149902

‘প্রথম বই প্রকাশের আনন্দটা মিশে আছে জীবনজুড়ে’

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন
মুহাদ্দিস ও লেখক

একটা সময় বই প্রকাশিত হওয়া এখনকার মতো সহজ ছিল না। সেটা ১৯৯৪-৯৫ সালের কথা। আমার প্রথম বোর্ডবাঁধাই বই প্রকাশিত হয় তখন। হজরত থানবি রহ.-এর রাজনৈতিক চিন্তাধারা। আল্লামা তাকি উসমানি সাহেবের লেখা হাকিমুল উম্মত কে সিয়াসি আফকার-এর তরজমা করেছিলাম। প্রথমে মাসিক পাথেয়তে ধারাবাহিক ছাপা হয়। পরে বই প্রকাশিত হয়।

মাওলানা নোমান সাহেব চট্টগ্রামের মানুষ। ঢাকা বারিধারা মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। একেবারে ব্যক্তিগত আবেগ থেকে তিনি কাজটা করেছিলেন। ইসলামিক একাডেমির নামে ছেপেছিলেন। ভদ্রলোক নিজে একজন কাতেব (লেখক) ছিলেন।

বইটা হাতে পেয়ে আমার যে আনন্দ-আগ্রহ-উত্তেজনা, মানুষ সেটা যেভাবে গ্রহণ করেছিল, সব মিলিয়ে অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করেছিল। ওই সময় বই প্রকাশের চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে- এটা আমার চিন্তায় ছিল না। তখন একটা বই প্রকাশিত হওয়া ঘটনা ছিল।

বইটা যখন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর হাতে দিলাম, বইটা হাতে নিয়ে তিনি চুমু খেলেন, বুকে ধরলেন, কপালে লাগালেন, একটা অসাধারণ ঘটনা আরকি! সেই সঙ্গে বইয়ের নাম পড়ে প্রথমে বললেন, থানবির রাজনৈতিক চিন্তাধারা! কী এটা?

বললাম, আমি তরজমা করেছি। তখন বললেন, তাহলে ঠিক আছে। আবার চুমু খেলেন। তিনি ভাবলেন, একজন ছেলে মানুষ একটা কাজ করেছে, তাকে খুশি করা দরকার, তার কাজের মূল্যায়ন করা উচিত। এরপর বললেন, আকবর এলাহাবাদির কবিতাটা পড়েছেন? আমি বললাম- জ্বি, পড়েছি।

তিনি বললেন, আকবর এলাহাবাদি বলেছেন- আয় দিলে মুহতাত! ডরতা হায় জবাঁ পে হক লানে ছে
আওর মুরিদে থানবি ডরতে হ্যাঁ থানেওয়ালে ছে।

থানবি মাসলাকের লোকেরা আবার রাজনীতির কী বুঝে, এরা তো পুলিশের নাম শুনলে দৌঁড়ায়। হজরত থানবির আবার রাজনৈতিক চিন্তাধারা কী? মানে বিষয়টা সমূলে প্রত্যাখ্যান করলেন। আবার একজন ছেলে মানুষ কাজটা করেছে, তাই কাজটাকে এতোটাই গুরুত্ব দিচ্ছেন যে, বারবার চুমু খাচ্ছেন।

এরপরে তো আল্লাহর মেহেরবানিতে নানা রকমের বই বেরিয়েছে। কিন্তু প্রথম বই প্রকাশের যে আনন্দ, সেটা আমার জীবনজুড়ে মিশে আছে।

আমার লেখালেখির জীবনে কষ্টের স্মৃতি খুব একটা নেই। এর একটা বড় কারণ হলো, কোনো একটা কাজ এখনই করতে হবে বা হয়ে যেতে হবে, একটা বই প্রস্তুত করেছি এখনই প্রকাশ করতে হবে- মানুষের এমন একটা উত্তেজনা থাকে না? এটা আমার স্বভাবে নেই।

নাম নেওয়া ছাড়া বলি, একবার একটা ঘটনা ঘটল যেটা সম্মানজনক নয়। ছেলেপেলেরা বই সম্পাদনা করে ফেলে। আমি মাওলানা আবুল কালাম আজাদের তরজমা করলাম, আর সম্পাদনা করল এমন লোক, যে আবুল কালাম আজাদকে কখনো পড়েইনি। আজাদের বক্তব্যটাও হয়তো তার পক্ষে ভালো করে বোঝা কষ্টকর।

সে লোক সম্পাদনা করে ফেলছে কেন? কারণ সে একজন ভালো প্রুফরিডার। রিডারই সম্পাদনা করে ফেলছে। তো আমি পান্ডুলিপি ফেরত নিয়ে এলাম। এই বইয়ের টাকা অগ্রিম দিয়েছিল। টাকা তো খরচ করে ফেলেছি। ভালো টাকাই। তো সেই টাকা পরিশোধ করলাম। পান্ডুলিপিটা ফেরত এনে পাঁচ-সাত বছর রেখে দিলাম। এখানে যে একটা পান্ডুলিপি আছে আমি সেদিকে খেয়ালই করিনি।

