সৈয়দ শামসুল হকের ‘কোরআনের মর্মানুবাদ: তরুণ আলেমদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২১ ২:৩১ অপরাহ্ণ

।।কাউসার লাবীব।।

সৈয়দ শামসুল হক (২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫ – ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬) বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে সক্রিয় একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী সাহিত্যিক। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, অনুবাদ তথা সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য তাকে ‘সব্যসাচী লেখক’ বলা হয়। তার লেখকজীবন প্রায় ৬২ বছর ব্যাপী বিস্তৃত।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে ‘কোরআনের মর্মানুবাদ’ গ্রন্থটির প্রকাশ। তার অনুদিত পবিত্র কোরআন থেকে নির্বাচিত অংশের অনুবাদ নিয়েই গ্রন্থটি তৈরি। এটি প্রকাশ করে ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশনী।

বইটি সম্পর্কে ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশনী জানায়, কবি-সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক একজন দক্ষ অনুবাদক। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার নানা সাহিত্যকর্ম তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন। অনুবাদে তিনি আক্ষরিক নন বরং ছিলেন মর্মানুগামী। সৈয়দ শামসুল হক নিষ্ঠার সঙ্গে ‘কুরআন শরিফ’-সহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করতেন। ধর্মের মূল যে মর্ম -মানবসাধনা; তাঁর সাহিত্যকর্মে আমৃত্যু তিনি সেটাই অন্বেষণ করেছেন।

প্রকাশনীটি আরো জানায়, বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সৈয়দ শামসুল হক ‘কুরআন শরিফ’-এর কতিপয় সূরার মর্মানুবাদ করার কথা বলেছেন। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও এতে অনুবাদক সৈয়দ শামসুল হকের স্বাতন্ত্র্যের ছাপ পাওয়া যায় আর পাওয়া যায় বিশ্ববিধাতার প্রতি তাঁর নিবেদিত চিত্তের খোঁজ। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, কবির মৃত্যুবার্ষিকীতে বইটি পাঠকের হাতে তুলে দিই আমরা। সৈয়দ শামসুল হক অনুদিত বইটির শুভেচ্ছা মূল্য থাকবে ১৫০ টাকা।

এদিকে ৪৮ পৃষ্ঠার এ ছোট্ট বইটি নিয়ে তরুণ আলেমদের মাঝে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

তরুন আলেম মনযূরুল হক ‘কোরআনের মর্মানুবাদ’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, অনুবাদ করার জন্য শুধু ভাষা জানলেই হয় না—প্রেক্ষিত, আনুষাঙ্গিক, পূর্বাপর বহু কিছু জানার দরকার হয়। মানোত্তীর্ণ অনুবাদ সহজ কাজ নয়। খুশবন্ত সিংয়ের ‘দিল্লী’ অনুবাদ করতে গিয়ে আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু বইতে বর্ণিত প্রতিটি স্থান ঘুরে দেখেছেন।

কয়েক বছর আগে ইন্ডিয়ার ‘আদালত’ অনুষ্ঠানে বিতর্ক উঠেছিল, দারুল উলুম দেওবন্দে কেন ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হয় না। মাহমুদ মাদানি বললেন, বন্দ-বন্দনা তো ইবাদত-বন্দেগি অর্থে ব্যবহার হয়। উপস্থিত অন্য অতিথি বললেন, না, এটার অর্থ প্রশংসা। মাদানি বললেন, ভাষাবিদরা লিখিত দিক যে, এখানে ‘বন্দ’ মানে প্রশংসা, তাহলে আমি ছাত্রদের বলব, তারা যেন দেশের গানটি গায়।

তালাক-পরবর্তী নিয়ে নারীর ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত আলোচনায় একবার বিপুল হট্টগোল তৈরি হয়েছিল শুধু একটি শব্দের অনুবাদ নিয়ে। কোরআন খুলে নারীবাদীরা দেখিয়েছেন, ‘আওতাসরীহুম বিল-ইহসান’ (২:২২৯) অংশে ‘ইহসান’ শব্দের অনুবাদ করা হয়েছে ‘করুণা’। তাদের কথা হলো, ‘করুণা’ মানে তো ভিক্ষা—তাড়িয়ে দেওয়ার পরেও আমরা তার থেকে ভিক্ষা নেব?
তো কথা হলো, অনুবাদে ভাষা তো জানতেই হবে—নিজের ভাষা এবং ভিন্নভাষা দুটোই—আরও বহুকিছু লাগবে। শাস্ত্রীয় অনুবাদের কথা বাদ, সাধারণ একটা ইংরেজি ফিকশন কি একজন প্রকাশক আজকাল তার হাতে অনুবাদ করতে দেবেন, যে-ইংরেজিটা জানে না?

