নওমুসলিমের হৃদয়ছোঁয়া গল্প : আলোকের পথে আত্মিক যাত্রা (শেষ পর্ব)
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট, ২০২৫, ০২:০৬ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান

আট. মুসলিম কল্যাণ ফাউন্ডেশন প্রথমে শিশিরকে নিরাপত্তার স্বার্থে পাহাড়ি অঞ্চল চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল—এই সময়টা পার করে পরিবেশ একটু শান্ত হলে পরে ঢাকায় ফিরবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি শান্ত তো হয়ই না, বরং আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। 

চট্টগ্রামে যাওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় ধামরাই থানার নম্বর থেকে তার ফোনে আসে এক বিপদসংকেত। নওমুসলিম ফাউন্ডেশনের এক ভাই ফোনে বলেন, “তোমার জন্য আমরা বড় বিপদে পড়ে গেছি। আমাদের ওরা থানায় ধরে এনেছে। তুমি যত তাড়াতাড়ি পারো, ঢাকায় চলে এসো।”

শিশির আর দেরি করে না। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে সে সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় ফিরে আসে। ঢাকায় এসেই একজন অভিজ্ঞ ও সৎ আইনজীবীর সহায়তা নিয়ে ধামরাই থানার পথে রওনা হয়।

 থানায় পৌঁছেই শিশির—অর্থাৎ আব্দুল্লাহ আল আহমদ—দেখে, তার পরিবারের প্রায় সবাই সেখানে উপস্থিত। থানা চত্বর যেন মুহূর্তেই আবেগে ভারী হয়ে ওঠে। শিশির থানার অফিসারদের কাছে তার ইসলাম গ্রহণের কাগজপত্র দেখিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, “আমি স্বেচ্ছায়, পুরোপুরি নিজের ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছি। নওমুসলিম ফাউন্ডেশনের ভাইদের এতে কোনো সম্পৃক্ততা নেই, তাদের কোনো দোষ নেই।”

তার সৎ বক্তব্যে পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত হন এবং ফাউন্ডেশনের নিরপরাধ ভাইদের মুক্তি দিয়ে দেন। তখনই পরিবারের মধ্যে শুরু হয় আবেগের বিস্ফোরণ। কেউ কেউ শিশিরকে কাছে টেনে নিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ পা জড়িয়ে ধরে মিনতি করেন, “ফিরে চলো, বাবা। ঘরে ফিরে এসো।” 

তার বাবাও আবেগী কন্ঠে বলেন, “তুমি যদি সত্যিই ইসলাম ধর্ম পালন করতে চাও, করো—কিন্তু ঘরে ফিরে এসো। কেউ তোমাকে বাধা দেবে না, কথা দিচ্ছি।” 

তখন শিশিরেরও মনে হয়েছিল, এই কথাগুলোর মাঝে ছিল ভালোবাসা, ছিল দুঃখ, আবার ছিল এক অদৃশ্য আতঙ্ক—ছেলেকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা। শিশির চুপচাপ সবার মুখের দিকে তাকায়। চোখে জল আসে, কিন্তু মনে দ্বিধা নেই। সত্যের পথের যে আলো সে দেখেছে, তা তাকে আর ফিরতে দেবে না।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরার পুরো পথজুড়ে শিশির একটানা কুরআনের সেই আয়াতগুলা স্মরণ করেছে—যেগুলোতে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর পথে একবার দাঁড়ায়, তাদের জন্য থাকবে প্রহরী ফেরেশতা, থাকবে সাহায্য। সে ভাবছিল, "রব আমাকে পথ দেখিয়েছেন, তিনিই রক্ষা করবেন।"

তাই শত প্রতিকূলতা, পরিবারিক আবেগ, কৌশলী প্রলোভন—কিছুই তাকে টলাতে পারেনি। যখন থানায় পুলিশ তাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কার জিম্মায় যেতে চাও?”—শিশির নিঃসংকোচে জবাব দেয়, “আমি নিজের জিম্মায় থাকতে চাই।”

পুলিশ আর কিছু বলতে পারে না। পরিবার ব্যথিত মুখে তাকিয়ে থাকে, কেউ চোখ মুছে, কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদে। কিন্তু পরে সে জানতে পারে—পরিবারের কিছু সদস্য আসলে তাকে কৌশলে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে একদল ভাড়াটে সন্ত্রাসীর হাতে তুলে দেওয়ার ছক করেছিল।

আল্লাহর কৃপায় সেই ভয়াবহ ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পায় শিশির। আরেকবার প্রমাণ হয়, যারা দ্বীনের পথে অটল থাকে, আল্লাহ তাদের জন্য পথ তৈরি করে দেন—যেভাবে অন্ধকার গুহার ভিতরেও আলো ঢুকে পড়ে।

নয়. আত্নার পরিশুদ্ধতার এ ভ্রমণে শিশিরকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে কিছু নামধারী মুসলমানের অবিশ্বাস্য আচরণ। একজন সত্যানুসন্ধানী মানুষ যখন সত্যের দ্বারে কড়া নাড়ে, তখন তার পাশে দাঁড়ানোর বদলে তারা তাকে ঠেলে দিতে চেয়েছে অন্ধকারের দিকেই। পথ দেখানো তো দূরের কথা—তাকে কটাক্ষ, সন্দেহ আর নিরুৎসাহের মাধ্যমে তারা দূরে সরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে। শিশিরের জন্য এটি ছিল হৃদয়বিদারক এক অভিজ্ঞতা।

তবে সবাই এক রকম ছিলেন না। আল্লাহর করুণা, কিছু হৃদয়বান, আন্তরিক মুসলিমও তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, সমাজের বাঁকা চোখ উপেক্ষা করে, নিঃস্বার্থভাবে তার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। তার চলার পথে আলোর দিশা দেখিয়েছেন। তারাই শিশিরের মনে সাহস জুগিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন।

যখন সে বাড়িতে ছিল, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রতিকূলতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাবার আশেপাশের মুসলমান বন্ধু- বান্ধব আর তার ভাইদের বন্ধু-বান্ধব এবং নিজের বন্ধু-বান্ধবেরা। দূরের মসজিদে তাকে নামাজ পড়তে দেখলে তারা বাড়িতে গিয়ে খবর দিতো, যেন সে কোনো অপরাধ করছে। কারও কারও কথা ছিল আরও কর্কশ—“তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে”, “সব ধর্মই তো সঠিক, এত বাড়াবাড়ি কেন?”—এমন সব কথায় তারা সত্য-সন্ধানী এক তরুণের মনে সন্দেহের বীজ বপনের চেষ্টা করতো।

সবচেয়ে কষ্টের ছিল—যাদের কাছে সে অন্তত সামান্য সহানুভূতির আশা করেছিল, তারাই তাকে সবচেয়ে বেশি ব্যথা দিয়েছে। বাবার এক ঘনিষ্ঠ মুসলমান বন্ধুও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে সত্যচ্যুত করতে। আর ঘর ছাড়ার পরে, যে ক্লাসমেটকে সে সবচেয়ে কাছের বন্ধু মনে করতো, সেই মুসলমান বন্ধুটিই তার বাবাকে সহায়তা করে তাকে খুঁজে বের করার জন্য!

তবে এসব ঘটনার মধ্যেও সে ভেঙে পড়ে না। বরং আরও দৃঢ় হয় তার ঈমান, আরও শক্ত হয় তার নির্ভরতা রবের উপর। সে বুঝে নেয়, আল্লাহর পথে চলতে গেলে পরীক্ষাই হবে সবচেয়ে বড় সঙ্গী—আর বিজয় তাদেরই যারা ধৈর্যের সাথে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।

পাশাপাশি এ অভিজ্ঞতা তাকে এক নতুন উপলব্ধি এনে দেয়—ইসলামের সৌন্দর্য কিতাবে যতটা আছে, জীবনে তার প্রতিফলন ততটাই জরুরি। কাগজে নয়, চরিত্রেই ইসলামকে ধারণ করা উচিত। আর এই উপলব্ধিই তাকে আরও বেশি করে নিজেকে একজন প্রকৃত মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার প্রেরণা দেয়।