আট-দশ বছর পরে সেটা বই আকারে বেরিয়েছে। তো এটা নিয়ে আমার মাথায় কোনো চাপ ছিল না, এটাকে আমার কোনো কষ্টও মনে হয়নি। এমন তো হবেই। চমৎকার একটি শরীর নিয়ে মানুষ জীবনযাপন করে, সেখানে একটা টিউমার হলে কত কাটাচেরা করে, বিশাল এক ঘটনা ঘটে যায়।

লেখালেখি নিয়ে আরেকটি মজার গল্প আছে। একবার কোথাও গেলাম (সঙ্গত কারণে নামটি বলতে চাচ্ছি না)। আমি আর আমার বন্ধু জুবাইর আহমদ আশরাফ। গিয়ে দেখলাম, সেখানে একজন বড় মানুষ আছেন। আমরা দাঁড়ানো। কয়েকজন বলল, চলেন উনার সঙ্গে দেখা করে আসি।

জুবাইর আহমদ আশরাফ বললেন, কী লাভ? আমরা অনেক কষ্ট করে উনার কাছাকাছি যাব, দাঁড়িয়ে থাকব পনের-বিশ মিনিট, এরপর উনার সঙ্গে দেখা হবে। আগামীকাল দেখা করলেই তো উনি আর চিনবেন না! তাহলে আমরা এই সময়টা নষ্ট করব কেন? এরচেয়ে বরং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করি।এমন মনে না রাখা তো আমাদের দেশের মানুষের একটা স্বাভাবিক চরিত্র।

একবার উত্তরায় গেলাম। প্রফেসর হামীদুর রহমান সাহেবের মাদরাসার অনুষ্ঠান। (তিনি হারদুঈ হজরত মাওলানা শাহ আবরারুল হক রহ.-এর খলিফা)। হাবীবুর রহমান খানকে (মাকতাবাতুল আশরাফের স্বত্বাধিকারী) আগেই বলে রেখেছিলাম, আপনার শ্বশুরের সঙ্গে কখনো মুখোমুখি কথা হয়নি, কখনো এমন সুযোগ হলে আমাদেরকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যাবেন।

তো আমরা সেখানে গেলাম। গল্প-সল্প করলাম। খাওয়া দাওয়া সারলাম। নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। যখন তিনি বাসা থেকে বের হচ্ছেন, তখন হাবীব খান সামনে আছেন, তবু আমি একাই সামনে এগিয়ে গেলাম। সালাম দিয়ে মুসাফাহা করলাম এবং আমার নাম বললাম, আমি মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন।

তখন তিনি মুসাফাহায় হাত ধরে রেখেই চেহারার দিকে তাকিয়ে বললেন, লেখক মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন?
তখন আমি কী বলব, ‘থ’ খেয়ে গেলাম। আমার হতচকিত অবস্থা দেখে হাবীব খান বললেন- জ্বি।

এটা এখন থেকে অন্তত পনের বছর আগে। তখন আমার উল্লেখ করার মতো কী-ইবা কাজকাম ছিল। তো আমি খুব অবাক হয়েছি, এই ভদ্রলোক বাংলাদেশের একজন বড় মানুষ, তাঁর তরুণদেরকে মনে রাখবার বিষয়টা আমার কাছে খুব অসাধারণ লেগেছে।

এর ব্যতিক্রমও আছে। সেক্ষেত্রে তো নাম বলা সমীচীন নয়। আমাদের ঘনারার এমন লোক আছেন, যারা আমাদেরকে এমনিতে চেনেন জানেন। আমার ধারণা, আমরা যে লিখি এটা তারা মানুষের কাছে শোনেন। তাদের কাছে বই দিয়েও জানানো যাবে না, আমরা ভালো করছি না খারাপ করছি। কাগজপত্র নষ্ট করছি, না এই কাগজগুলোও কোথাও কাজে লাগে। এই হলো তাদের অবস্থা। একেবারেই পড়ে না।

তো এই রকমের লোকদের সামনে আমাদের কখনো কখনো পরিচয় করিয়ে দেয় যে, উনি একজন লেখক। তখন খুব বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। উনার কাছে আমি লেখক হলেই কী আর সন্ত্রাসী হলেই কী! মুসাফাহা করে যদি টাকা দিই তাহলে কাজের কাজ হবে।

আমি বাংলাদেশের একজন মানুষ হিসেবে যদি অন্য কারো কাজে আসি, তাতে এই ভদ্রলোকের কী আসে যায়! এই রকমের ঘটনাগুলো বেদনা দেয়, আমরা এমন কেন? আমাদের গোষ্ঠীটা তো আরো বিস্তৃত হতে পারত, দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে আমরা আরও বড় হতে পারতাম।

অনুলিখন : আবু জুয়াইরিয়া

[লেখা ও লেখকের কথা নিয়ে প্রকাশিত সাময়িকী ‘লেখকপত্র’ এর সৌজন্যে]

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

২ responses to “ইসলামি ইতিহাসে আল্লাহর আনুগত্যের সাক্ষী মসজিদুল কিবলাতাইন”

  1. hello!,I really like your writing very a lot! share we keep in touch extra approximately your article on AOL?
    I require an expert in this space to solve my problem.

    May be that is you! Looking ahead to peer you.

  2. Hello it’s me, I am also visiting this website on a regular basis, this site is truly fastidious and
    the users are actually sharing pleasant thoughts.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *