fbpx
           
       
           
       
তারকা ছাত্রের চোখে শাইখুল হাদীস মাওলানা শামসুল ইসলাম রহ.
ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২১ ৮:১৯ অপরাহ্ণ

সদ্য প্রয়াত শাইখুল হাদীস মাওলানা শামসুল ইসলাম রহ.। তিনি একাধারে আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ-এর স্বনামধন্য প্রবীণ মুহাদ্দিস। ঐতিহাসিক শহীদি মসজিদের খতিব। হাজারও আলেমের শিক্ষক ও স্বনামধন্য ওয়ায়েজ। হবিগঞ্জের বাহুবলের স্বস্তিপুরে বাড়ি হলেও জীবনের প্রায় ৪৮ বসন্ত কেটেছে কিশোরগঞ্জে। এই শহরের মাটি ও মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন। কিশোরগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল।

মাওলানা শামসুল ইসলাম রহ. পরিচিত ছিলেন ‘মুফাসসির সাহেব হুজুর’ হিসেবে। শহীদি মসজিদে সপ্তাহে একদিন তাফসির করতেন। শহরের অনেক মুসল্লি মুখিয়ে থাকত তার তাফসির শোনার জন্য। তার তাফসিরে হাজারো নারীপুরুষ দ্বীনের পথের আলো পেয়েছেন। তার কীর্তিময় জীবনের নানা দিক নিয়ে দেশের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য পদে থাকা তার তারকা ছাত্রদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছেন আওয়ার ইসলামের বিশেষ প্রতিবেদক মাহমুদুল হাসান। আজকে থাকছে সে সাক্ষাতকারের প্রথম পর্ব। সাক্ষাতকার দিয়েছেন মাওলানা জহির উদ্দিন বাবর, সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরাম।

দরসে কেমন দেখেছেন হুজুরকে?
আল্লামা শামসুল ইসলাম রহ.-এর কাছে আমরা মিশকাত শরিফ কিতাবটি পড়েছি। এককথায় অসাধারণ একজন মুহাদ্দিস ছিলেন তিনি। তার মতো জাঁদরেল ও তুখোড় মুহাদ্দিসের সংখ্যা দেশে খুব একটা নেই। ছাত্রদের বোঝার উপযোগী করে অত্যন্ত সহজভাবে তিনি সবক পড়াতেন। তিনি যে বহুমুখি জ্ঞানের আধার ছিলেন সেটা তার দরসে বসলে বোঝা যেতো।

অগণিত তথ্য, বাস্তবধর্মী উদাহরণ ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ জীবন দ্বারা তিনি প্রতিটি পাঠ ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করতেন। তিনি অত্যন্ত ছাত্রবান্ধব একজন শিক্ষক ছিলেন। ছাত্রদের সঙ্গে তার হৃদ্যতা ও সম্পর্কের গভীরতা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশিই ছিল। তিনি অত্যন্ত খোশ-মেজাজের একজন মানুষ ছিলেন। ছাত্রদের নিয়ে নানা রসিকতা করতেন। ছাত্ররাও ছিল তার জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর প্রতিটি দরস ছাত্ররা মন ভরে উপভোগ করতো।

ব্যক্তি শামসুল ইসলাম রহ. কেমন ছিলেন?
হজরত শামসুল ইসলাম রহ. ব্যক্তিত্বের দিক থেকে অনেক উঁচুমাপের একজন মানুষ ছিলেন। হবিগঞ্জের বাহুবলের একটি খান্দানি পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর কয়েকজন ভাই জাগতিকভাবে বেশ প্রতিষ্ঠিত বলে জানি। তিনি জীবনের সিংহভাগ কাটিয়েছেন কিশোরগঞ্জে। এখানকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে ছিল তার আত্মার সম্পর্ক। ইলমি দিক থেকে জাহাজতুল্য ছিলেন, কিন্তু তাঁর চলাফেরা ও আচরণে সেটা টের পাওয়া যেতো না। একদম সাদাসিধে চলাফেরা করতেন।

শোলাকিয়া রোডের বাসায় তাকে সবসময় হেঁটে যেতেই দেখেছি। মদিনা কিংবা তাজ হোটেলে একজন সাধারণ মানুষের মতোই তাকে চা নাস্তা সারতে দেখেছি। পুরান থানা বাজারে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার। মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, যেকোনো প্রয়োজনে গেলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা, মানুষের কল্যাণকামিতা এই গুণগুলো বিশেষভাবে তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করেছি।

শামসুল ইসলাম রহ.-এর জীবনের কোন দিকগুলো অনন্য বলে মনে করেন?
তার গোটা জীবনটাই অনন্য। কুরআন ও হাদিসের জন্য পুরো জীবন তিনি ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। তার ইলমি অবস্থান সম্পর্কে মূল্যায়ন করবেন সমসাময়িকরা। তবে কিছু বিষয় স্পষ্ট করে দেয় তার ইলমি যোগ্যতা ও অবস্থানের কথা। দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইমদাদিয়ায় তিনি বহু বছর ধারাবাহিকভাবে তিরমিজি ও মিশকাত শরিফ পড়িয়েছেন। দরসে নেজামির অন্তর্ভুক্ত এই দুটি কিতাব যারা পড়ান তাদের ইলমি অবস্থান নিয়ে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রতিটি মাদরাসায় সাধারণত তুখোড় মুহাদ্দিসরাই এই কিতাবগুলো পড়িয়ে থাকেন। শাহ সাহেব হুজুরের জীবদ্দশায় তিনি শহীদি মসজিদে জুমা পড়াতে না পারলে শামসুল ইসলাম রহ.কে ঐতিহ্যবাহী এই মিম্বরে দেখেছি। কিশোরগঞ্জসহ গোটা ময়মনসিংহ অঞ্চলে ওয়াজ ও তাফসির মাহফিলে তিনি অতিথি থাকতেন।

তার পরিচিতি অনেক, তবে কুরআনে কারিমের একজন একনিষ্ঠ খাদেম হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরো কুরআন শরিফের তাফসির সম্পন্ন করার বিরল রেকর্ড তিনি গড়েছেন। এই অঞ্চলে আর কারও এমন রেকর্ড আছে কি না আমার জানা নেই। সবদিক বিচারেই অনন্য উচ্চতায় ছিল তার ব্যক্তিত্ব ও ইলমি অবস্থান। তিনি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় কতটা স্থান করে নিতে পেরেছিলেন সেটার অনুভব করা গেছে বিশাল জানাজা দেখেই।

ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার মাঠে হাতেগোনা যে জানাজাগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকবে বহুকাল এর মধ্যে অন্যতম তার জানাজাটি। একজন মানুষের জীবনের অর্জন ও সাফল্যের বিষয়টি জানাজা দেখেও টের পাওয়া যায়। এতো বিপুলসংখ্যক মানুষের হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা নিয়ে যিনি ওপারে গেলেন নিঃসন্দেহে তিনি উচ্চ মর্যাদায় আসিন হবেন।

আপনার দেখা হুজুরের মাঝে সবচেয়ে ভালোলাগা ব্যাপার কোনটি?
সারল্য এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার গুণটি হুজুরের মাঝে বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছি। এতো বড় একজন মানুষ, এতো ইলমের অধিকারী, কিন্তু এর কোনো প্রকাশ চলনে-বলনে ঘটত না। সবার সঙ্গে মিশতেন, কথা বলতেন, মানুষকে আপন করে নিতেন। এজন্য ছাত্ররা ছিল তার জন্য নিবেদিত। শহরের সাধারণ মানুষও তাঁকে খুব পছন্দ করতো।

তিনি কিশোরগঞ্জে শহরের সব শ্রেণি-পেশার মানুষদের সঙ্গে যেভাবে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন এমনটা খুব কম আলেমেরই আছে। এ কারণেই তিনি এই শহরের মানুষদের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন, যার বহিঃপ্রকাশ আমরা শোলাকিয়া মাঠের জানাজায় দেখেছি।

-কেএল

সর্বশেষ সব সংবাদ