শিরোনাম :
অনলি ফর ম্যান: ঝরঝরে গদ্যে যাপিত জীবনের বিন্দু বিন্দু অতীত অনুতাপ
ডিসেম্বর ২৬, ২০২১ ৯:৩১ অপরাহ্ণ

সাইফুল্লাহ সুবহান।।

পরিবার পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। পুরুষের ঘামে নারীর প্রেমে গড়ে ওঠা আদিমতম পার্থিব সংগঠন।

পরিবারে নারী পুরুষ শ্রমের ক্ষেত্র ও ধরনে বিচিত্র। বিচিত্র তাদের স্বভাব ও অনুভবে, সতর্কতা ও সহমর্মিতায়, আনন্দ ও দুঃখবোধে। এ বৈচিত্র্য সত্ত্বেও উভয়ের মাঝে আছে এক ঐক্য। কাজ ও পরিশ্রমের ঐক্য। উভয়ের কাজই পরিশ্রমের, উভয়ের শ্রমই সাধনার এবং পরিবার গঠনে সমান গুরুত্বের। এই জায়গাটায়ই ভুল করে পৃথিবীর প্রায় নব্বই ভাগ পুরুষ! নরীর ঘরোয়া কাজ তাদের চোখে পরিশ্রম হয়ে ওঠে না। মূল্যায়িত হওয়া তো দূরের কথা শান্তনাধর্মী সামান্য প্রশংসাও পায় না। ফলে নারী পুরুষের বৈচিত্র্য পরিণত হয় পুরুষ নারীর পার্থক্যে। তৈরি হয় বৈষম্যের দেয়াল। ভেঙ্গে যায় সংসার। এই ভাঙ্গন রোধে নারীর করণীয় নিয়ে পৃথিবী জুড়ে এ যাবৎ কথা হয়েছে বিস্তর। ‘সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে’-র মতো আপ্তবাক্যের প্রচলন পেয়েছে মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু ভাঙ্গনের দায় কী কেবলই নারীর? পুরুষের কি কোনোই দায় নেই? এর রোধকল্পে কোনো দায়িত্ব কী নেই পুরুষের? অবশ্যই আছে! সেই দায় এবং দায়িত্বেরই সহজ সরল প্রাঞ্জল সুবিন্যস্ত সুরভিত বিবরণ ‘অনলি ফর ম্যান’।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধির কাল একবিংশ শতাব্দী। অধিকাংশ ধ্বংসের ও সামান্য কিছু সৃজনের অসামান্য ও অকল্পনীয় সব যন্ত্রপাতিতে সয়লাব মানুষের সভ্যতা। তবে এত উন্নতি অগ্রগতি সত্ত্বেও সভ্য মানুষের প্রথম পরিচয় পরিবার এখন সংকটের মুখে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে চলে পারিবারিক বন্ধন এখন চূড়ান্ত অবনতি ও বিলুপ্তির পথে। প্রতিদিন বাড়ছে দাম্পত্য বিচ্ছিন্নতা। সংসার ভাঙ্গার হিড়িক পড়ে গেছে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে। বিজ্ঞানমোহান্ধ আধুনিক যান্ত্রিক মানুষেরা এ ব্যাপারে যেন ভীষণ উদাসীন। এদিকে দৃষ্টি দেবার সুযোগ বা ইচ্ছা কোনটিই যেন নেই কারো। সময় যখন এমন প্রতিকূল ও ভয়াবহ, সে জায়গায় দাঁড়িয়ে ‘অনলি ফর ম্যান’ একটি প্রশংসার্হ ব্যাতিক্রমি উদ্যোগ। লেখক অনুবাদক প্রকাশক সকলেই সাধুবাদ পাওয়ার উপযুক্ত।

