fbpx
           
       
           
       
আদর্শ সন্তান প্রতিপালনে মায়ের ভূমিকা
জুলাই ১৪, ২০২১ ১০:৫৩ অপরাহ্ণ

মুহাম্মাদুল্লাহ শাব্বির।।

দাম্পত্য জীবনে সুখের পুষ্প হলোসন্তান। যে সংসারে সন্তান নেই, সে সংসারে সুখ নেই। সব সময় গোমট একটা অন্ধকার যেন সে সংসারকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে রাখে! স্বামী-স্ত্রীর হৃদয়ে কোথায় যেন দুঃখের একটা বীন বেজেই চলে।  আলো ঝলমলে জীবনেও হাহাকার, ঘনকালো মেঘ রুপ নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে। দুঃখের অনল ধিক ধিক করে জ্বলে ওঠে। আর যে সংসারে নবজাতক সন্তানের পূর্বাভাস মেলে, সে সংসারে সুখের পায়রারা নিত্য ডানা ঝাপটায়! তনুমনে খুশির মৃদু সমীকরণ দোলা দিয়ে যায়। স্বপ্নের পর স্বপ্ন আঁকতে থাকে, হৃদয়ের আরশিতে, আলপনার রং তুলি দিয়ে, আসন্ন অতিথিকে ঘিরে।

সন্তান আগমন করে পৃথিবীতে। সবার মনে আনন্দোরা দোলা দিয়ে যায়। খুশিরা হেসে ওঠে ভোরের রাঙা সূর্যের মতো। ঘুচে যায় সমূহ দুঃখ সংসার-জীবন থেকে। সন্তান বাবা-মায়ের চোখের শীতলতার কারণ হয়। তাইতো আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন, প্রিয়তম নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব-ই চমকপ্রদ উদাহরণ ও অনুপম ভাষায় বলেছেন___

ريح الولد من ريىح الجنة

সন্তানের ঘ্রাণ বেহেশতের সুবাস। (আল্লামা সাখাবি, আলমাকাসিদুল হাসানাহ, হাদীস : ৫৩৩)

 

صغاركم دعاميص الجنة

তোমাদের শিশুরা বেহেশতের পতঙ্গ। (বুখারী, আলআদাবুল মুফরাদ, হাদীস : ১৪৫)

 

আরও একটি চমৎকার হাদীস নবীজির পবিত্র যবান থেকে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

ما ولد في أهل بيت غلام إلا أصبح فيهم عز لم يكن

যে পরিবারে কোনও শিশু জন্মলাভ করে, সমাজে তাদের এমন‌ সম্মান সৃষ্টি হয়, যা আগে ছিলো না। (আল্লামা হায়ছামী, মাযমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ১৩৫০২)।

প্রিয় নবীজির ভাষায় সন্তান হলো, বেহেশতের সুবাস, বেহেশতের পতঙ্গ, এবং সমাজে সম্মানের পাত্র হওয়া। এখন‌ কথা হলো, সন্তান জন্মলাভের পর থেকেই বাবা-মায়ের কাঁধে, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে যায়। তন্মমদ্ধে উত্তম একটি কাজ হলো, সন্তানের হৃদয়কে সত্য ও ন্যায়ের এবং শুভ্র ও সুন্দরের আলো দিয়ে সাজানো। ভালো-মন্দ ও সত্য-মিথ্যের ফারাক বুঝিয়ে দেয়া।

সন্তানকে মিষ্টি ভাষায় বোঝানো, বাবা! এ-দিকে আলো রয়েছে, আর ও-দিকে আঁধার রয়েছে। এ-দিকটায় ফুল রয়েছে, আর ও-দিকটায় কাঁটা রয়েছে। কারণ মানব শিশুর হৃদয় হলো উর্বর, কোমল, শুভ্র-সুন্দর। আপনি তার হৃদয়ে যে চরিত্র ও চিন্তা-চেতনা এঁকে দেবেন, সে সে-ই চরিত্র নিয়ে বেড়ে ওঠবে, এবং সে-ই চিন্তা-চেতনা হৃদয়ে লালন-পালন করবে।

সন্তান লালন-পালনে, বাবার চেয়ে মা-ই বেশি পারেন কাজটিকে সুন্দর ও সুচারুভাবে গোছাতে। কারণ সন্তান জন্মলাভের পর থেকে মায়ের স্পর্শ, মমতা, আদর-আহ্লাদ ও সান্নিধ্য বেশি লাভ করে। তাই “আদর্শ সন্তান প্রতিপালনে মায়ের ভূমিকা”অপরিসীম! অনস্বীকার্য!! একজন মমতাময়ী মা যে ধাঁচে, যে পরিকল্পনায় সন্তানকে গড়ে তুলবেন, সন্তান সে ধাঁচে গড়ে উঠবে। কারণ শিশুর হৃদয় চায় গ্রহণ করতে, অনুকরণ করতে। এই কারণে শিশুরা অনুকরণ প্রিয় হয়।

