শনিবার, ২৫ মে ২০২৪ ।। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ ।। ১৭ জিলকদ ১৪৪৫


ক্রিকেট উন্মাদনা: অনলাইন জুয়ায় বখে যাচ্ছে তরুণরা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| আদিয়াত হাসান ||

একটা সময় বাজির টাকা লেনদেন নিয়ে মারামারির খবর শোনা যেত। লোক জানাজানি হলে নানা ঝামেলায় পড়তে হতো বাজিকরদের।  ফলে নিরাপদ বাজি খেলার জন্য বাজিকররা আন্তর্জাতিক বেটিং সাইটগুলোর দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। এখন অনেকেই অনলাইনে বেটিং করছে।

চলছে এশিয়া কাপ। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল প্রথম পর্ব থেকে বিদায় নিয়ে দেশে ফিরে এসেছে। দেশে কমেছে ক্রিকেট উন্মাদনা। কিন্তু ভিন্নভাবে বললে ক্রিকেট নিয়ে তৈরি হওয়া অনলাইন জুয়া ওয়েবসাইটগুলো আরো স্বরব হয়ে উঠেছে। কেননা এখন চলছে সুপার ফোর। এরপর আসছে নকআউট পর্ব। এভাবে এগোলেই বাড়বে জুয়ার উত্তেজনা।

আসলে জুয়ার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগেও জুয়া খেলার প্রচলন ছিল। তখন লোকেরা জুয়া-বাজি ইত্যাদিতে ভীষণ অভ্যস্ত ছিল। প্রায় সময় লোকেরা তাদের পরিবার ও সম্পদের ওপর বাজি ধরতো। হেরে গিয়ে চিন্তাক্লিষ্ট ও হতাশাগ্রস্ত হতো। সে দেখতো তার সম্পদ অন্যের হাতে। ফলে বিজয়ীর সঙ্গে বিরোধ, শত্রুতা ও ক্ষোভ-দ্বন্ধ শুরু হতো।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘বলা হতো, উটের জুয়াড়িরা কোথায়? তখন দশজন প্রতিযোগী একত্রিত হতো এবং জুয়ার উটটির ক্রয়মূল্য হিসেবে দশটি উটশাবক নিৰ্দ্ধারণ করতো। তারা জুয়ার পাত্রে তীর স্থাপন করে সেটিকে চক্কর দেয়াতো, তাতে একজন বাদ পড়ে নয়জন অবশিষ্ট থাকতো। এভাবে প্রতি চক্করে একজন করে বাদ পড়ে শেষে মাত্র একজন অবশিষ্ট থাকতো এবং সে বিজয়ী হিসেবে তার শাবকসহ অন্যদের নয়টি শাবকও লাভ করতো। এতে নয়জনের প্রত্যেকে একটি করে শাবক লোকসান দিতো। এটাও এক প্রকার জুয়া। ’ -আদাবুল মুফরাদ: ১২৭১।

বর্তমানে জুয়া-বাজির জন্য বিভিন্ন রকমের আসর বসে বিভিন্ন দেশে। কোথাও হাউজি আবার কোথাও সবুজ টেবিল নামে পরিচিত। ক্রিকেট ও অন্যান্য খেলাধুলার প্রতিযোগিতায়ও বাজি ধরা হয়। এগুলোর সবই হারাম। জুয়া হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, শুধু নাম পরিবর্তনের কারণে বস্তু ও মূল প্রকৃতি এবং হুকুম পরিবর্তন হয় না। কাজেই প্রাচীনকালে প্রচলিত জুয়া সম্পর্কে যে হুকুম প্রযোজ্য ছিল, আধুনিককালের সব ধরনের জুয়ার ক্ষেত্রেও সেসব হুকুম সাব্যস্ত হবে।

জুয়াকে আরবিতে ‘আল-কিমার’ ও আল-মায়সির’ বলা হয়। এমন খেলাকে ‘আল-কিমার’ ও আল-মায়সির’ বলা হয়, যা লাভ ও ক্ষতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। অর্থাৎ যার মধ্যে লাভ বা ক্ষতি কোনোটাই স্পষ্ট নয়। ইসলামের আবির্ভাবের আগে ও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের সময় তৎকালীন মক্কায় নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন ছিল। তিনি সবগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন।

জুয়া সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো, তাহলেই তোমরা সফলকাম হতে পারবে। শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ আদায়ে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না। ’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৯০-৯১)

আবদুুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘বাবা-মায়ের অবাধ্য সন্তান, জুয়ায় অংশগ্রহণকারী, খোঁটাদাতা ও মদ্যপায়ী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না’ -সুনানে দারেমি: ৩৬৫৬।

কিছু লোকের কাছে মনে হতে পারে, জুয়া একটি লাভজনক ব্যবসায়। কিন্তু এর সামান্য কিছু লাভ থাকলেও ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়ে বহুগুণে বেশি। যেমন, সূরা বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াতে এসেছে, ‘হে মুহাম্মদ! তারা আপনাকে মদ এবং জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এ দুটোর মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর এতে মানুষের জন্য সামান্য কিছু উপকারিতাও রয়েছে। তবে এগুলোতে উপকারিতা অপেক্ষা ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।’

তাই সব ধরনের জুয়া-বাজি ইসলামে অবৈধ। জুয়া-বাজি থেকে প্রাপ্ত সবকিছু হারাম। হারাম ভোগ করে ইবাদত-বন্দেগি করলে, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেন না। তাই মুসলমান হিসেবে সব ধরনের জুয়া-বাজি থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।

বর্তমানে আশঙ্কাজনক হারে তরুণরা মরণনেশা জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। করোনা মহামারিতে অনেক শিক্ষার্থীই নিয়ন্ত্রণহীন স্মার্টফোনের দৌলতে মেতে উঠেছে সর্বনাশা অনলাইন জুয়ায়। ক্রিকেট, ফুটবল ও অন্যান্য খেলার একেকটি আসর কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। জুয়ার মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। গণমাধ্যমে উঠে এসেছে জুয়ার মাধ্যমে দেশের টাকা বিদেশে পাচারের সংবাদ। মাদকের মতোই জুয়ার ভয়াবহতা এখন দৃশ্যমান।

ইতোমধ্যে অনলাইন জুয়া সাইটগুলো বিটিআরসি বন্ধ করছে। প্রশাসন কঠোর হচ্ছে। ক্যাসিনো কাণ্ডে প্রশাসনের ভূমিকা সত্যিই প্রশংসনীয়। এর পাশাপাশি প্রত্যেক পরিবারকেও সচেতন হতে হবে। জুয়ার বিরুদ্ধে সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে দেশের ইমাম, খতিব ও ইসলামী স্কলারদের। একমাত্র ধর্মীয়, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমেই এসব বন্ধ করা সম্ভব।

কেএল/


সম্পর্কিত খবর


সর্বশেষ সংবাদ