মুসলিম উম্মাহর একতা বয়ে আনুক ‘বিশ্ব ইজতেমা’
জানুয়ারি ১৪, ২০২৩ ৭:২১ অপরাহ্ণ

ধর্মপ্রাণ মুসলমানের হৃদয়ের জমায়েত বিশ্ব ইজতেমা। বিশ্বের কোটি মুসলমান অপেক্ষায় থাকে এই আয়োজনের। ধর্মপ্রাণ মুসলমানের যাপিত জীবনে দীনের আলো ছড়াতে বিশ্ব ইজতেমা এবং দাওয়াত ও তাবলিগের কোনো তুলনা হয় না। করোনা মহামারী কাটিয়ে দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ৫৬তম বিশ্ব ইজতেমা। দেশ-বিদেশ থেকে এসেছেন লাখো আলেমেদীন, দীনের দাঈ ও সাধারণ মুসল্লিরা। হজরতজি ইলিয়াস রহ. এর নিরব বিপ্লবের মেহনত তাবলিগ ও বিশ্ব ইজতেমাকে বিশ্বময় কীভাবে আরো সমৃদ্ধ করা যায়? তা নিয়ে কথা বলেছেন দেশের তিন আলেম। আওয়ার ইসলাম প্রকাশিত ‘ইজতেমা প্রতিদিন’র পাঠকের জন্য তাদের মতামতগুলো তুলে ধরেছেন ‘কাউসার লাবীব’


নিজের প্রয়োজনের চেয়ে সাথি ভাইয়ের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে হবে

দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর সর্বোচ্চ অথরিটি আল হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা আল্লামা সাজিদুর রহমান দাওয়াত ও তাবলিগ নিয়ে বলেন, বিশ্বব্যাপী ইসলামের শান্তির বাণী পৌঁছে দিতে কাজ করছে দাওয়াত ও তাবলিগ। হযরতজি ইলিয়াস রহ. এর এ মিশনকে আরো বেগবান করতে তাবলিগের দাঈদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। দ্বীনের দাঈকে প্রথমেই তাকওয়াবান হতে হবে।

যে বিষয়ে তিনি দাওয়াত দিবেন সে বিষয়েও জ্ঞান থাকতে হবে। পাশাপাশি যে বিষয়ে মানুষকে দাওয়াত দিবো সে আমল নিজের মধ্যে তৈরি করতে হবে। এছাড়া সবচেয়ে বড় যে বিষয় হলো, দাঈর মাঝে থাকতে হবে নবীওয়ালা আখলাক। আমরা এখন মারমুখী হয়ে গিয়েছি। অন্যকে প্রতিপক্ষ মনে করছি। এমন হলে চলবে না। প্রিয় নবীর দেখানো পথে দাওয়াতের কাজ করতে হবে। একজন দ্বীনের দাঈর মাঝে নবীওয়ালা সিফত না থাকলে তার মাধ্যমে দ্বীনের কাজ সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, দাওয়াত ও তাবলিগের অন্যতম একটি সৌন্দর্য্য হলো জোর মিল মহব্বত। বিভিন্ন কারণে আজ নিজেদের মহব্বতে ফাটল তৈরি হচ্ছে। এমনকি দাওয়াতের ময়দানে মারামারির মতো ঘটনাও ঘটছে; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দাওয়াত হতে হবে উত্তম চরিত্র, সুন্দর আচরণ আর নবীওয়ালা কথার মাধ্যমে। দাওয়াতের সময় দাঈর সিরত-সুরত, কথাবার্তা, আখলাক এমন হতে হবে যেন দেখে মানুষ মুগ্ধ হয়ে যায়। ওয়াজ, বক্তৃতা, আলোচনা কিন্তু অনেক সময় মানুষ এককান দিয়ে শোনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়। কিন্তু উত্তম আখলাক হৃদয়ে গেঁথে থাকে। সুন্দর ব্যবহার মানুষকে আকৃষ্ট করে।

সবশেষে তিনি বলেন, যারা ৫৬তম বিশ্ব ইজতেমার এই মহতি মজলিসে এসেছেন তাদেরকে বলবো, এটা অনেক বড় ত্যাগ তিতিক্ষার ময়দান। এই শীতের মাঝে আপনারা সব সুখ কোরবান করে এসেছেন। তাই চেষ্টা করবেন পুরোটা সময় আমলে কাটানোর জন্য। কেননা আল্লাহর রাস্তায় এসেছে আমল করলে সে আমলের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। বেশি বেশি আমল করতে হবে। নিজের প্রয়োজনের চেয়ে সাথি ভাইয়ের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে হবে।

