শিরোনাম :
‘সোশ্যাল মিডিয়া গভীর ইলমী তাহকীকের জায়গা নয়’
নভেম্বর ২২, ২০২১ ৮:০১ অপরাহ্ণ

মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন।।

ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব প্রভৃতি সোশ্যাল মিডিয়া শিক্ষিত অশিক্ষিত, আলেম গর আলেম, বুঝমান না-বুঝ সব ধরনের লোকের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। বিশেষত ধর্মীয় জ্ঞানের বিচারে না-বুঝ বা অল্প-বুঝ লোকের সংখ্যা এখানে প্রচুর বলা যায়। এ কারণে এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্বীনী আলোচনা অবশ্যই সাদামাটা ধরনের কিংবা বেশির থেকে বেশি মধ্যম ধরনের ইলমী আলোচনার মধ্যে সীমিত থাকা চাই। এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় গভীর ইলমী তাহকীকী আলোচনা কিংবা জটিল তাত্ত্বিক আলোচনা সমীচীন নয়। কারণ সেরূপ আলোচনা অনেকের ধারণ ক্ষমতার বাইরে হওয়ায় তাদের জন্য ভুল বুঝাবুঝি তথা বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. বলেছেন,

ما انت بمحدث قوما حديثا لا تبلغه عقولهم إلا كان لبعضهم فتنة

অর্থাৎ, তুমি যদি কোন সম্প্রদায়ের কাছে এমন হাদীছ বয়ান করো যা তাদের ধারণ ক্ষমতার বাইরে, তাহলে সেটা তাদের কতকের জন্য ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। (মুকাদ্দামায়ে মুসলিম)

যেসব কথা দ্বারা কম-ধারণ-ক্ষমতাসম্পন্ন লোকদের ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকে সেগুলো তাদের সামনে বর্ণনা করতে রসূল সা.ও নিষেধ করেছেন। হাদীছে এসেছে- একদিন রসূল সা. হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা.-এর সামনে বললেন,

ما من عبد يشهد أن لا إله إلا الله وأن محمدا عبده ورسوله إلا حرمه الله على النار. قال : يا رسول الله! أفلا أخبر بها الناس فيستبشروا؟ قال : إذا يتكلوا

অর্থাৎ, যে কোন বান্দা লাইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহর সাক্ষ্য দিবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন। (এ কথা শুনে) হযরত মুআয রা. বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমি কি লোকদেরকে এটা জানিয়ে দিব না, তাহলে তারা খুশি হবে। রসূল সা. বললেন, না, তাহলে তারা এর উপর ভরসা করে (আমল ত্যাগ করে) বসে থাকবে। (মুসলিম শরীফ: হাদীছ নং ৫৩)

যারা দ্বীনী জ্ঞানে পরিপক্ক, তারা বোঝেন যে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহর সাক্ষ্য দিলে জাহান্নাম হারাম হয়ে যাবে- এর অর্থ এই নয় যে, তাহলে আমলের কোন প্রয়োজন নেই, জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য শুধু উপরোক্ত সাক্ষ্যই যথেষ্ট। বরং এ কথা দ্বারা কালেমা তথা ঈমানের শক্তি বোঝানো হয়েছে বা জাহান্নামে চিরস্থায়ী না হওয়ার কথা বোঝানো হয়েছে, যা কিছু দিনের জন্য প্রাপ্য শাস্তি ভোগ করার নিমিত্তে প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়াকে নিশ্চিত করে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ -যারা ইসলামী জ্ঞানে পরিপক্ক নয়- এসব ব্যাখ্যা নাও বুঝতে পারে। তারা এ হাদীছ-এর বাহ্যিক ও স্থূল অর্থ থেকে আমল ছেড়ে দেয়ার অবকাশ বুঝে নিতে পারে, যা মূলত বিভ্রান্তি। তাই তাদের সামনে এ কথা বর্ণনা করতে রসূল সা. নিষেধ করেছেন। তাদেরকে সম্ভাব্য বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করার জন্যই তাদের সামনে এরূপ কথা বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ হাদীছ দ্বারা প্রথমত প্রমাণিত হয় যে, সাধারণ মানুষের সামনে রুখসুতের হাদীছ (অর্থাৎ যে হাদীছের বাহ্যিক ও স্থূল অর্থ থেকে আমল বর্জনের অবকাশ বুঝে আসে।) বয়ান করা ঠিক নয়। দ্বিতীয়ত এ হাদীছ- এর দালালাতুন্নস- এর ভিত্তিতে আরও ব্যাপকভাবে এটা প্রমাণিত হয় যে, যতকিছু বর্ণনা দ্বারা সাধারণ মানুষের ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ রয়েছে, সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে বর্ণনা করা যাবে না। অতএব সাধারণ মানুষের সামনে গভীর ইলমী তাহকীকী আলোচনা কিংবা জটিল তাত্ত্বিক আলোচনা করাও সমীচীন নয়। কেননা তাদের ইসলামী জ্ঞানের ধারণ ক্ষমতা কম থাকায় তারা গভীর ইলমী তাহকীকী কথার অনেক কিছু সঠিকভাবে বুঝতে না পারার ফলে ভুল বোঝাবুঝি বা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়তে পারে।

ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব প্রভৃতি সোশ্যাল মিডিয়ায় যেহেতু প্রচুর সাধারণ মানুষের বিচরণ রয়েছে যারা ইসলামী জ্ঞানে পরিপক্ক নয়, তাই এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় গভীর ইলমী তাহকীকী আলোচনা কিংবা জটিল তাত্ত্বিক আলোচনা থেকে বিরত থাকা চাই।

বিষয়টা খেয়াল না করে কেউ কেউ এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলামী আকায়েদের জটিল বিষয়াদি নিয়ে আলোচনায় লিপ্ত হন- আল্লাহর যাত ও সিফাতের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম দিকগুলো নিয়ে তাফসীলী আলোচনা করেন, এটা ঠিক নয়। সাধারণ মানুষের জন্য এগুলো জানা জরুরীও নয় যে, তাদেরকে জানানোর জন্য এগুলো নিয়ে আলোচনার আবশ্যকতা রয়েছে। আওয়াম তথা সাধারণ মানুষদের জন্য জরূরিয়্যাতে দ্বীনের উপর ইজমালী ঈমানই যথেষ্ঠ। ‘জরূরিয়্যাতে দ্বীন’ বলতে বোঝায় দ্বীনের মোটামোটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যা আওয়াম খাওয়াস নির্বিশেষে সকলের কাছে সুবিদিত।

কেউ কেউ এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় জটিল দালীলিক মতবিরোধপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ হন, এটাও ঠিক নয়। সাধারণ মানুষ দলীল আদিল্লাহ-র সিহহাত দা’ফ, উজূহে ইস্তিদলাল, উজূহে তারজীহ- এসবের কী বোঝে? আর এগুলো না বুঝলে তো দলীলের কার্যকারিতা ও কারিশমা কিছুই বুঝা হয় না।

কেউ কেউ এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় তাসাওউফের তাত্ত্বিক সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিষয়াদি নিয়ে ঘাটাঘাটিতে প্রবৃত্ত হন। কোন কোন বক্তা পাবলিক মাহফিলে এ জাতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এভাবে অনেকেই যে অঙ্গনে যা নিয়ে আলোচনা ঠিক নয় সে অঙ্গনে তা নিয়ে আলোচনা করে থাকেন, আর এসবের কারণে যে বহু সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়, দিকভ্রষ্ট হয়, তার প্রতি তারা লক্ষ্য রাখেন না। সকলেরই তার আলোচ্য বিষয়ের নাজুকতা নিয়ে ভেবে দেখা উচিত।

হ্যাঁ কেউ এ জাতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন অনুভব করলে তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে তা করবেন কিংবা বইপত্রে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করবেন। আর বলা বাহুল্য, বইপত্র সাধারণত তারাই পাঠ করে থাকেন যারা সংশ্লিষ্ট বিষয় বুঝার মত ধারণ ক্ষমতা রাখেন। ফলে যারা তা বুঝার মত ধারণ ক্ষমতা রাখে না তাদের সামনে সে আলোচনা যাবেই না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া তেমন নয়। এখানে যেকোনো আলোচনা ছাড়লেই অবলীলায় তা সব শ্রেণীর লোকের সামনে চলে যায়। আর সাধারণ লোকের সামনে সেগুলো গেলে তারা পর্যাপ্ত ধারণ ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও নিছক কৌতুহল বশত সেগুলো পাঠ করে বসে। আর সেই পাঠ তাদের বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এখানে সব ধরনের আলোচনা ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়।

আল্লাহ আমাদেরকে সকল বিষয় সঠিকভাবে বুঝার ও মানার তাওফীক দান করুন। আমীন!

এনটি

সর্বশেষ সব সংবাদ