‘প্রথাভিত্তিক খতমে বুখারি অনুষ্ঠান বন্ধে সম্মিলিত ও সাহসী সিদ্ধান্ত আসুক’
প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৮:৪৫ রাত
নিউজ ডেস্ক

সম্প্রতি পাকিস্তান বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া প্রচলিত খতমে বুখারি অনুষ্ঠানের বন্ধে সব মাদরাসাকে নির্দেশ দিয়েছে। এই অনুষ্ঠান ঘিরে রুসুমাত, জুলুম ও শরিয়ত পরিপন্থী কাজ হয়-এমন অভিযোগ এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাকিস্তানের শীর্ষ আলেম ও বেফাকের সভাপতি আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি স্বাক্ষরিত এক জরুরি নোটিশে মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে ১০টি সুনির্দিষ্ট অনিয়ম পরিহার করে অনুষ্ঠানগুলো সাদামাটা ও আধ্যাত্মিক করার নির্দেশও দেওয়া হয়।

এবার বাংলাদেশেও একই দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। আলেমদের একটি বড় অংশ মনে করেন, দিন দিন খতমে বুখারি অনুষ্ঠান ঘিরে যে রুসুমাত চালু হচ্ছে সেটা একটা সময় বড় ফেতনার আকার ধারণ করবে। এজন্য এ ব্যাপারে এখনই সতর্ক হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিজ্ঞ আলেমরা।

বিষয়টি নিয়ে আওয়ার ইসলামের কথা হয় দেশের প্রবীণ আলেম, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও রাজধানীর ঢালকানগর মাদরাসার মুহতামিম মুফতি জাফর আহমদের সঙ্গে। তিনিও প্রচলিত বুখারি অনুষ্ঠান বন্ধের পক্ষে। প্রথাভিত্তিক এই অনুষ্ঠান বন্ধে বেফাকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সম্মিলিত ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। 

মুফতি জাফর আহমদ বলেন, আমি আজ থেকে প্রায় পাঁচ ছয় বছর আগে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রথমত, আমি আমার মাদরাসায় খতমে বুখারি অনুষ্ঠান করি না। দ্বিতীয়ত, কোথাও খতমে বুখারি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলেও আমি সেখানে অংশগ্রহণ করি না। এর পেছনে আমার সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে।

তিনি কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, আমাদের আকাবিরে দীন বলেছেন, সহিহ বুখারী খতমের পর দোয়া করলে দোয়া কবুল হয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ফজিলতের জন্য আনুষ্ঠানিকতা বাধ্যতামূলক নয়। আজ যেভাবে খতমে বুখারি অনুষ্ঠান করা হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই শরিয়তসম্মত নয়।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দেখা যায়, খতমে বুখারি উপলক্ষে ছাত্রদের পড়াশোনা বন্ধ রেখে কালেকশনে নামানো হয়। মানুষে মানুষে গিয়ে টাকা তোলা হয়, গরু–ছাগল আদায় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে গরিব ছাত্রদের কাছ থেকেও জোরপূর্বক পাঁচ হাজার, দশ হাজার টাকা নেওয়া হয়—যা সম্পূর্ণভাবে নাজায়েজ।

আওয়ার ইসলামের সঙ্গে আলাপকালে দেশের প্রখ্যাত এই আলেম বলেন, আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, তালেবে ইলমদের জমানো বা সংগ্রহ করা টাকায় কোনো কোনো হুজুরের কাপড় বানিয়ে দেওয়া হয়, ‘মাদরাসার সৌজন্যে’ উপহার দেওয়া হয়। সেই একই টাকায় বড় আয়োজন করে বিরিয়ানি রান্না করা হয়। অথচ শরিয়তের স্পষ্ট বিধান হলো—কোনো মুসলমানের সম্পদ তার পূর্ণ সন্তুষ্টি ছাড়া গ্রহণ করা জায়েজ নয়।

একটি ঘটনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার নিজের চোখে দেখা একটি ঘটনা আজও আমাকে নাড়া দেয়। এক ছাত্রকে টাকার জন্য এমনভাবে চাপ দেওয়া হয়েছিল যে, সে বাড়িতে গিয়ে বাবার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত সেই বাবা বাধ্য হয়ে বহু বছরের পুরোনো একটি জামগাছ বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। গাছ কাটার সময় তার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছিল। এই দৃশ্য কি আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়? এ ধরনের খতমে বুখারি অনুষ্ঠান আমাদের আকাবিরে কেরাম কখনোই সমর্থন করেননি।

তিনি বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— যে হুজুর পুরো কিতাব পড়াতে সক্ষম হলেন, তিনি কি নিজে খতম দিতে পারেন না? খতম মানেই কেন বড় অনুষ্ঠান, চাঁদা ও আয়োজন?

মুফতি জাফর আহমদ বলেন, এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে আমি সারাদেশের উলামায়ে কেরামের প্রতি এবং বিশেষভাবে বেফাকের প্রতি বিনীত আহ্বান জানাচ্ছি— এ ধরনের অনিয়ম, জুলুম ও নাজায়েজ প্রথাভিত্তিক খতমে বুখারি অনুষ্ঠান বন্ধ করার ব্যাপারে সম্মিলিত ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হোক। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে দীনের নামে জুলুম থেকে হেফাজত করুন এবং সহিহ বুঝ দান করুন। আমিন।

আরএইচ/