শনিবার, ২২ জুন ২০২৪ ।। ৮ আষাঢ় ১৪৩১ ।। ১৬ জিলহজ ১৪৪৫


আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে উস্তাদ নুমান আলী খানের অসাধারণ খুৎবা (২য় পর্ব)

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

মোস্তফা ওয়াদুদ
নিউজরুম এডিটর

প্রথম পর্ব প্রকাশের পর..., প্রথম পর্ব

আমার খুৎবার প্রথম অংশ এই অংশের সাথে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। প্রথম অংশে আমি বলেছি আল্লাহ মানুষকে খুব সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করেছেন এবং খুব আকর্ষণীয় করে তৈরি করেছেন।

এখন শুনুন, আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা শয়তানের মনের ভেতর থেকে কী বর্ণনা করছেন। আল্লাহ আমাদেরকে শয়তানের মনের ভেতর নিয়ে যাচ্ছেন। فَوَسۡوَسَ لَهُمَا الشَّیۡطٰنُ - ‘শয়তান অবিরত তাদের কুমন্ত্রণা দিল এবং দূরে সরে গেল। ওয়াসওয়াসা মানে, হামাসা ওয়া গা-বা। সে তাদের কাছে যেতো কুমন্ত্রণা দিতো এবং অদৃশ্য হয়ে যেতো। এরপর আবার কুমন্ত্রণা দিতো এবং আবার অদৃশ্য হয়ে যেতো।

ব্যাপারটা হলো, ক্রমাগত কারো কাছে একই বার্তা বারবার প্রচার করা, যতক্ষণ না সে তা গ্রহণ করে নেয়। প্রোপাগান্ডা এভাবেই কাজ করে। আপনাদের কী মনে হয়? কেন তারা একই অ্যাড বারবার প্রচার করে? যেন আপনার তা একেবারে মুখস্থ হয়ে যায়। যদি ওয়াসওয়াসা বারবার দেওয়া না হয়, তবে এটি আপনার চিন্তার অংশ হবে না। কোকের একটি বিজ্ঞাপন দশ-পনের বার দেখার পর হঠাৎ করেই আপনার ইফতারিতে কোকের প্রয়োজন হয়। ভাবছেন- ‘কিরে কোকের চিন্তা কোত্থেকে মাথায় এলো?’ এটা আপনার মাথায় গেঁথে দেওয়া হয়েছে। তাহলে, ওয়াসওয়াসা মানে, মনের মধ্যে কোনো কিছুর ধারণা বারবার প্রবেশ করিয়ে দেওয়া।

এখন তার উদ্দেশ্য কী ছিল? আল্লাহ বলেন- لِیُبۡدِیَ لَهُمَا مَا وٗرِیَ عَنۡهُمَا مِنۡ سَوۡاٰتِهِمَا - তিনি এখানে গাছের কথা উল্লেখ করেননি। শয়তান তাদের বারবার কুমন্ত্রণা দিতে লাগলো- এই অংশটি মনোযোগ দিয়ে শুনুন- ‘তাদের কুৎসিত অংশ থেকে যা ঢাকা ছিল, যাতে সে তাদের জন্য তা প্রকাশ করে দেয়’ অর্থাৎ তাদের উলঙ্গ শরীর।

এখন এই অংশটি বুঝা একটু কঠিন। কারণ, ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে একই সূরার আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি আমাদের সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। এখন, আল্লাহ বলছেন শয়তান চেয়েছিল আমাদের পিতামাতা যেন কুৎসিতরূপে একে অপরের নিকট প্রকাশিত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, উলঙ্গ অবস্থায়। সে চেয়েছিল তাদের নিকট থেকে তাদের জামা-কাপড় খুলে ফেলতে। এটাই ছিল তার লক্ষ্য।

এখানে দুইটি প্রশ্ন দেখা দেয়। প্রথমতঃ আল্লাহ কেন বলেনেনি যে, শয়তান তাদেরকে গাছের ফল আহার করাতে চেয়েছিল? দ্বিতীয়তঃ হঠাৎ করে কেন- যে শরীর আল্লাহ সুন্দর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন এখন তা কুৎসিত? আল্লাহ কোন কারণে এই কথা বলেছেন?

এই সমস্যাটি মানব জাতিকে বিশেষ করে ঈমানদারদের অবশ্যই বুঝতে হবে। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা এই শরীরকে সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে একজন পুরুষের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল একজন নারী। زُیِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوٰتِ مِنَ النِّسَآءِ - মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি সুশোভিত করা হয়েছে নারী।

এটি খুবই প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি। এটি এতোই শক্তিশালী যে, কুরআনে গাছটির জন্য যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে সে একই ভাষা ব্যভিচারের জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। ‘লা তাকরাবা হা-জিহিস সাজারা’, ‘লা তাকরাবুজ জিনা’। ‘লা তাকরাবুল ফাওয়াহিশ।’ ব্যভিচারের কাছেও যেও না। কোনো নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক তৈরি করার কাছেও যেও না। কোনো ধরণের নির্লজ্জতা এবং বেহায়াপনার ধারে কাছেও যেও না। অতএব, এটি খুবই ভয়ঙ্কর।

আর এটা এমন কিছু ঠিক গাছের নিকটবর্তী হওয়ার মত, কাছে গেলেই এটা আপনাকে টেনে ধরবে। বুঝতেও পারবেন না, কখন যে কতদূর চলে গেছেন। ভেবেছিলেন, এটা তো শুধু দৃষ্টি বিনিময়। তাকে দেখে পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। এরপর আবার তাকালেন। সে মুচকি হাসি দিলো। আপনিও হাসলেন। এখান থেকে ধীরে ধীরে একটা চক্রের মধ্যে আঁটকে গেলেন। এরপর সবকিছু সীমার বাহিরে চলে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এমন কিছুতে আঁটকে গেলেন বুঝতেও পারছেন না কীভাবে বের হবেন।

সুতরাং কাছে না যাওয়ার উপদেশটি উত্তম একটি উপদেশ। কারণ, আপনি জানেন না কোথায় থামতে হবে। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর, পরে আর থামতে পারেন না। আপনি আঁটকে গেছেন।

তো আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা বর্ণনা করছেন- ‘যখন মানুষ আল্লাহর অনুমোদিত পথের বাহিরে গিয়ে একে অন্যের নিকট লজ্জাস্থান প্রকাশ করে দেয়, এটাই তখন চূড়ান্ত কদর্যতা, এটাই তখন মানুষের চূড়ান্ত কুৎসিত রূপ।

পুরুষ এবং নারীর সুন্দর একটি ভালোবাসার সম্পর্ক থাকার কথা। আল্লাহ্‌ আমাদের সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন একটি কারণে। যেন আমরা একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হই। এরপর তিনি একটি ব্যবস্থাপনা তৈরি করলেন যার মাধ্যমে এই সম্পর্কটি বৈধতা পাবে। বিয়ের মাধ্যমে এই সম্পর্কটি বৈধতা পাবে।

মানুষ যখন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণের কারণে এই সম্পর্কটি স্থাপন করতে চায়, কিন্তু এমন পন্থায় চায়, যা আল্লাহর নিকট অনুমোদিত নয়, তখন সে একই সম্পর্কটি যা সৌন্দর্যের কারণে তৈরি হয়েছিল, আকর্ষণের কারণে তৈরি হয়েছিল- সেই একই সম্পর্কটি তখন কুৎসিত রূপ ধারণ করে।

আর এটা শুধু শারীরিক কদর্যতা নয়। কেউ এটা শোনার পর ভাবতে পারে- আমার একটি মেয়ে বন্ধু আছে। সে সুন্দর। আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে সে কুৎসিত হয়ে গেলো, কুরআন নাজিল হওয়ার পর।

না, না, না। আমি এটা নিয়ে কথা বলছি না। আপনার ভেতরে এক ধরণের কদর্যতা আছে। আপনার ভেতরের ভালো সত্ত্বাটি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয় তখন। মানুষকে শুধু শারীরিক দিক থেকে সুন্দর করে সৃষ্টি করা হয়নি। মানুষকে চরিত্রের দিক থেকে সুন্দর করে সৃষ্টি করা হয়েছে, আধ্যাত্মিক দিক থেকে, নৈতিক দিক থেকে। মানুষকে তার ব্যক্তি সত্ত্বার দিক থেকে সৌন্দর্যময় করে সৃষ্টি করা হয়েছে।

আর আপনি যখন অবৈধ একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তখন আপনার ভেতরে যে সৌন্দর্যগুলো ছিল তার থেকে কিছু কিছু তখন হারিয়ে যায়। আল্লাহ আপনাকে যে সৌন্দর্যগুলো দান করেছিলেন তার থেকে কিছু কিছু তখন আপনার কাছ থেকে পালাতে শুরু করে। আপনার ভেতর থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে ফেলা হয়।

ফলে দেখবেন, কোনো যুবক ছেলে যখন কোনো মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, বা কোনো মেয়ে কোনো ছেলের সাথে- তখন লক্ষ্য করবেন তারা দিন দিন তাদের পিতামাতার সাথে বদমেজাজি আচরণ থেকে আরও বেশি বদমেজাজি আচরণ করতে থাকে। দিন দিন তাদের রাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, এই সম্পর্কটি তাদের জীবনের অন্যান্য দিকে কদর্যতা নিয়ে এসেছে। আপনি তখন বুঝতেও পারেন না তার এরকম পরিবর্তনের কারণ কী। এটাই হল, সাওআ বা কদর্যতা।

আরবিতে সাওআ মানে লাশ। লাশ দেখা মানুষের দৃষ্টিতে খুবই অস্বস্তিকর এবং কদর্য। এর দুর্গন্ধ, আকৃতি, গলে যাওয়া মাংস, চামড়া, পোকামাকড়- এর সবকিছুই আমাদের চিন্তায় খুবই অসহ্য। এই চিত্রটিই আল্লাহ্‌ আজ্জা ওয়া জাল্লা তুলে ধরেছেন। অন্য কথায়, আপনার শরীর জীবনী শক্তিতে পরিপূর্ণ কিন্তু আপনার আত্মার মৃত্যু ঘটছে। আপনার আত্মা একটি লাশে পরিণত হচ্ছে।

মূল ইংরেজি খুৎবা থেকে অনুবাদ।

এমডব্লিউ/


সম্পর্কিত খবর


সর্বশেষ সংবাদ