দশ. সত্যানুসন্ধানী এই তরুণ—যে একদিন সাহসিকতার সঙ্গে দুনিয়াবি নিরাপত্তা, পরিবার ও আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়েছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টির খোঁজে— সে প্রথম আশ্রয় পান নওমুসলিম কল্যাণ ফাউন্ডেশনে, আগেই বলা হয়েছে। যদিও সেখানে থাকার জায়গা ছিল না, কিন্তু তবুও তারা তাকে নিরাশ করেনি। থাকার জায়গা, খাবার, ন্যূনতম সুরক্ষা—সব কিছুর ব্যবস্থাই তারা করে দেন আন্তরিকতার সাথে।

এরপর শিশির ভর্তি হয় আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের একটি কম্পিউটার কোর্সে। এই কোর্স তাকে করে তোলে আত্মবিশ্বাসী। জ্ঞান অর্জনের এই পথচলায় এসময় তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—তাবলিগ জামাতে কাটানো কিছু সময়। এই সময়টুকু তার ইমানি চেতনাকে আরও মজবুত ভিত্তি দেয়। দাওয়াহ, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সেই অভিজ্ঞতা তাকে গড়ে তোলে ভিতর থেকে।

কোর্স শেষ করার পর শুরু হয় তার চাকরি জীবন। এত অল্প বয়সে এই পথে পা রাখা মোটেও সহজ ছিল না। আয়ের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, থাকারও ছিল না নির্দিষ্ট কোনো ঠাঁই। পরিবার বিচ্ছিন্ন এক তরুণ একা, নিঃসঙ্গ, অথচ মন ভরা আশায় তিনি এগিয়ে যান—কারণ তার জানা ছিল, “যে আল্লাহর জন্য ঘর ছাড়ে, আল্লাহ তার জন্য পথ খুলে দেন।”

বর্তমানে শিশির আলহামদুলিল্লাহ একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে কর্মরত। স্বাবলম্বী হয়েছে, জীবন চলছে স্থিতির পথে। অনেকেই আজ তার আত্মত্যাগের গল্প শুনে অভিভূত হয়, কিন্তু খুব কমই জানে—এই হাসিমুখের পেছনে লুকিয়ে আছে কতটা কষ্ট, কতটা একাকিত্ব আর কতটা ত্যাগ!

এগারো.

শিশিরের সেই একান্নবর্তী পরিবার আজও আছে, আগের মতোই রয়ে গেছে তাদের ঘরের কোলাহল, পারিবারিক আনন্দ-উৎসব। কিন্তু সেই পরিচিত সংসারে শিশিরের কোনো ঠাঁই নেই। সেখানে নেই তার নিজের একটি ঘর, নেই তার জন্য রাখা কোনো প্লেট কিংবা বিছানা। তার অস্তিত্ব যেন মুছে গেছে পরিবারের পঞ্জিকা থেকে। যে ঘরে একসময় ছিল মমতা মাখা আদর, আজ তা কেবল স্মৃতির অতলে।

দিনভর স্কুলের ব্যস্ততা, দাপ্তরিক কাজ, শিশুদের হাসিমুখ, সব কিছুই সাময়িকভাবে ভুলিয়ে রাখে বাস্তবের কষ্ট। কিন্তু রাত নামলেই শিশির যেন নতুন এক শূন্যতায় ডুবে যায়। নিঃসঙ্গতার গাঢ় ছায়া ঘিরে ধরে চারপাশ। নিস্তব্ধ রাতের গভীরে তখন সে একা দাঁড়িয়ে হাত তোলে আসমানের মালিকের দরবারে। চোখ ভিজে ওঠে, কণ্ঠ কেঁপে ওঠে ফরিয়াদে।

নিঃসঙ্গ রাতে সে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে—মহা নেয়ামত ইমান পাওয়ার জন্য। আবার সেই প্রভুর কাছেই আকুল হয়ে চায়—যেন তার মা, বাবা, ভাই, বোনরাও একদিন হেদায়াতের আলোয় পথ চলতে পারেন। শিশির জানে, সে যে রাস্তায় এসেছে, সেটি একাকী, কাঁটাময়; তবুও এ পথেই আছে প্রকৃত শান্তি। আর সেই শান্তি যেন একদিন তার প্রিয়জনেরাও খুঁজে পায়—এই কামনাই করে প্রতিটি রাতে, নির্জনে, চোখের জলে।

আরএইচ/