‘অনলি ফর ম্যান’ বইটি শুরু হয়েছে কতগুলো ‘বিস্ময়কর প্রশ্ন’ দিয়ে। বিস্ময়কর কারণ, প্রশ্নগুলো পড়াকালীন সংসারী পাঠক মাত্রেরই মনে হবে এ তার ঘরের কথা, এবং একান্ত তার সংসারেরই আলাপন। উদাসীনতায় এতদিন ভাবনায় আসেনি। খেয়াল করা হয়নি। আজ পড়তে গিয়ে চলচ্চিত্রের মতো মনের পর্দায় একের পর এক যেন সব ভেসে উঠছে।

এভাবে চলচ্চিত্রের মতো ভাসতে ভাসতে এক সময় শেষ হবে প্রশ্ন সম্ভার। নানা শিরোনাম উপশিরনামে সামনে আসবে সে প্রশ্নমালারই উত্তর সমাহার। সে উত্তর সাজানো গোছানো পরিশীলিত পরিচ্ছন্ন। হৃদয় নাড়া দেয়া নানা উদাহরণ উপমায় ভরপুর। চমৎকার ভাষা আর অনিন্দ্য সুন্দর রচনা শৈলীতে সেসব উদাহরণ উপমা সজীব ও জীবন্ত। ভাবিত করার শক্তি সমৃদ্ধ। আবেগ আলোড়িত করার ক্ষমতা সম্পন্ন।

মূল বইটি আরবী ভাষায় রচিত। লেখক আদহাম শারকাবি কথা বলার ভঙ্গিতে রচনা করেছেন বইটি। পড়াকালে মনে হয় যেন লেখক সামনে বসে কথা বলছেন অনবদ্য ভাষায় । কথা বলছেন সরাসরি পাঠককে সম্বোধন করে। সে সম্বোধনের ধরন এতই চিত্তাকর্ষক, শুরু থেকে শেষতক মনোযোগ আটকে থাকে অখণ্ড নিরবিচ্ছিন্নতায়।

মূলের এ আকর্ষণ অনুবাদেও অনুসৃত হয়েছে পূর্ণ সতর্কতায়। ভাষার ক্ষেত্রেও মূল লেখকের আবেগ ও আবেদন এবং চমক ও গমক বজায় রাখতে অনুবাদক বেশ সচেষ্ট ও যত্নবান। এই চেষ্টা ও যত্নের গুণে অনুবাদ হয়েছে চমৎকার ঝরঝরা। অনুবাদ হয়েও অর্জন করেছে সৃষ্টিশীলতার সৌন্দর্য। এ অনুবাদক একজন ইবরাহীম জামিলের প্রশংসনীয় সাফল্য।

প্রায় তিনশ পৃষ্ঠার বই। কলেবরের বিবেচনায় খুব ছোট হয়তো না। কিন্তু যে জীবনের বয়ান এ বই জুড়ে তার তুলনায় এ কলেবর কিছুই না। খুবই সামান্য।

অসাধারণ ঝরঝরে গদ্যের বইটি পড়তে পড়তে হয়তো যাপিত জীবন এসে দাঁড়াবে দৃষ্টির পরিসরে। চোখের কোনে জমে ওঠবে বিন্দু বিন্দু অতীত অনুতাপ। সে অনুতাপে তাপিত হৃদয় জ্ঞানঋদ্ধ সংসারী পুরুষের আচার আচরণে আসবে সংযম ও পরিশীলন। দৈনন্দিন জীবন যাপনে আসবে কল্যাণকর পরিবর্তন। একবিংশ শতাব্দীর অভাবনীয় বৈজ্ঞানিক সমৃদ্ধির এ যুগে যে পরিবর্তনের তৃষ্ণায় তৃষিত পৃথিবীর অসংখ্য অগণিত পরিবার!

বই: অনলি ফর ম্যান
লেখক: আদহাম শারকাবি
অনুবাদক: ইবরাহীম জামিল
প্রকাশক: দারুল আরকাম
পৃষ্ঠা: ২৭২
মূল্য: ৪০০ টাকা

সর্বশেষ সব সংবাদ