147724

মাহফিল নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ কি ওয়াজ নিয়ন্ত্রণের কৌশল?

সুফিয়ান ফারাবী
ভ্রাম্যমান প্রতিবেদক

ওয়াজ মাহফিলে বক্তাদের বয়ানে ‘সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদে উৎসাহ দেওয়া, ধর্মের নামে বিভিন্ন উপদল তৈরি ও শোবিজ তারকার নামে বিষোদ্গার, নারীদের পর্দার বিষয়ে কটূক্তি’সহ বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে ছয় সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়টিকে ‘প্রাইমারি নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে দেখছেন দেশের শীর্ষ আলেমেরা। তাদের ভাষ্য, কোনও বিশেষ বক্তা ‘বিতর্কিত’ কিছু বললে শুধু ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই পারে রাষ্ট্র। কিন্তু তা না করে ঢালাওভাবে সবার জন্য কঠোর পদক্ষেপে যাওয়াটা আলেমদের নিয়ন্ত্রণের কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবে এ ব্যাপারে সরকারপক্ষ মনে করে, নিয়ন্ত্রণের কোনও কিছু নেই এতে। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি অটুট রাখার স্বার্থে এই সুপারিশের প্রয়োজন আছে।

সম্প্রতি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (ইফাবা), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সব বিভাগীয় কমিশনারের কাছে বক্তাদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাবসহ ওয়াজ নিয়ে ছয়টি সুপারিশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বক্তাদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাবসহ ওয়াজ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৬ সুপারিশ

সুপারিশের মধ্যে করারোপ ছাড়া দেশবিরোধী বক্তব্য দিলে বক্তাদের আইনের আওতায় আনা ও উচ্চশিক্ষিত বক্তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনার সুপারিশও করা হয়।

এ ব্যাপারে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করিম আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘বক্তাদের নিয়ন্ত্রণের প্রাইমারি কৌশল আবিষ্কার করেছে তারা। আর এর প্রমাণ, এখানে এমন কিছু মানুষের নাম তালিকাভুক্ত করেছে, যাদের সঙ্গে ইসলামের আদৌও কোনও সম্পর্ক নেই। এর মাধ্যমে তারা বক্তাদের নিয়ন্ত্রণের প্রাইমারি লেভেলের কাজটা শুরু করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি কোনও বক্তা সরকার বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কথা বলে থাকেন, তবে সরকার তাকে সতর্ক করতে পারে এবং তার বয়ানের ব্যাখ্যা তলব করতে পারে; সেটা না করে ঢালাওভাবে বক্তাদের জড়িয়ে নিয়ন্ত্রণের ছক আঁকা নিন্দনীয়।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া’র শাইখুল হাদিস মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘আমরা মনে করছি, এটি একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। এই সুপারিশের মাধ্যমে ইসলামের সঠিক দর্শন ও চিন্তার উপর বিধিনিষেধ আরোপের অপচেষ্টা চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পেছনে দু’টি উদ্দেশ থাকতে পারে বলে মনে করি আমি। প্রথমত, দেশীয় সংস্কৃতির নামে যে সব হিন্দুয়ানা সংস্কৃতি প্রচলিত আছে, সেগুলোকে বাধা মুক্ত করা। পাশাপাশি অশ্লীলতাকে দেশীয় সংস্কৃতির নামে চালিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, মাঠে ময়দানে যারা ইসলামি সমাজব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেন, তাদের মুখ বন্ধ করা।’

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘কেউ যদি মনে করে, কিছু বক্তার অশোভন আলোচনার ফলে সরকার এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাহলে এটা হবে একপ্রকার ছেলেমানুষী।’

সব জায়গায় এরকম কিছু মানুষ থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি মনে করে, এটা তাদের প্রতিরোধ করার জন্য করা হয়েছে, তাহলে সেটা বোকামি। যারা ওয়াজের নামে কমেডি করছে, আলেমরাই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। যারা কমেডি করেন তাদের প্রতিহত করার জন্য এই সুপারিশে কিছু বলা হয়নি বরং আলেমদের লাগাম টানতেই এরকম ডিসিশন।’

মজলিসে তালিমুস সুন্নাহ’র মহাসচিব মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী বলেন, ‘ওয়াজ মাহফিলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনে মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার হরণের চেষ্টা চলছে। কোনো রাষ্ট্রের মন্ত্রী বা এমপি যদি ইসলামবিরোধী মন্তব্য বা কাজ করে, তবে তার বিরুদ্ধে কথা বলা এবং তাকে সতর্ক করা ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব। এটা ১৭ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব। যদি তা বন্ধ করা হয়, তবে মানুষের ধর্মীয় অধিকার নষ্ট হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা ঠিক কিছু অসাধু ওয়ায়েজ ইসলামের নামে কৌতুক করে বেড়াচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু পুরো ওয়াজ মাহফিলকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ করা ঠিক হবে না।

এ ব্যাপারে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ওয়াজ মাহফিল নিয়ন্ত্রণ বা এর নিরাপত্তার দিকটি আমার মন্ত্রণালয়ের দেখার বিষয় নয়। তবে আমি বলবো, জঙ্গিবাদকে রুখতেই হবে। একইসঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যাতে বিনষ্ট না হয় সে দিকটাও দেখতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে সুপারিশ করেছে তার পেছনে এসব উদ্দেশ্য আছে হয়তো।’

আরও পড়ুন: যে ১৫ জন বক্তার ওয়াজ নিয়ে আপত্তি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের

আরএম/

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *