fbpx
           
       
           
       
শিরোনাম :
হেদায়াত আমাদের চাওয়া
জুন ০৭, ২০২১ ৭:২৮ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ ওয়াসিম হোসাইন

মহান রাব্বুল আলামিন মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে। এ ব্যাপারে নিম্নের বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। এই শ্রেষ্ঠত্ব কি গুণাবলি ও কি কারণের ওপর নির্ভরশীল? উত্তরে এ কথাই বলা হবে, আল্লাহতায়ালা আদম-সন্তানকে বিভিন্ন দিক দিয়ে এমন সব বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যা অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে নেই।

যেমন সুশ্রী চেহারা, সুষম দেহ, সুষম প্রকৃতি এবং অঙ্গসৌষ্ঠব ইত্যাদি। আর এ জাতিকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তার ইবাদত করার জন্য। সালাত ও সবরের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর কাছে নিজের কামনা বাসনা এবং নিজের মনের আবেগ পেশ করবে। অন্য কারও কাছে কোনো কিছু চাবে না এবং সেজদার উদ্দেশ্যে কারও কাছে নিজের মাথাও ঝুঁকাবে না। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘আমি জিন এবং ইনসানকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। (সুরা জারিয়াত আয়াত ৫৬)।

আল্লাহতায়ালা তার মাখলুকাতের মধ্য থেকে শুধু ইবাদত করার জন্য মানবজাতিকে কেন বেছে নিলেন ? কেননা আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদাদান করেছি। তাদের জলে ও স্থলে চলাচলের বাহন দান করেছি। তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। (সুরা বনি ইসরাঈল আয়াত ৭০)

।সম্মানিত জাতি দ্বারাই মহান প্রভুর ইবাদত ও গুণকীর্তন হবে এটাই তো স্বাভাবিক। কারণ আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে একই সঙ্গে তিনটি জিনিস দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। ১. কুয়্যাতে শাহ্ওয়াত (যৌবনশক্তি) ২ কুয়্যাতে গজব (রাগান্বিত হওয়ার শক্তি) ৩. কুয়্যাতে আকল (বিচার বিশ্লেষণের শক্তি)।

অপরদিকে মানবজাতিকে শিক্ষা দিয়েছেন তিনি উন্নত ও সুন্দর চরিত্র মাধুরী গঠনের পদ্ধতি, যা তিনি অন্য কোনো প্রাণীকে দেননি। মানবজাতি নিজের বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে, মহান রাব্বুল আলামিনের বিভিন্ন কুদরতকে দেখে নিজের পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন পরিচালনা করবে। এমনকি আল্লাহর চাহিদা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করবে। তাহলেই এই মানবজাতি আল্লাহর পক্ষ থেকে পাবে রহমত আর পরকালে পাবে অনাবিল শান্তি, তথা জান্নাত। শুধু তাই নয়, আল্লাহতায়ালা এই বিশ্ব জাহানকে কেয়ামত পর্যন্ত ঠিক রাখবেন এই মানবজাতি দ্বারাই। এ ছাড়া অন্য যত সব মাখলুকাত আছে সব মাখলুকাত মানবজাতির সেবার জন্যই আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করেছেন।

পৃথিবীর ইতিহাসের সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ইতিহাসে পাওয়া যায়নি কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক হয়েছে, কোনো বিদ্যালয়ের প্রধান হয়েছে কিংবা মসজিদের ইমাম হয়েছে মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী। তাহলে বোঝা গেল যে সব মাধ্যমে বিশ্বজাহান পরিচালিত হয় তার সবই আল্লাহতায়ালা দিয়েছেন মানবজাতিকে, অন্য কোনো প্রাণীকে নয়। আর মানুষ যাতে পাপ-পঙ্কিলতায় ডুবে গিয়ে ধ্বংস হয়ে না যায় এবং সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে থাকে, এ জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। মানুষের জন্য আলো-বাতাস, পানিসহ অসংখ্য-অগণিত নাজ-নিয়ামত দান করেছেন। এসব নাজ-নিয়ামত না চাইতেই তিনি মানুষকে দিয়েছেন। আল্লাহকে বিশ্বাস করে না, এমনিক যারা আল্লাহকে গালি দেয় এ ধরনের াস্তিক, খোদাদ্রোহীকেও তিনি রুজি বন্ধ করেন না।

কিন্তু হেদায়াত এমন একটি পবিত্র নিয়ামত যা, না চাইলে কাউকে দেয়া হয় না। এ পবিত্র নিয়ামত একমাত্র তারাই পান, যাদেরকে আল্লাহ খাস মেহেরবাণী করে দিয়ে থাকেন। এটি কায়মনোবাক্যে মহান আল্লাহর কাছে চাওয়া বা এজন্যে তার দরবারে ধরনা দেয়ার মতো জিনিস। হাদীস অনুযায়ী, প্রত্যেক মানবাত্মা তাওহীদবাদী হয়ে জন্মগ্রহণ করে থাকে, কিন্তু তার পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনরাই তাকে ইহুদী, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্মের অনুসারী বানায়।

হেদায়াত সম্পর্কে শুরুতেই কিছুটা ধারণা থাকা চাই, হেদায়াত শব্দের অর্থঃ ১. হেদায়াত শব্দটি আরবী, কুরআনে শব্দটি বিভিন্ন অর্থে মোট ৩১৪ বার এসেছে। ২. পথ দেখানোর কাজটিকে বলা হয় হেদায়াত বা পথ দেখানো বা প্রদর্শন করা। ৩. যে পথ দেখায় তাকে – হাদী-বলে, ইংরেজীতে গাইড বলে, যেমন- কুরআনকে হুদা বলে। ৪. যে পথ পেয়ে যায় তাকে – মাহ্দী-বলে, যেমন- ইমাম মাহদী আসবে আমাদের মাঝে। ৫. হেদায়াতের বিপরীত শব্দ – হলো-দালালা বা গোমরাহী, বাকারা-১৭৫।

অতএব হেদায়াত অর্থঃ ১. অন্ধ ব্যক্তিকে আলোর সন্ধ্যান দেয়া। ২. পথ হারা ব্যক্তিকে পথ ধরিয়ে দেয়া। ৩. পথ পাওয়া ব্যক্তিকে তার গন্তব্যে পৌঁছতে সাহায্য করা।

হেদায়াত শব্দের ২টি অর্থঃ ১. ইরা আতুত্ ত্বারিক- পথ দেখানো। ২. ইছাল ইলাল মাতলুব- গন্তব্য স্থানে পৌঁছিয়ে দেয়া (ইসালে ছাওয়াব)।
হেদায়াত হচ্ছে লক্ষ্যপানে প্রদর্শিত নির্ভুল পথ। ইমাম রাগেব ইস্পাহানি ‘মুফরাদাতুল কোরআনে’ হেদায়াতের মর্ম সম্পর্কে বলেছেন, ‘কাউকে গন্তব্যস্থানের দিকে অনুগ্রহের সঙ্গে পথ প্রদর্শন করা।’ তাই প্রকৃত অর্থে হেদায়াত করা আল্লাহরই কাজ। তবে আল্লাহর কাছে চাইলেই আল্লাহ হেদায়াত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

আল্লাহ চান বান্দা হেদায়াত চাক তাঁর কাছে, তাই আল্লাহ হেদায়াতের দোয়া শিখিয়েছেন এবং তাঁর সামনে সালাতে দাঁড়িয়ে ঈমানদার মুসলিমরা সুরা ফাতিহায় শেখানো হেদায়াত লাভের দোয়াটি করেই চলছে প্রতিদিন অন্তত সতেরো বার। হেদায়াত ব্যাপকভাবে জাগতিক ও পরজাগতিক লক্ষ্য হাসিলের এবং সৃষ্টিজগতের সব সৃষ্টির লক্ষ্যে পৌঁছার।

বান্দাহর অন্তরে সত্য পথে চলার জন্য বিশেষ আগ্রহ ও প্রেরণা সৃষ্টি করে দেওয়ার সক্ষমতা দান করা। হেদায়াতের সম্পর্ক কেবল মাত্র আল্লাহ তায়ালার সাথে। তিনিই যাকে চান, তাকে সত্য পথে চলার সক্ষমতা দান করেন এবং এ জন্য তার তার অন্তরে বিশেষ আগ্রহ ও প্রেরণা সৃষ্টি করে দেন। হেদায়াতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই। আর তিনি ব্যতীত অপর কেউ এরূপ ক্ষমতার অধিকারী নন। এমনকি নবী-রাসুলগনও যাকে চান, তাকেও অনেক সময় সত্য পথে আনয়ন করতে পারেন নি।

সাইয়িদুনা শু আইব (আঃ) তার কাওমের অবাধ্য উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,
الَ يَا قَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِن كُنتُ عَلَىٰ بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِّي وَرَزَقَنِي مِنْهُ رِزْقًا حَسَنًا ۚ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَىٰ مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ ۚ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ ۚ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ ۚ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ

শুআইব বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তােমরা আমাকে বল তাে, আমি যদি আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক স্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি বিশেষভাবে নিজের পক্ষ থেকে আমাকে উত্তম রিক দান করে থাকেন (তবে তা সত্ত্বেও আমি তোমাদের ভ্রান্ত পথে কেন চলব। আমার এমন কোন ইচ্ছা নেই যে, আমি যে সব বিষয়ে তোমাদেরকে নিষেধ করি, তোমাদের পিছনে গিয়ে নিজেই তা করতে থাকব। নিজ সাধ্যমত সংস্কার করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য আমার নেই। আর আমি যা – কিছু করতে পারি, তা কেবল আল্লাহর সাহায্যেই পারি। আমি তারই উপর নির্ভর করেছি এবং তারই দিকে (প্রতিটি বিষয়ে) রুজু হই।

আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুল সাঃ কে বলেন,
لَّيْسَ عَلَيْكَ هُدَىٰهُمْ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ يَهْدِى مَن يَشَآءُ وَمَا تُنفِقُوا۟ مِنْ خَيْرٍ فَلِأَنفُسِكُمْ وَمَا تُنفِقُونَ إِلَّا ٱبْتِغَآءَ وَجْهِ ٱللَّهِ وَمَا تُنفِقُوا۟ مِنْ خَيْرٍ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
অর্থঃ তাদেরকে সৎপথে আনার দায় তোমার নয়। বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। যে মাল তোমরা ব্যয় কর, তা নিজ উপাকারার্থেই কর। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যয় করো না।

তোমরা যে, অর্থ ব্যয় করবে, তার পুরস্কার পুরোপুরি পেয়ে যাবে এবং তোমাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ (56)

“নিঃসন্দেহে তুমি যাকেই ইচ্ছা করবে তাকে সৎপথে আনতে পারবে না, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন এবং তিনিই ভালো জানেন কারা সৎপথের অনুসারী।” (আল কাসাস :৫৬)

এই আয়াত ঐ সময় অবতীর্ণ হয় যখন নবী (সাঃ)-এর হিতাকাঙ্ক্ষী চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে। তখন তিনি চেষ্টা করলেন যাতে চাচা একবার নিজ মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বাণী উচ্চারণ করুক, যাতে পরকালে আল্লাহর সামনে তার ক্ষমার জন্য সুপারিশ করতে পারেন। কিন্তু সেখানে কুরাইশ নেতাদের উপস্থিতির কারণে আবূ তালেব ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত থাকে এবং কুফরের উপরই তার মৃত্যু হয়।

এরপর রাসুল সাঃ বললেন, আল্লাহর কসম! আমাকে নিষেধ না করা পর্যন্ত আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে যাব।তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন, مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آَمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
আত্মীয়-স্বজন হলেও অংশীবাদী মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী ও ঈমানদারদের জন্য সংগত নয়। যখন এটা স্পষ্ট হয়ে যে তারা জাহান্নামী।

কোরআন থেকে হেদায়াত লাভ করতে হলে, অন্তরের ব্যাধি দুর করতে হবে।অহংকার লোভ-লালসা,হিংসা-বিদ্ধেশ থেকে অন্তর পরিষ্কার রাখতে হবে।যেভাবে চাষি তাঁর ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার রাখে, ভাল ফসল পাওয়ার জন্য থিক তেমনি আমাদের অন্তর ও পরিষ্কার রাখতে হবে।এবং আল্লাহ তায়ালার দরবারে হেদায়াতের জন্য দোয়া করতে হবে।

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ (8) رَبَّنَا إِنَّكَ جَامِعُ النَّاسِ لِيَوْمٍ لَا رَيْبَ فِيهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُخْلِفُ الْمِيعَادَ (9)
“জ্ঞানী লোকেরা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! সরল পথ দেখানোর পর তুমি আমাদের অন্তরকে আর বাঁকা করে দিও না এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান কর। তুমিই সব কিছুর দাতা

-এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