fbpx
           
       
           
       
ছোট্টবেলার পড়াশোনায় ছিলো ভিন্ন রকমের স্বাদ: মুফতি তাকি উসমানি
নভেম্বর ৩০, ২০২১ ৭:২৮ অপরাহ্ণ

[জামিয়া দারুল উলুম করাচির মুখপাত্র ‘ماہنامہ البلاغ মাহনামা আল-বালাগ’ এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত বিশ্বনন্দিত আলেম, স্কলার আল্লামা তাকি উসমানির আত্মজীবনী আওয়ার ইসলামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ।

এ বিষয়ে আল্লামা তাকি উসমানি আনুষ্ঠানকিভাবে আওয়ার ইসলামকে ভাষান্তর করে প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন। গত ২ জানুয়ারি জামিয়া দারুল উলুম করাচির তাখাসসুস ফিল ইফতার শিক্ষার্থী, আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকমের শুভাকাঙ্ক্ষি উমর ফারুক ইবরাহীমীর মাধ্যমে আল্লামা তাকি উসমানি ও পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মজীবনী ‘ইয়াদে’ অনুবাদের অনুমতি চাওয়া হলে তারা খুশি মনে রাজি হন এবং আওয়ার ইসলামকে ধন্যবাদ জানান বাংলাভাষায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য।

আল্লামা তাকি উসমানির নতুন ধারাবাহিক আত্মজীবনী یادیں ইয়াদেঁ  মাহনামা আল-বালাগে সফর ১৪৩৯ হিজরি, নভেম্বর ২০১৭ ইংরেজি মাস থেকে। আওয়ার ইসলামে লেখাটি প্রতি রোববার ও বুধবার প্রকাশ হবে ইনশাল্লাহ। আজ ছাপা হলো ৫৪ তম কিস্তি। অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ উমর ফারুক ইবরাহীমী।]


পূর্ব প্রকাশের পর: ইতিমধ্যে আমার বয়স নয় বছর পূর্ণ হয়ে গেছে। ওদিকে ১৩৭৪ হিজরির শাওয়ালে আমাদের নতুন শিক্ষাবর্ষও শুরু হয়ে গেছে। সে বছরও (১৩৭৪-৭৫ হিজরি) আমাদের শরহেজামী, মাকামাতে হারীরী, কানযুদ্দাকাইক, উসূলুশ-শাশী, কুতবী, শরহে তাহযীব এবং আল-বালাগাতুল ওয়াযিহাহ সহ সকল কিতাব হযর‍ত মাওলানা সাহবান মাহমূদ সাহেবের কাছেই ছিলো।

পূর্বের ধারাবাহিকতায় আমরা তার চমতকার পাঠদানশৈলী থেকে উপকৃত হতে থাকলাম। হযরত সম্পর্কে আমি ইতিপূর্বে লিখেছি যে, তখন তার কাব্য-সাহিত্যের প্রতি ভীষণ আকর্ষণ ছিলো।

তিনি নিজেও উচ্চাঙ্গসংগীত আবৃত্তি করতেন। শরহেজামীর মতো কিতাবেও তিনি তার কাব্যিক রঙ ছড়াতেন। সে বছর তার কাছে আল-বালাগাতুল ওয়াযিহাহ পড়ার সময়ে তার কাব্যিক আকর্ষণ আমাদের দরসকে দ্বিগুণ প্রাণবন্ত করে তুলেছিলো। খোদ আল-বালাগাতুল ওয়াযিহাহ কিতাবটিতেই যেনো সাহিত্যের ফুলঝুরি ছড়ানো হয়েছে। তার উপর হযরত ফাসাহাত, বালাগাতের উদাহরণসমূহ উর্দু শে’র থেকে দিতেন। যার ফলে গোটা দরস যেনো বসন্তের পুষ্পোদ্যানে পরিণত হতো।

যেমন আমার এই মূহুর্তে মনে পড়ছে, হযরত تعقید معنوی এর উদাহরণ দিতে গিয়ে মু’মিনের এই শে’রটি শুনিয়েছিলেন-
خیال خواب راحت ہے علاج اس بدگمانی کا۔
وہ ظالم قبر میں مومن مراشانہ بلاتا ہے۔

হযরত বলেছিলেন, এই শে’রের প্রথম অংশে মূলত প্রশ্নবোধক চিহ্ন হবে। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত এতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন সংযোজন করা না হবে অথবা প্রশ্নের মত করে পড়া না যাবে এর মতলব ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট হবে না।

মোটকথা- আমরা তার কাব্য ও সাহিত্যপ্রীতি থেকে অনেক অনেক উপকৃত হয়েছি। বিকেলে আমরা বাসায় ফিরতাম এবং মাগরিব অবধি ব্র‍্যান্স গার্ডেন অথবা পলোগ্রাউন্ডে কিছুক্ষণ খেলাধুলা ও পায়চারি করে ফের মুতালা’আ ও পড়াশোনায় লেগে যেতাম। কখনো আমাদের ঘরে ভাই-বোনদের মিলনমেলা হতো।

সেখানে বেশিরভাগ শে’র বাহাস এবং কবিতাবৃত্তির আসর বসতো। সেই আসরে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে আমার বেশি বেশি শে’র ও কবিতা মুখস্ত করার আগ্রহ জন্মাতো। তখন হাফিজ জালান্ধারির “শাহনামা ইসলাম” ঘরে আসলে আমরা ছোট আপাকে ঘিরে বসতাম। তিনি আমাদেরকে তার সুবিন্যস্ত সুরেলা আবৃত্তির দ্বারা আমাদেরকে মুগ্ধ করতেন।