আধুনিক বিশ্বে মিডিয়াও দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম
কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, দাওয়াত ও তাবলিগ ইসলামে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ বিষয়। স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন- ‘হে রাসুল! আপনার রবের পক্ষ থেকে যা আপনার নিকট প্রেরণ করা হয়েছে তা উম্মতের কাছে পৌঁছে দিন।’

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সাহাবিদের প্রতি লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘শোন! তোমাদের উপস্থিতরা যেন তোমাদের পরবর্তী অনুপস্থিতদের কাছে (আমার কথা) পৌঁছে দেয়।’

এ ছাড়া দাওয়াত ও তাবলিগের অনেক ফজিলতও রয়েছে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলি রা.কে লক্ষ্য করে বলেছেন, তোমার হাতে একজন মানুষ হেদায়েতপ্রাপ্ত হওয়া মহান নেয়ামত থেকেও ফজিলতপূর্ণ বিষয়।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেসব মৌলিক দায়িত্ব ছিলো এর অন্যতম, দাওয়াত ও তাবলিগ। আর তিনি তা মৃত্যু পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আঞ্জাম দিয়েছেন।

একইভাবে সাহাবায়ে কেরামও দাওয়াত ও তাবলিগকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। যার কারণে দেখা যায়, প্রায় দেড় লক্ষ সাহাবি আল্লাহর রাসুলের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে নিজেদের জন্মভূমি, পরিবার-আত্মীয়স্বজন সবকিছু ছেড়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলেন মানুষের কাছে এই দ্বীন পৌঁছানোর জন্য। পরবর্তীতে এই ধারায় তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি উলামায়ে কেরাম, মুহাদ্দিসিন, আউলিয়ায়ে কেরাম এই দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি বলেন, আমাদের পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলামের আগমনের ক্ষেত্রে বুযুর্গ ও আউলিয়ায়ে কেরামের দাওয়াত ও তাবলিগের ইতিহাস আমরা পাই।

শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি রহ.এর শাগরিদ হযরতজি মাওলানা ইলিয়াস রহ.এর অন্তরে আল্লাহ তায়ালা এই মেহনত ঢেলে দিয়েছিলেন। তাকে দান করেছিলেন ইখলাস ও মুজাহাদার দৌলত। তিনি ইখলাস ও মুজাহাদার সঙ্গে মুসলমানদের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করতে দাওয়াতের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে ও উলামায়ে কেরামের দিকনির্দেশনার আলোকে এই দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনতের প্রভাব আজ সারা দুনিয়াতে আমরা লক্ষ করছি। তবে দাওয়াতের কার্যক্রম শুধু এক পদ্ধতির মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ এই তাবলিগের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে উপকৃত হচ্ছে, এর সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ।

কিন্তু এর পাশাপাশি লিখনীর মাধ্যমে, ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে এবং আজকের এই আধুনিক বিশ্বে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সঠিকভাবে ইসলামকে সকলের সামনে তুলা ধরা- এটাও বর্তমান সময়ে দাওয়াতের একটি কার্যকর পন্থা।বর্তমানে অনেক তরুণ আলেম, বিজ্ঞ ও প্রবীণ উলামায়ে কেরাম এই পন্থায় লিখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

আমরা আশা করবো, আধুনিক বিশ্বে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো যেহেতু মানুষের কাছে কোন বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটা ব্যাপক ও শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গড়ে উঠেছে এবং এগুলোতে ইসলামের নামে অনেক ভুল তথ্য উপস্থাপিত হচ্ছে, তাই বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম ইসলামের সঠিক বার্তা তুলে ধরতে এই মাধ্যমগুলোতে দাওয়াতের কাজ করবেন।

বেফাক মহাসচিব বলেন, আর তাবলিগের এই কাজ, যা এই নামে সারাবিশ্বে চালু রয়েছে, যার সূচনা করেছিলেন মাওলানা ইলিয়াস রহ. এবং তারপর দায়িত্ব পালন করেছেন তার সাহেবজাদা মাওলানা ইউসুফ রহ. এবং তারপর মাওলানা ইনামুল হাসান রহ.- এই তিন বুযুর্গের উসুল ও নিয়মনীতির আলোকে এই কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়ে আসছিলো।

কিন্তু পরবর্তী কিছু দায়িত্বশীলের কিছুটা গাফলতি, কিছু বিচ্যুতি ইত্যাদির কারণে তাবলিগের সাথী-সঙ্গীদের মাঝে কিছুটা বিভক্তি এসেছে।

এই ক্ষেত্রে আমি-আজ যারা উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে এই কাজ সুন্দরমতো করছেন- তাদেরকে বলবো, যারা এর বাইরে আছে তারা যাতে বোঝে, আপনারা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দরদের সাথে তাদের সামনে বিষয়গুলো তুলে ধরবেন। যেহেতু দীনি বিষয়, কুরআন-সুন্নাহর বিষয় তাই বিপরীত দিকে যারা আছেন তাদেরও উচিত বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের কথা শোনা ও বোঝা। একগুয়েমি করে থাকাটা কারো ক্ষেত্রেই কাম্য নয়। এইভাবে যদি আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে থাকি তাহলে আশা করা যায়, এই বিভক্তির অবসান ঘটবে ইনশাআল্লাহ।

উম্মাহর দরদি উলামায়ে কেরাম এ যুগে দরকার
দেশের অন্যতম ইসলামি আলোচক মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী বলেন, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব ইজতেমা ঐক্যের অন্যতম প্লাটফর্ম।

শরিয়তে ইসলামে মুসলিম মিল্লাতের ঐক্যের মুজাহারা ও বহির্প্রকাশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যা দাওয়াত ও তাবলিগের বিশ্বব্যাপী ইজতেমাগুলোর মাধ্যমে মুসলমানদের ঐক্য, আমলি সৌন্দর্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সারাবিশ্বে প্রস্ফুটিত করে। দীনের দাওয়াত ও তাবলিগের কাজকে আরো অগ্রসর করতে, নবীজি সা. এর রেখে যাওয়া দিনকে সাধারণ মুসলমানদের কাছে পৌঁছে দিতে মাওলানা ইলিয়াস রহ. এই মেহনত শুরু করেন।

এই মিশন আল্লাহ তাআলা এমনভাবে কবুল করেছেন যে, এটা এখন সারা বিশ্বের মুসলমানদের ঈমান ও আমলের সংশোধন, আত্মশুদ্ধি ও তালিম-তায়াল্লুমের অন্যতম মাধ্যম। হযরত সুলাইমান আ.এর মসজিদ নির্মাণ যেভাবে আজও টিকে আছে তেমনই হযরত ইলিয়াস রহ.এর ইখলাসের বদৌলতে এই মিশন ও মেহনত আজ পর্যন্ত অব্যাহত আছে।

এটা তাঁর ইখলাস ও একনিষ্ঠতার কবুলিয়্যাতের প্রমাণ। মাওলানা ইলিয়াস রহ. দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ উলামায়ে কেরামের তত্ত্ববধানে আঞ্জাম দেওয়ার দিকনির্দেশা দিয়ে গেছেন। কেয়ামত পর্যন্ত নিয়াবতের যে জিম্মাদারি উলামায়ে কেরামের ওপর রয়েছে তা অনস্বীকার্য। সুতরাং প্রত্যেক দাঈর জন্য জরুরি হলো, শুধু দাওয়াতের কাজের জন্য নয় বরং ধর্মীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের মতকে প্রাধান্য দেওয়া। কেননা উলামায়ে কেরামের কাছেই রয়েছে ইলমে দীনে রৌশনি।

এই ইসলামি আলোচক বলেন, সাধারণ মানুষ যারা বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্ররণ করবেন তারা শেখার জন্য, নিজেকে মিটানোর জন্য আসবেন। প্রতিটি দাঈর এই প্রতিজ্ঞা করা উচিত, ইজতেমার এই পুরো সময়টুকু যেন গিবত, পরনিন্দাসহ কোন ধরনের গুনাহের কাজ না হয়। বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণের এই সফর যেন শুধু আখেরি মুনাজাতে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই শেষ না হয়ে যায়।

বরং ইজতেমার বয়ান-আলোচনা ও হেদায়েতকে নিজের জীবনের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করা একান্ত জরুরি। দূর-দূরান্ত থেকে যারা এসেছেন, আসবেন তাদের সম্মান করা, খেদমত করা প্রতিবেশী দাঈর ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। তাই তাবলিগের সাথীভাইদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, যারা মুহাজির হয়ে ইজতেমায় শরিক হয়েছেন তাদের সম্মান ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা যেন আনসার হয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। আমাদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, তাবলিগের এই মহতি আয়োজন ‘বিশ্ব ইজতেমা’ যেন আমাদের ঐক্যের মাধ্যম হয়। কোনভাবেই যেন অনৈক্য না আসে। মাসায়েলের ক্ষেত্রে এখতেলাফ (মতভিন্নতা) থাকতে পারে, কিন্তু এফতেরাক (বিচ্ছিন্নতা) কাম্য নয়। কারণ অনৈক্য শরিয়তে ইসলামের সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ।

-এটি