fbpx
           
       
           
       
শিরোনাম :
ক্ষমা একটি মহৎ গুণ
মে ০২, ২০২১ ৯:১০ অপরাহ্ণ

মাওলানা শমশীর আহমদ: ক্ষমা বলা হয় কোন মানুষের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্বেও ক্ষমা করে দেওয়া। আমরা হলাম মানব সত্তা, আর মানব সত্তা বিভিন্ন বৈশিষ্ট নিয়ে গঠিত, এর মধ্যে একটি হল বিভিন্ন সময়ে ভুল করে থাকা, আর ভুলটা হতে পারে ২ ধরনের (১) ইচ্ছাকৃত ভুল (২) অনিচ্ছাকৃত ভুল। বিভিন্ন সময়ে নিজের অজান্তে ভুল করা মানব সত্তার একটি বৈশিষ্ট, আর ক্ষমা করা আল্লাহ তায়লার বিশেষ একটি গুণ। আমরা হলাম সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ সেই হিসাবে আমাদের উপর পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয়, রাষ্টীয় ও অান্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে, সেই দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে গিয়া আমরা বিভিন্ন সময় অনিচ্ছাবশত ভুল করে থাকি।

ইসলাম ধর্মে ২ ধরনের ক্ষমার কথা বর্ণিত আছে (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা (২) মানুষের পক্ষ থেকে ক্ষমা। আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী বা তার সাথে সুসম্পর্ক স্হাপন করতে গিয়া আমরা যে ভুল করে থাকি সেই ভুলের জন্য যদি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, তাহলে আল্লাহ চাইলে আমাদেরকে ক্ষমা করে দিতে পারেন আর যদি কোন মানুষের কাছে কোন অন্যায়/জুলুম বা কার হক নষ্ট করে থাকি তাহলে সে ( নির্যাতিত ব্যক্তি) যতক্ষন পর্যন্ত অপরাধ ক্ষমা না করবে ততক্ষন পর্যন্ত সেই অপরাধ ক্ষমা হবে না।

ক্ষমা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেনঃ
فَمَنْ تَابَ مِنْۢ بَعْدِ ظُلْمِهٖ وَاَصْلَحَ فان الله يتوب وعليه ان الله غفور رحيم.
অর্থঃ কোন ব্যক্তি সীমালংঘন/ অন্যায় কাজ করার পর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন, নিশ্চয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

একবার রাসুল (সাঃ) এক ইহুদির কাছ থেকে নির্ধারিত তারিখে পরিশোধ করার শর্তে কিছু ধার এনে ছিলেন, পরবর্তিতে ঐ ইহুদি নির্ধারিত তারিখ আসার আগেই রাসুলের কাছে রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে জামা খামছিয়ে ধরে বলতে লাগল, হে মুহাম্মদ তুমি ও তুমার বংশ টালবাহানাকারী তুমি আমার পাওনা পরিশোধ করনা কেন? এবং অকট্ট্য ভাষায় কথা বলতে লাগল, তখন হযরত ওমর (রাঃ) চোঁখের সামনে রাসুলের সাথে খারাপ ব্যবহার দেখে তা বরদাশত্ করতে না পেরে রাসুল (সাঃ) কে বললেন ইয়া রাসুলাল্লাহ আপনি যদি আমাকে অনুমুতি দেন? তাহলে আমি ঐ মুনাফিককে হত্যা করে দিব, তখন রাসুল (সাঃ) বললেন হে উমর (রাঃ) তুমি তাকে ধমক দিওনা বরং তুমার জন্য উচিৎ ছিল, তার পাওনা পরিশোধ করার জন্য আমাকে উৎসাহিত করা, যাও তার পাওনা পরিশোধ করে দাও আর তুমি যেহেতু তার সাথে দুর্ব্যবহার করেছ এজন্য তার বদলা হিসাবে তার পাওনা থেকে আর কিছু অতিরিক্ত দিয়ে দাও।

অন্য একটি হাদিসে এসেছে একবার রাসুল (সাঃ) এর কাছে এক ইহুদি মেহমান হলে রাসুল (সাঃ) তাকে উন্নতমানে খাদ্য দিয়ে মেহমানদারী করালেন ঘটনাক্রমে ঐ রাত্রে খাদ্য তার বদ হজম হয়ে গেল ফলে সে বিছানায় পায়খানা করে দিল, তখন সে ভয়ে পেয়ে রাসুল (সাঃ) ঘুম থেকে উঠার আগেই, তাকে না জানিয়েই চলে গেল। যাওয়ার সময় সে ভুলবশত তলোয়ার ফেলে গেল, পর্বর্তীতে সে তলোয়ার নেওয়ার জন্য আসলে সাহাবায়ে কেরাম উত্তেজিত হয়ে বললেন হে রাসুলাল্লাহ আমরা ঐ ইহুদিকে যেখানেই পাব সেখানেই হত্যা করব। তখন রাসুল (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামকে সান্তনা দিতেছেন এবং রাসুল (সাঃ) নিজ হাতে ময়লা পরিস্কার করতে লাগলেন। এ দিকে ইহুদি ঐ দৃশ্য দেখে কালিমা পড়ে মসলমান হয়ে গেল।

রাসুল ( সাঃ) শত্রুদের প্রতি ছিলেন সর্বাধিক ক্ষমাশীল ও দয়ালু। রাসুল (সাঃ) তায়েফের ময়দানে সত্য ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে যারা রাসূল (সাঃ) শরীর মোবারক থেকে রক্ত ঝরাইছে, তাদের জন্যও কল্যানের দোয়া করছেন। শুধু তাই না যখন তিনি মক্কা বিজয় করে বীবের বেশে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি শত্রুদের হাতের নাগালে পেয়েও যারা রাসুল (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কেরামকে কে নানা ভাবে অমানবিক নির্যাতন করেছে, যারা বছরের পড় বছর রাসুলের সংগে যুদ্ধ করেছে তাদেরকে সহ সবার জন্য তিনি সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করলেন। এমনকি নবী করীম (সাঃ) এর চাচা হামযা (রাঃ) কলিজা চিবিয়ে ছিল যেই হিন্দাহ এবং ওয়াহশী যিনি হযরত হামযা (রা) কে নির্মম ভাবে হত্যা করেছিলেন তাদের সবার জন্য সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করলেন।

কেননা ক্ষমা করা হল ইসলামের অন্যতম একটি আদর্শ। আর ওয়াহশী কে বলে দিয়েছেন তুমি কোন দিন আমার সামনে আসবেনা, কারন তুমাকে দেখলে আমার চাচা হামযা (রা) কথা স্মরন হয়। ফলে আমার অন্তরে যে ব্যাথা অনুভব হয় সেই ব্যাথা আমি সহ্য করতে পারি না। একবার হযরত আলী ( রাঃ) রাসুল (সাঃ) গালি দেওয়ার কারনে এক বিধর্মীকে ধাক্কা দিয়া মাটিতে ফেলে দিয়ে বুকের উপর বসে তলোয়ার হাতে নিলেন, এবার তাকে হত্যা করবেন ঠিক সেই মুহুর্তে ঐ বিধর্মী আলী (রাঃ) মুখে থুথু মারলে সংগে সংগেই আলী (রাঃ) তাকে ছেড়ে দিলেন। তখন ঐ বিধর্মী আশ্চার্য হয়ে জিগ্বাসা করল, আলী (রাঃ) তুমি কেন আমাকে ছেরে দিলে? তখন আলী (রাঃ) বললেন শুন তুমি আমার মুখে থুথু ফেলার আগে তোমাকে হত্যার একমাত্র উদ্যেশ্য ছিল, আল্লাহ ও রাসুলের ভালবাসা, আর যখন তুমি যখন আমার মুখে থুথু ফেলে দিলে তখন হয়ে গেছে আমার ব্যক্তি হিংসা, আর ব্যাক্তি হিংসায় কোন মানুষকে হত্যা করা হারাম, কাজেই আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।

রাসূল (সাঃ) এর সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করার ফলে ওয়াহশী সহ অনেক মূর্তিপুজারী, পৌত্তলিক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহন করেছেন। ক্ষমার মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি ভালবাসা বৃদ্ধি পায়। তবে আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে ক্ষমা চাওয়ার অর্থ হল নিজেকেও অনুতপ্ত করা, লজ্জিত করা অন্যায় অপরাধ মুলক কাজ বারবার না করা। যদি কেউ অপরাধ মুলক কাজ বারবার করে তাহলে সেটা হবে সীমালঙ্ঘন, সিমালঙ্ঘনকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। রাসূল (সাঃ) মক্কা বিজয়ের দিন সবার জন্য সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করলেও কয়েক জনের ব্যাপারে সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করেন নাই বরং তাদেরকে যেখানেই থাকুক না কেন, তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়ে ছিলেন। আর আল্লাহ তা’য়লা সকল অপরাধ ক্ষমা করলেও শিরিক নামক অপরাধ কখনও ক্ষমা করেননা। এখান থেকে আমাদের শিক্ষা হল ক্ষমাযোগ্য অপরাধের একটি সীমা আছে এবং একটা ভুল যেন বারবার না করা হয়।

আসুন আমরা ক্ষমার মাধ্যমে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে আদর্শ ও সুসৃংঙ্খল সমাজ গড়ার চেষ্টা করি। আমিন।

-কেএল

সর্বশেষ সব সংবাদ