
|
‘ওয়ান বক্স পলিসি’র রূপকার পীর সাহেব চরমোনাই
প্রকাশ:
১১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৭:১৫ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
মুফতি এনায়েতুল্লাহ গত কয়েক দশকে রাজনীতিতে চরম অবক্ষয় ঘটেছে। রাজনীতি পরিণত হয়েছে ব্যবসায়। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন নীতি-আদর্শের পরিবর্তে অর্থ ও পেশিশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রাজনীতিবিদরা একে অপরের আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে মরণশীল শত্রুতে পরিণত হয়েছে। যুক্ত-তর্ক ও নীতি-আদর্শের পরিবর্তে কালো টাকা, হুন্ডা-গুন্ডা ও সহিংসতা পরিণত হয়েছে রাজনীতির ভাষায়। এ থেকে উৎপত্তি হয় ছলে-বলে-কলে-কৌশলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি, যা সমাজকে চরমভাবে বিভাজিত করে ফেলেছে। তাই টেকসই গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন। কাঙ্ক্ষিত এ পরিবর্তনের লক্ষে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’তে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে নামার ঘোষণা দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর)। এ প্রসঙ্গে গত ১৫ সেপ্টেম্বর (২০২৫) রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘কয়েকটি রাজনৈতিক আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশপ্রেমী ও মানবতাপ্রেমীদের জোটবদ্ধ হয়ে একটি বাক্সে যাওয়ার বিষয়টি কাছাকাছি রয়েছে।’ তার এই ঘোষণার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরস্পরে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’তে আসন সমঝোতা করে নির্বাচনের সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে থাকে। আলাপ-আলোচনা শেষে সমঝোতায় সঙ্গী হয় ১১টি রাজনৈতিক দল। সেগুলো হলো- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি-এবি পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি। দলগুলো বিভিন্ন আসনে এ প্রক্রিয়ায় প্রার্থী ঘোষণা করে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে আসন সমঝোতায় এখনও আসতে পারেনি। অথচ আর মাত্র মাসখানেকের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন। যদিও এ প্রক্রিয়া শুরুর পর পদ্মা-মেঘনায় পানি অনেক গড়িয়েছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা, খালেদা জিয়ার মৃত্যু, নির্বাচনের তফসির ঘোষণা, প্রার্থী ঘোষণা, প্রার্থীতা বাছাই শেষে এখন আপিল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে মার্কিন বাহিনী, ইরানে চলছে ব্যাপক বিক্ষোভ, সামরিক হামলা কিংবা সরাসরি দখল যেকোনো উপায়ে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘এক বাক্সে ভোট’ ফর্মুলায় পথচলার চমৎকার শুরুর পর শেষ মুহূর্তে এসে এই প্রক্রিয়ায় কেন স্থবিরতা তৈরি হলো- সে এক বিশাল প্রশ্ন। আসন সমঝোতা না হওয়ায় নানা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মাঝে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকে। এবং চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, এ প্রতিক্রিয়া দেখানোর অধিকার তারা রাখে এবং সেটাই তারা দেখাচ্ছে। সমঝোতার জট পাকানোর কারণ হিসেবে বলা যায়, ওয়ান বক্স পলিসির আলাপ-আলোচনা শুরুর দিকে শুধু কয়েকটি ইসলামি দল একসঙ্গে ছিল। পরে এ আলোচনায় যোগ দেয় জামায়াত। অন্য দিকে জামায়াত শুরুর দিকে মিত্র দলগুলোকে অন্ধকারে রেখে আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যায় এবং বৃহৎ সমঝোতার কথা ঘোষণা করে। এখানেই জট পাকায় সমঝোতার সলতে। জামায়াতের এই আচরণ অনেকটাই ‘বড় ভাই সুলভ’ হওয়ায় ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু করে। অন্য দিকে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া এই সমঝোতাকে ‘জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট’ বলে আখ্যা দেওয়া শুরু করায় সেই আগুন আরও দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে এখনও জোট নিয়ে আশাবাদী নেতারা। এখানেই উচ্চারিত হচ্ছে- সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর)-এর নাম। দলগুলো তাকিয়ে আছে তার দিকে। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটাই চূড়ান্ত। উত্তাল সময়, ক্ষণে ক্ষণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, নানা শঙ্কা ও সম্ভাবনার দরোজা খুলছে এবং বন্ধ হচ্ছে। কিন্তু শান্তভাবে পরিস্থিতি দেখছেন, চেষ্টা করছেন সমাধানের এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের। কী স্বপ্ন? রাজনীতির এক নতুন ফর্মূলা বাস্তবায়নের স্বপ্ন। যে স্বপ্নে কথা তিনি বলেন এভাবে, ‘একটা সুন্দর দেশ গঠন করার সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যে দেশে শতকার ৯২ জন মুসলমান বসবাস করে, সেই দেশের নীতি-আদর্শ রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত ইসলাম থাকবে এটাই হলো বাস্তবতা। সেই লক্ষ্যেই আমরা ইসলামি দলগুলো একত্রিত হয়ে ইসলামের পক্ষে যেন একটা বাক্স দেওয়া যায়, সেজন্য কাজ করছি। দেশের মানুষ অনেকের শাসন দেখেছে, ইসলামি নীতি-আদর্শের শাসন দেখে নাই। মানুষের চাহিদাও কিন্তু এখন এরকম। তাই সেই হিসেবে আমাদের কার্যক্রম খুব জোরালোভাবে বিগত দিনে চলছিল, বর্তমানেও চলমান। আশা করি, এ রকম একটা পরিবেশ আল্লাহ যদি কবুল করে এটা একটা বাক্স দেওয়ার মতো হতে পারে।’ স্পষ্ট কথা, কোনো গোজামিল নেই, লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে ওঠে এভাবে কয়জন বলতে পারে? সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম মধ্য গড়নের মানুষ। কিন্তু দলবিস্তার ও রাজনীতিতে তার পরিপক্কতা উল্লেখ করার মতো। ভয়-ডরহীনভাবে সরকারকে হুংকার দিতে পারেন। বিগত সরকারের আমলে, আন্দোলন যখন তুঙ্গে তথন তিনি সরকারকে বলেছেন, ‘ওই নরপিশাচ! তুই আমার সন্তানের বুকে গুলি করলি কেন?’ জুলাই অভ্যুত্থানে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে তিনিই একমাত্র এমন শক্ত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। রাজনীতি শব্দটি শুনলেই সাধারণ মানুষের মনে প্রথম যে ধারণাটি আসে তা হলো- ক্ষমতা। কিন্তু সেই ক্ষমতাকে থোড়াই কেয়ার করেন তিনি। ‘সমঝোতা কোথায় আছে? কেমন আছে?’ ‘দয়া করে সমোঝাতা থেকে বের হয়ে আসুন।’ ‘এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিন।’ ‘জামায়াতের সঙ্গে ইসলামি দলগুলোর ঐক্য হয় না। ঐক্য হলেও জামায়াত সর্বদা ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণই করবে।’ এমন কথা, লেখা ও আহবান করেছেন দলের পরিচিত নেতা-কর্মীরা। তার পরও তিনি চুপ। দলগুলোর সঙ্গে আসলেই সমঝোতা হবে কিনা? সমঝোতা হলেও মাঠপর্যায়ে কেমন সাড়া মিলবে- এমন প্রশ্নের মাঝেও তার এমন নিরুত্তাপ থাকা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে। বিগত আওয়ামী শাসনামলে দেখেছি এখনও দেখছি, তার মতো নিষ্ঠাবান রাজনীতিক এ দেশে বিরল। মাটির কাছাকাছি থেকেও নিজেকে আকাশের উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারার মতো বিরল ব্যক্তিত্ব তিনি। ক্ষমতা কিংবা অর্থের মোহ তাকে ছোঁয়নি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে প্রার্থী হননি। হ্যাঁ, যারা রাজনীতি করেন, তারা ফেরেশতা নয়, শয়তানও নয়। তারা দোষে-গুণে মানুষ। কিন্তু যারা দোষ না করে গুণে এগিয়ে থাকেন তারা মহা মানুষ, ভালো গুণের মানুষ। পীর সাহেব চরমোনাই্ তেমনি একজন মানুষ। তাকে এবং তার দলকে নানাভাবে হেয়-প্রতিপন্ন করা হচ্ছে, অনলাইনে ব্যাশিং করা হচ্ছে, তার থিউরি তার কাছে থেকেই ছিনিয়ে নেওয়ার পায়তারা হচ্ছে- তিনি নির্বিকার। ক্ষমতার রাজনীতিতে যখন অনেকে বিভ্রান্ত তখনও তিনি স্থির-শান্ত। কারণ- নীতিবান, নিষ্ঠাবান, আদর্শবান, কুশলী ও সজ্জন হিসেবে তিনি কখনও ক্ষমতা এবং টাকার পেছনে ছোটেননি। এসব বিষয় তার কাছ থেকে শেখার আছে আমাদের। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা প্রবাদ প্রতিম। একজন রাজনীতিকের জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু হতে পারে না। একইসঙ্গে ঈর্ষণীয় ও অনুকরণীয় এ রকম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সমকালীন সময়ে খুব একটা দেখা যায় না। তার কথাবার্তায় এটা স্পষ্ট যে, তিনি বাংলাদেশকে ভালোবাসেন, ইসলামকে ক্ষমতা দেখতে চান। যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে ওয়াজের ময়দান দাপিয়ে বেড়ান দিনরাত। ১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম একজন পীর। লাখ লাখ মানুষের এই আধ্যাত্মিক রাহবার রাজনীতিবিদ হিসেবেও বেশ প্রাজ্ঞ। ৬ ভাই ও ১ বোনের সংসারে বড় হওয়া সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম ২০০৬ সাল থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি দলকে আজকের অবস্থানে এনেছেন। সাফল্য-ব্যর্থতার নিরিখে এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে তার দল। কী সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি? আসন ভাগাভাগির সমীকরণে তিনি কোন পথে হাঁটবেন- সেটাই এখন প্রশ্ন। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক |