fbpx
           
       
           
       
তাখাসসুসের মানোন্নয়ন: আদব বিভাগগুলো কতটা ‘শিক্ষামান’ ধরে রাখতে পারছে?
এপ্রিল ২৮, ২০২২ ১:৪৬ অপরাহ্ণ

।।আদিয়াত হাসান।।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও আদর্শ মানুষ গঠনের ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রাখছে দেওবন্দি চেতনায় গড়ে ওঠা কওমি মাদরাসাগুলো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সিলেবাসে একজন ছাত্র দাওরায়ে হাদিস কমপ্লিট করার পর নিতে হয় বড় একটি সিদ্ধান্ত। কেউ বেছে নেয় খেদমত বা ব্যবসা-বানিজ্যসহ নানা পথ। মেধা ও ফুরসত কুলালে কেউ নিজেকে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য ভর্তি হয় উচ্চতর শিক্ষার সৌরভময় উদ্যান তাখাসসুস বিভাগে; যে বিভাগগুলো জাতিকে উপহার দেয় একেকজন গবেষক ও চিন্তক আলেম।

তবে সরেজমিনে দেখা যায় বিভিন্ন কারণে ক্রমেই এ তাখাসসুস বিভাগগুলো আস্থা হারাতে বসেছে। বিশেষ করে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ইফতা ও আদব বিভাগগুলো চিন্তায় ফেলে দিচ্ছে দেশের চিন্তক শিক্ষাবিদদের। ধীরে ধীরে প্রকট হওয়া এ সঙ্কট কেন তৈরি হলো? এর সমাধানই বা কী? দেশের কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডগুলো এ ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাখতে পারে? এসব বিষয়ে কথা বলেছিলাম মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল করা ইসলামিক স্কলার, রাজধানীর মারকাযুল লুগাতিল আরাবিয়্যা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও আরবি ভাষাবিদ শায়খ মুহিউদ্দীন ফারুকীর সঙ্গে।

‘এ সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমেই যেসব প্রতিষ্ঠানে তাখাসসুস বিভাগ রয়েছে তাদেরকে উদ্যোগী হতে হবে। সচেতন হতে হবে। তাখাসসুসের হাকীকত বুঝতে হবে। তাদের চিন্তার মানোন্নয়ন করতে হবে’ বলে মনে করেন এ শিক্ষাবিদ।

তার মতে, প্রথমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, ‘পাশের মাদ্রাসায় একটি তাখাসসুস বিভাগ আছে সেজন্যই কি আমার মাদ্রাসায় এ বিভাগ খোলা? মাদ্রাসায় একটি তাখাসসুস বিভাগ থাকলে মাদ্রাসার ভাবমূর্তি ভালো থাকবে সেজন্য খোলা? নাকি বাস্তবিকভাবেই তাখাসসুস নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ও সাধ্য থেকে খোলা!’ এই বিষয়টি স্পষ্ট হলে সব কিছু সহজ হয়ে যাবে।

এ সঙ্কটটির গভীরের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাদের বড় একটি সমস্যা হলো, আমরা প্রত্যেকেই নিজেকে মনে করি নতুন একটি মানহাজের প্রণয়নকারী, শিক্ষাসংস্কারের একজন প্রবক্তা। এটি আমাদের কওমি মাদরাসা অঙ্গনকে কলুষিত করে তুলছে। তাই তাখাসসুসকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অবশ্যই বোর্ড বা কর্তৃপক্ষ থাকা উচিত। তবে দুঃখের বিষয় হলো এ পর্যন্ত আমাদের দেশে কেউ এই উদ্যোগটি গ্রহণ করেনি, করতে পারেনি। এমনকি যে শিক্ষাবোর্ডগুলো আছে তারাও দেশে মানসম্পন্ন তাখাসসুস বিভাগ গড়ে তোলার জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন নি। তাই আমাদের এমন একটি প্রতিষ্ঠান আগে দরকার, যে প্রতিষ্ঠান দেশের তাখাসসুস বিভাগগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে মানোত্তীর্ণের ভিত্তিতে কোনোটা বন্ধ করা অথবা কোনোটা চালু রাখার সিদ্ধান্তগুলো সাহসের সঙ্গে নেবে।

‘আমাদের দেশে অধিকাংশ জায়াগা আদব বিভাগের নামে যা চলমান তাকে আদব বিভাগ না বলে ভাষা প্রশিক্ষণ বিভাগ বলা যেতে পারে। এই ভাষা প্রশিক্ষণ বিভাগের জন্য যিনি বিভাগ খুলবেন প্রথমে তাকে এই ভাষায় দক্ষ হতে হবে। এবং প্রশিক্ষণ দেয়ার মত যোগ্যতা সমেত দক্ষ হতে হবে। অনেকে দেখা যায়, আদব বিভাগ নাম দিয়ে একটি তাখাসসুস বিভাগ খুলে বসে থাকেন। তিনি নিজেও আদবে পারদর্শী নন। পরবর্তীতে আমাদের কাছে শিক্ষক চান এবং বলেন, ‘কোন রকম একজন হলেই হবে। মাদ্রাসায় আদব বিভাগ থাকলে দেখা গেছে কিছু ছাত্র পাওয়া যায়, সেজন্যই এ বিভাগ খোলা। আসলে এ বিষয়গুলো আমাদেরকে খুবই পিছিয়ে দিচ্ছে। যত্র তত্র আরবি সাহিত্য বিভাগের নামে হজবরল এক অধ্যায় তৈরি হচ্ছে’- বলেন শায়খ মুহিউদ্দীন ফারুকী

তার পরামর্শ হলো, প্রথমে বিভাগের নামকরণটা মান নির্ণয় ও স্তর সাপেক্ষে হওয়া উচিত। আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ বিভাগ, প্রাথমিক আরবি ভাষা চর্চা বিভাগ, মাধ্যমিক আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ বিভাগ, উচ্চমাধ্যমিক আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ বিভাগ, উচ্চতর আরবি ভাষা ও সাহিত্য গবেষণা বিভাগ।

নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এ গবেষক আলেম বলেন, আমরা আমাদের মেধাবী ছাত্রদেরকে নিয়ে বিভাগ খুলেছি, “আরবি ভাষায় উচ্চতর ডিপ্লোমা” বিভাগ। গত বছর থেকে দেখছি অনেকেই তাদের বিভাগের নাম এটি দেয়া শুরু করেছে। অথচ আমরা এই বিভাগটি সর্বোচ্চ মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে পরিচালনা করি। যারা এই নামটিকে ব্যবহার করছে তারা কি ছাত্র নেয়ার ক্ষেত্রে সেভাবে বাছাই করে নিচ্ছে! যাদেরকে এ বিভাগে নেয়া হচ্ছে সে ছাত্রগুলো কি আসলেই আরবি ভাষায় উচ্চতর ডিপ্লোমা করার উপযুক্ত! হেদায়াতুন্নাহু-কাফিয়া জামাতের ছাত্রদের নিয়ে গড়ে তোলা আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ বিভাগের নাম যদি উচ্চতর আরবি ভাষা ডিপ্লোমা বিভাগ দেয়া হয় তাহলে এটি খুবই আফসোসের বিষয়। আসলে এগুলো একটি অনাচারের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কোন নাম কখন দেওয়া যেতে পারে; শিক্ষাবিষয়ক এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটিও অনেকে খেয়াল রাখছেনা।

তার মতে, বিভাগ খোলার প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে জাতিকে ভাল কিছু দেয়া এবং যোগ্য হিসেবে গড়ার ইচ্ছা মনে জাগিয়ে তুলতে হবে। আপনি বিশ্ব শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে যদি দেখেন, তাহলে কোথাও এত পরিমাণে তাখাসসুস বা উচ্চতর পড়াশোনার জন্য বিভাগ পাবেন না, যেটা আমাদের দেশে কওমি অঙ্গনে আছে। এর কারন হল আমরা প্রত্যেকেই চাই যে, আমার একটা মকতব থাকলেও তার সঙ্গে যেন একটি তাখাসসুস থাকে। এ প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের মানবিক ও মানসিক উন্নয়ন সাধন করতে হবে।

বোর্ডগুলোর সার্বিক বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেফাকসহ দেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড উচ্চতর তাখাসসুস বিভাগের জন্য একটি কমিটি গঠন করে নির্দিষ্ট কিছু মান নির্ণয় করে দিতে পারে। এক্ষেত্রে দেশের যেসব প্রতিষ্ঠানকে আদর্শ হিসেবে নেয়া যায় সেসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সহযোগিতা নিয়ে মান নির্ণয়ের মাপকাঠি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি সেটাকে সারাবছর নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করতে পারে। তাহলে এ সঙ্কট ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে বিষয়ে তাখাসসুসের ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে নেয়া যায় তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বোর্ডগুলো বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে। তৈরী করতে পারে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক। যাদের ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠবে মানসম্মত তাখাসসুস বিভাগ।

-কেএল

সর্বশেষ সব সংবাদ