আপনি যেহেতু মা, তাই আপনি অবশ্যই সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন। এক্ষেত্রে মায়েরা যে ভুলটা করেন, তা হলো, অধিক আবেগ তাড়িত হয়ে শরীয়‌ত গর্হিত কাজ সমূহ করে বসেন। তাই সাবধান! সন্তানের প্রতি আপনার আবেগটা যেন শরীয়তের গন্ডির ভেতরে থাকে। নতুবা আপনি হবেন সন্তান-ধ্বংসের মূল কারণ। তাই সন্তান যখন আধো আধো বুলি আওড়াতে লাগবে, তখন থেকে সন্তানের হৃদয়-ভূমিতে ঈমানের বীজ বপন করা শুরু করে দেবেন। সত্যকে সত্য, মিথ্যেকে মিথ্যে, সুন্দরকে সুন্দর, অসুন্দরকে অসুন্দর, তার শুভ্র ও কোমল হৃদয়ে জল ছাপের মতো, আলতো ভাবে এঁকে দেবেন।‌ দেখবেন, ধীরে ধীরে তার বেড়ে ওঠার সাথে সাথে, বুনিয়াদি ঈমানের বীজও অংকুরিত হবে। পত্র-পল্লবে সুসজিবিত হবে। ডাল-শাখা‌ বিস্তার করবে। ফুলে-ফলে ভরে উঠবে। সন্তান বুঝবান ও প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর, তাকে কোনও অশুভ, অশুভ্র, অসুন্দরের ঝড় হাওয়া ঈমান পথ থেকে টলাতে পারবে না। মিথ্যের মরিচিকা ধোকায় ফেলতে পারবে‌ না। অভিসপ্ত শয়তানের মায়া জালে আটকা পড়ে পথ ভ্রষ্ট হবে না।

আর যদি আপনি ভাবেন ও এখনও ছোটো, ভালো-মন্দ কিই-বা বোঝে। সমস্যা নেই, একটু বড় হোক না, তারপর না হয় শেখানো যাবে। নিজের মতো করে চলুক না আর ক’টা দিন। বড় হলে আপনাতেই ঠিক হয়ে যাবে। উঁহু! এটা আপনার বড্ড ভুল ধারণা। আপনি মা হয়ে সন্তানের ওপর অবিচার করেছেন। সন্তানকে আপনি ধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছেন। এর “কুফল” আপনি যেমন দুনিয়াতে ভোগ করবেন, তেমন আখেরাতেও। তখন লাঞ্ছনার গ্লানি না সইতে পেরে, না পারবেন মরে যেতে, আর না পারবেন বেঁচে থাকতে।

ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ন একটি চমকপ্রদ কথা বলেছেন। আজও কথাটি দীপ্যমান ইতিহাসের পাতায়! কথাটি হলো, “আপনারা আমাকে একজন আদর্শ মা দিন, আমি আপনাদেরকে একটি আদর্শ জাতি উপহার দেবো”। সত্যি কথাটিতে অনেক নিগুঢ় রহস্য রয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় পাতায় যতজন স্বর্ণমানবের নাম আজও ভাষ্বর, তাঁদের অধিকাংশের পেছনে মায়ের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তুলনা রহিত। মায়ের সুপরিকল্পিত, নিবিড় পরিচর্যায় তাঁরা আমাদের মাঝে আজও অমর, অম্লান, চির ভাস্বর।

হযরত রাবেয়া বসরী রহ.এতো বড় বুযুর্গ, আবেদা, যাহেদা হয়ে ছিলেন একমাত্র তাঁর মমতাময়ী মায়ের অক্লান্ত পরিচর্যায়। আর তাঁর মা-ও ছিলেন অসাধারণ নেককার ও পবিত্র একজন নারী। তিনি নিরলস চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও নিবিড় পরিচালনা করে কলিজার টুকরো কন্যাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন। তাই এক সময়ের ছোট্ট মেয়েটি, হয়েছিলেন পৃথিবীময় খ্যাতনামা বুযুর্গ ও মহান আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দাদের অন্যতম। তিনি যেমন ছিলেন ভাষ্বর, আজও তেমন, কেয়ামত তক থাকবেন ঠিক এমনই চির ভাস্বর।

এনটি

সর্বশেষ সব সংবাদ