আচ্ছা, বিজ্ঞান বা শাস্ত্র শিক্ষায় ডিসিপ্লিন কেন দরকার হয়, বলুন তো। একজন গ্রাম্য ডাক্তারের হাতযশ থাকার পরও তাকে ‘হাতুড়ি ডাক্তার’ বলা হয় এই ডিসিপ্লিনের অভাবে। শিক্ষার এই নিয়ম-শৃঙ্খলা শিক্ষার্থীকে একটা পরিমাপ ও পরিমিতিবোধে উন্নীত করে। আমাদের শিক্ষক মাওলানা হাবিবুর রহমান (মাদানীনগরের বরিশালী হুজুর) বুকে হাত রেখে বলতেন, ‘এইখানে একটা পাল্লা আছে, জিনিস দিলেই বুঝতে পারি ওজন কতাটু।’ বিজ্ঞান গ্রন্থের অনুবাদ করতে হলে অবশ্যই তাকে সেই বিজ্ঞানের ডিসিপ্লিন সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। এটাই গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড। কুরআনের বেলায়ও একই কথা। সায়েন্স অব কুরআন, তাফসির, ন্যারেটিভ, উসুল সম্পর্কে ধারণা না-থাকলে অনুবাদ ভুলভাল অন্তসারশূন্য হতে বাধ্য।

‘ইসলাম বিটুইন ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট’ বইয়ে আলিয়া ইজেতবেগোভিচ এই ‘অন্তসারশূন্যতা’ নিয়ে একটা দারুণ উদাহরণ দিয়েছেন। বলেছেন, ইটের পর ইট সাজিয়ে রড-বালি-সিমেন্ট দিয়ে গড়ে দিলেই মসজিদ হয় না—তাহলে তো মসজিদ আর ছাউনির মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকে না। ‘মর্মানুবাদ’ নাম থাকলেই আপনি কুরআনের কোনও অনুবাদকে স্বাধীনতা দিতে পারেন না। ‘তুমি তো বোকা’ কথাটি আপনি যাকে বলতে পারেন, তাকে ‘তুই হলি আস্ত একটা গাধা’ বলে আপনি কি এই অজুহাতে পার পেতে পারেন যে, মর্ম তো একই?

ইব্রাহিমীয় ধর্মের অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলো বিকৃত হওয়ার প্রধান কারণ, অনুবাদ অবাধ হয়ে যাওয়া। এ-কারণেই পূর্বেকার আলেমগণ প্রথমদিকে কুরআনের অনুবাদ করারই অনুমতি দিতেন না। ভাষার চর্চা বাড়লে পরে পরবর্তী সময়ে আরবি টেক্সট যুক্ত রাখার শর্ত দিয়েছেন। এবং তাদের আশঙ্কা সঠিক ছিল। পিকে হিট্টি তার Islan and the West গ্রন্থে প্রথম দিকের পাশ্চাত্যবাসীদের কুরআন অনুবাদ সম্পর্কে চমৎকার তথ্য দিয়েছেন। Islam in Western literature অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, ১৬৪৯ সালে সিয়ুর ডিউ রায়ার (Sieur Du Ryer) কুরআনকে ফরাসিতে অনুবাদ করেন।…এরপর এটিকে মুহাম্মদের কুরআন (The Alcoran of Mahomet) নামে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেন। এই অনুবাদের উদ্দেশ্য অনুবাদকের ভাষায়, “সে সমস্ত লোকদের আশ্বস্ত করা, যারা তুর্কিদের খোকলা ধর্মকে (Turkish Vanities) জানতে আগ্রহী ছিলেন।” Mahomet শব্দটিও ইচ্ছাকৃত বিকৃত। কোনও অথরিটি নেই—কে কার লাগাম টেনে ধরবে?

অপরদিকে তরুণ আলেম মাওলানা ফারুক ফেরদৌস বলছেন, সূরা আসরের প্রথম আয়াতে আল্লাহ কিসের শপথ করেছেন এটা নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে কয়েকটা মত আছে। একটা মত হলো, এখানে আসর শব্দের অর্থ আসরের সময়, বিকেল বা পড়ন্তবেলা।

বিখ্যাত মুফাসসির তাবেয়ী কাতাদা রহ.-এরও এই মত। তিনি বলেছেন, এখানে আল্লাহ বিকেল বেলার শপথ করেছেন যেমন সূরা যুহায় দুপুর বেলার শপথ করেছেন। কারণ দুপুর ও বিকেল আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন।
তাই কেউ যদি এখানে আসরের অনুবাদ ‘পড়ন্তবেলা’ করে, সেটা ভুল হবে না।

এ ছাড়া দুই তিন আয়াতের তরজমা যা দেখলাম, ভুল অনুবাদ তিনি করেন নাই। তবে তার মতো করে অনুবাদ করেছেন। পরিভাষার শাব্দিক তরজমা করেছেন। একজন অবিশ্বাসীর কাছে এরচেয়ে বেশি আশা করার কোনো কারণও ছিলো না বা নাই।

সৈয়দ হকের মতো সাহিত্যিকরা কুরআনের বাংলা অনুবাদ করেছেন শুনলে খুশি হই এবং পড়ার আগ্রহ বোধ করি। কিছু স্বেচ্ছাচারিতা, খেয়ালখুশি, ভুল করবেন এটা ধরেই রাখি। তবুও দেখতে ইচ্ছে হয় কুরআনের বাংলা অনুবাদে তার কলমে এমন চমৎকার কিছু শব্দ ‍যুক্ত হয় কি না যেগুলো আমার মাথায় আসেনাই বা এখনও কেউ লেখেনাই।

তার মতো ব্যক্তিদের তরজমা মানুষের বিভ্রান্তির কারণ হওয়ারও তেমন সম্ভাবনা দেখি না। কারণ তাদের মতাদর্শ, অবিশ্বাস সর্বজনবিদিত। বিনা তর্কে বা বিনা যাচাইয়ে সৈয়দ হকের অনুবাদ পড়ার মতো বেকুব মুসলমান বাংলাদেশে নাই সম্ভবত।

এ বিষয়ে তরুণ আলেম আবুল কাসেম আদিল লিখেন, সৈয়দ হক কৃত কুরআনের মর্মানুবাদে প্রথম দেখায় ‘আল-আসর’ শব্দের অনুবাদ হিসেবে ‘পড়ন্তবেলা’ শব্দটা ভালোই লেগেছে। বিশেষতঃ যেহেতু অনেক সালাফ শব্দটার এই অর্থ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সূরা আসরের ‘মর্মানুবাদ’ যথার্থ হয় নি। কুরআনের মর্ম আমরা তা-ই গ্রহণ করব, যা রাসূল সা., সাহাবা কিরাম ও সালাফ থেকে ধারা-পরম্পরা ভিত্তিক বর্ণিত আছে। ইসলামে সিলাসিলা ও পরম্পরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সিলসিলা অস্বীকার করলে ইসলাম অস্বীকারের রাস্তা খুলে যায়।

কুরআনের অর্থ যে সবাই মনমত করতে চাইবে, তার ইশারা কুরআনেই পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেছেন, য়ুদিল্লু বিহী কাসীরান ওয়া য়াহদী বিহী কাসীরান। (তিনি কুরআন দ্বারা অনেককে বিভ্রান্ত করেন, আবার বহুলোককে সৎপথে পরিচালিত করেন।) তা হচ্ছেও, হবেও। সেসব অনুবাদের ভিন্ন ভিন্ন নাম থাকতে পারে।

যেমন: সেক্যুলার অনুবাদ, ছায়া অনুবাদ, সুফিবাদী অনুবাদ, লালনবাদী অনুবাদ, যাচ্ছেতাই অনুবাদ, অনুবাদের অনুবাদ। কিন্তু মর্মানুবাদ নয়। মর্মানুবাদ রাসূল থেকে সাহাবা কিরাম যা বুঝেছেন, তা-ই। পরম্পরা ভিত্তিক যা বর্ণিত আছে। এছাড়া অন্য অনুবাদগুলোকে ‘মর্মানুবাদ’ বলা চলে না। এসবের সাহিত্যমূল্য থাকতে পারে। সেটা ভিন্ন বিষয়।

ধর্মগ্রন্থকে ধর্মমুক্ত করার একটা প্রয়াস প্রায়ই লক্ষ করা যায়। ধর্মগ্রন্থকে মরমে ধারণ না করে মর্মানুবাদ করা যায় না। ধর্মগ্রন্থকে মরমে ধারণ না করে মর্মানুবাদ করলে ধর্মগ্রন্থে ধর্মটাই থাকবে না—যা সেই গ্রন্থের প্রাণ। কেউ যদি এসব কথিত মর্মানুবাদ পাঠ করতে চান, এই বিষয়টি মাথায় রেখে পাঠ করবেন।

-কেএল