মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস কাসেমী রহ.-এর আলোকিত জীবন
প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ০৮:৩১ রাত
নিউজ ডেস্ক

||মাওলানা মোস্তফা ওয়াদুদ||

মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস কাসেমী রহ. ছিলেন বাংলাদেশের সমকালীন ইলমি অঙ্গনের এক প্রজ্ঞাবান আলেম, শান্ত স্বভাবের নীরব সাধক এবং তাকওয়া ও ইলমের পথে নিবেদিতপ্রাণ এক রাহবার। ১৯৫৮ সালের ২০ ডিসেম্বর কুমিল্লার চড্ডা গ্রামে এক ধর্মপ্রাণ পরিবারে তিনি জন্মলাভ করেন।

তাঁর পিতা মৌলভী আব্দুল ওয়াদুদ সাহেব (রহ.) ছিলেন ধার্মিক ও সৎকর্মপরায়ণ একজন মানুষ। পিতার হাতেই শুরু হয় তাঁর পবিত্র ইলমের প্রথম পাঠ; এভাবেই পরিবারের ইলমি পরিবেশ তাঁর চরিত্রে গড়ে তোলে বিনয়, নৈতিকতা ও আল্লাহভীতি।

শৈশব ও প্রারম্ভিক শিক্ষা

ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ইসলামি আদব-কায়দা ও জ্ঞানের প্রতি গভীর আকর্ষণ স্পষ্ট ছিল। ১৯৬৫ সালে পিতার কাছ থেকে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে তিনি ভর্তি হন নাঙ্গলকোট হাফেজিয়া মাদরাসায়, যেখানে পূর্ণাঙ্গ হিফজ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি শরিয়তপুরের নন্দনসার মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে সে সময় মুহতামীম ছিলেন তাঁর বড় ভাই আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রহ.। তাঁর তত্ত্বাবধানে তিনি হেদায়াতুন্নাহু পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।

উচ্চতর শিক্ষা ও দারুল উলুম দেওবন্দ

মধ্যম পর্যায়ের অধ্যয়ন শেষে তিনি পাড়ি জমান চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাটহাজারী মাদরাসায়, যেখানে জালালাইন পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর আরও উচ্চতর জ্ঞানলাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে নিয়ে যায় বিশ্বখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে। ১৯৮৫ সালে দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে ফারেগ হন— যা তাঁর ইলমী জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

তিনি পেয়েছিলেন বহু খ্যাতনামা আলেমের সান্নিধ্য। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, মাওলানা রিয়াসাত আলী বিজনূরী রহ., মাওলানা কামরুদ্দীন রহ., মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ., মাওলানা আব্দুল খালেক মাদরাজী রহ., মুফতি আমীন পালনপুরী, মাওলানা নেয়ামাতুল্লাহ আজমী প্রমূখ। তাঁদের সোহবত ও দীক্ষা তাঁর ইলমী দৃষ্টিভঙ্গি, অন্তর্দৃষ্টি ও চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

কর্মজীবন ও দায়িত্বশীলতা

দেশে ফিরে ১৯৮৬ সালে তিনি চৌধুরীপাড়া মাদরাসায় মুহতামিম পদে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি জামিয়া মাহমুদিয়া ইসহাকিয়া মানিকনগরে নায়েবে মুহতামিম ও শায়খে ছানী হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া রাজধানীর শাহজাহানপুর মসজিদের দীর্ঘদিনের খতিব হিসেবে তিনি ইসলাহি বয়ান, ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক জাগরণের আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে গেছেন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে।

দাওরার দরস ও ছাত্রদের সাথে সম্পর্ক

তাঁর দরসে ছিল গভীরতা, ভাষায় ছিল সৌন্দর্য, আর বক্তব্যে ছিল আল্লাহভীতি ও নৈতিকতার দিকনির্দেশনা। ছাত্রদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল পিতাসুলভ ও বন্ধুসুলভ। লেখকের সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর নিকট নূরুল ঈযাহ পড়ার; পাশাপাশি শরহে বেকায়ার সময়ে মেশকাতের শেষ ঘন্টায় তাঁর দরসে বসার তাজা স্মৃতি আজও অনুপ্রেরণামূলক হয়ে রয়েছে।

ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র

আল্লামা কাসেমী রহ. ছিলেন নম্র ও বিনয়ী স্বভাবের। দুর্বল, নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্ত মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন সহৃদয় ও সহানুভূতিশীল। প্রকাশভঙ্গিতে সরল ও সংযত হলেও তাঁর চিন্তা ও অন্তর্দৃষ্টি ছিল গভীর ও স্থিতিশীল।

পরিবার

পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন সুখী ও পরিতৃপ্ত। তাঁর ২ ছেলে ও ৩ মেয়ে— যাঁদের মধ্যে দুই ছেলে উচ্চশিক্ষিত হয়ে আলেম হয়েছেন এবং ইলমী অঙ্গনে আলোর দিশা দেখাচ্ছেন।

মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস কাসেমী রহ. আজ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন— কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ইলম, আদব, প্রজ্ঞা, নিষ্ঠা, ছাত্রদের প্রতি ভালোবাসা— এগুলোই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলো ছড়াবে ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।

লেখক: আলেম লেখক ও সাংবাদিক

এলএইস/