেতরের গোপন ক্ষত সারাই, জমে থাকা ঘৃণাকে বিদায় জানাই। যেন আমরা সেই দুর্ভাগাদের দলে না পড়ি, যাদের আমল অপেক্ষমাণ থেকে যায়। বরং আমরা যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হই, যাদের গুনাহ মুছে যায়, অন্তর প্রশান্ত হয়, আর জীবন নতুন আলোর দিকে এগিয়ে যায়।

আল্লাহ আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন, পারস্পরিক ভালোবাসায় আবদ্ধ করুন এবং তাঁর সীমাহীন অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।

লেখক: তরুণ লেখক, দারুত তারবিয়াতিল ইসলামিয়া, নিউমার্কেট, যশোর

এমএম/