সে আওয়াজ আজও যেনো আমার কর্ণকুহরে ধ্বনিত হয়। শাহনামা ইসলামের সাথে আমার এতটাই হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল যে তার বহু পৃষ্ঠা আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো। বাস্তব সত্য কথা হচ্ছে, গাযওয়ায়ে বদর, গাযওয়ায়ে উহুদ এবং গাইওয়ায়ে আহযাবের বিশদ ঘটনাপঞ্জি আমি কিতাবে অনেক পরে পড়েছি। শাহনামা’র কল্যানে আমি তার আগেই এসব ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে জেনে গিয়েছিলাম।

এছাড়াও ঘরে কেউ কোনো কাব্য-সাহিত্যের বই নিয়ে আসলে সবাই জড়ো হয়ে বসে তার শিল্প-সাহিত্যকে উপভোগ করতাম। কখনো মাওলানা মানাযির আহসান গিলানি রহ. এর “আন্নাবিয়্যুল খাতিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” পড়া হতো। কখনো মাওলানা আবুল কালাম আযাদের “গোবারে খাতির” আবার কখনো মাওলানা আজগর হুসাইন সাহেবের ” খোয়াব শিরিঁ”।

কখনো পাতরাস বুখারির “মাযাহিয়্যা মাযাবিন” পড়া হতো। মোটকথা- আমাদের ভাইবোনদের এই মসলিস ও মিলনমেলাগুলো অনেক রঙিন ও আকর্ষণীয় হতো। আর যদি কখনো আব্বাজানের সাহচর্যের সুযোগ হতো তবে তো আমরা সোনায় সোহাগা। এসবের প্রতি তখন আমরা থোড়াই কেয়ার করতাম।

আব্বাজানের সাথে আমাদের যতটুকু সময় কাটতো বড় প্রফুল্লতা ও উৎসবের মাঝেই কাটতো। আব্বাজান আমাদের সাথে মুক্তপ্রাণে মিশে যেতেন। কখনো তিনি বুযুর্গদের শিক্ষণীয় ঘটনা শোনাতেন। কখনো ইসলামের ইতিহাসের ভাণ্ডার মেলে ধরতেন। আবার কখনো তার দৈনন্দিনের ব্যস্ততা ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আমাদেরকে সম্যক অবগত করতেন।

সেসময়ে রেডিও পাকিস্তানেও বড় উপকারী কিছু পোগ্রাম হতো। দিনের শুরু হতো মরহুম কারী যাহের কাসেমি সাহেবের হৃদয়কাড়া তিলাওয়াত দিয়ে। তারপর হযরত মাওলানা ইহতিশামুল হক থানবী রহ. এর ধারাবাহিক দরসে কুর’আন অনুষ্ঠিত হতো। সেসময়ের রেডিও পাকিস্তানের ডাইরেক্টর জনাব যুলফাকার আলী বুখারীর অনুরোধে প্রতি শুক্রবারে আব্বাজান রহ. এর মা’আরিফুল কুরআনের দরসও হতো। এছাড়া অন্যান্য পোগ্রামগুলোতেও আজকালের মতো এতো বেহুদোমি ও বেহায়াপনা ছিলোনা।

রেডিওতে রুচিশীল সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যাপক উপস্থিতি পরিলক্ষিত হতো। বেশিরভাগ পোগ্রামই জ্ঞানভাণ্ডারে সমৃদ্ধ থাকতো। “চিসতান” নামে একটি পোগ্রাম ছিলো যেখানে সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। এই চ্যানেলে প্রতি সপ্তাহে কাব্য উৎসবও হতো। সেখানে দেশসেরা প্রথিতযশা সব কবি-শিল্পীরা অংশ নিতেন।

হাফী্য ঝালান্ধরী, আদীব সাহারানপুরী, হেমায়াত আলী শায়ের, শায়ের লক্ষ্মনভী, মাহের আল-কাদেরী, রঈস আমরোহী, কমর জালালাভী, আরম লক্ষ্মনভী প্রমুখ কবি-শিল্পীরা তো প্রতি সপ্তাহেই সেই আসরে অংশ নিয়ে পারফরম্যান্স করতেন এবং শ্রোতাদের কবিতা শোনাতেন। আমরা সব ভাইবোনরা আগ্রহভরে রেডিওতে সেগুলো শুনতাম। কখনো হিন্দুস্তান থেকেও কবি-শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। অতিথি শিল্পীদের মধ্যে জিগার মুরাদাবাদী, শাকীল বাদায়ূনী এবং জগন্নাথ আজাদকে আমরা সেই পোগ্রামে প্রথমবারের মতো শুনতে পেয়েছিলাম।

এখন মনে হচ্ছে, সেসময়ে আমাদের আনন্দ-ফুর্তির যাবতীয় আয়োজন ইলমী এবং সাহিত্যকেন্দ্রীক ছিলো। যার ফলে শিশু-কিশোরদের জ্ঞানগরিমা বৃদ্ধি পেতো এবং শিল্প-সাহিত্যে উত্তরোত্তর উৎকর্ষ সাধন হতো। সেসব ঘরোয়া মজলিস ও আয়োজনের কারণে আমার নিজেরও বই-পুস্তকের প্রতি আকর্ষণ বেড়েছিলো।

চলবে ইনশাআল্লাহ…..

-এটি