145925

‘দেশে স্থায়ী কিছু কাজ করে যেতে চাই যার মাধ্যমে অসহায় মানুষ মুক্তি পাবে’

নাম মাওলানা মীর হোসাইন। অনুপম স্থাপত্যশৈলী, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য়ের নান্দনিক ও নৈসর্গিক পরিবেশে ঘেরা বাংলার প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁয়ের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেছেন চাঁদপুর মোমিনপুর মাদরাসায়। এরপর বহুমুখী কওমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদরাসা দারুর রাশাদ এবং উপমহাদেশের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারতের নদওয়াতুল উলামায়।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এ মানুষটি অল্প বয়েস থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন পরবর্তিতে নদওয়ায় পরাশোনার সময় মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. একান্ত সান্নিধ্য থেকে পেয়েছেন উৎসাহ ও দিকনির্দেশনা যা তাকে মানবসেবায় ব্রতী হতে অনুপ্রেরণা যোগায়।

আবুল হাসান আলী নদভী রহ. মীর হোসাইনকে স্নেহ করতেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি আমেরিকা প্রবাসী। বিভিন্ন সেবামূলক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইসলামি সেন্টার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বর্তমানে তিনি মিশিগান সিটিতে মোহাম্মদিয়া মাদরাসার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সেবা সংস্থা বাসমাস ইউ এস এ (BASMAH USA ) এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক । বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষ এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্যে নিরলসভাবে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করে যাচ্ছে বাসমাহ।

এসব বিষয় নিয়েই তার সাথে মোবাইলে কথা বলেছেন আওয়ার ইসলামের বিশেষ প্রতিনিধি উবায়দুল্লাহ সাআদ

আওয়ার ইসলাম: কেমন আছেন?
মীর হোসাইন: আলহামদুলিল্লাহ ভাল আছি।

আওয়ার ইসলাম: আমেরিকায় যাওয়ার প্রেক্ষাপট জানতে চাচ্ছি।

মীর হোসাইন: আমি মূলত আমেরিকাতে ২০০১ সালে এসেছিলাম ভিজিট ভিসায় । সেসময় বাংলাদেশে মাদরাসার খেদমতের পাশাপাশি ব্যবসার সাথেও জড়িত ছিলাম সে সূত্র ধরেই এখানে আসা।

প্রথমে মিশিগানে এসেছিলাম কিন্তু সেখানে কোন ব্যবসায় থিতু হতে না পেরে সেখান থেকে টেক্সাসে চলে আসি, টেক্সাসে আমার চাচার প্রস্তাবে ব্যবসা করার ইচ্ছা থাকা সত্বেও করা হয়নি। পরবর্তিতে যখন সিদ্ধান্ত নেই বাংলাদেশে চলে আসার তখন মিশিগান সিটির ‘মাদরাসা দারুল উলুম ডি ট্রইড’ থেকে তাদের মাদরাসার দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব পাই।

প্রস্তাব যথাযথ ও সম্মানজনক মনে হওয়ায় পরিবারের অনিচ্ছা সত্বেও আমেরিকায় স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

আওয়ার ইসলাম: আমেরিকার শুরুর দিনগুলির অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো?

মীর হোসাইন: খুব কষ্টের ছিল না আবার অতটা সুখকরও ছিল না। তখন নববিবাহিত ছিলাম। সবার অনিচ্ছা সত্বেও এখানে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্যে ছিল দ্বীনের খেদমত করা; অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না।

টাকার জন্যে এখানে থাকিনি। কেননা আমরা সচ্ছল পরিবারে বড় হয়েছি, ঢাকায় আমার ভালো ব্যবসা ছিল। মাদরাসা থেকে সামান্য হাদিয়া পেতাম। এমনও সময় অতিবাহিত করেছি যখন বাংলাদেশ থেকে টাকা এনে চলতে হয়েছে।

মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আমাকে দেওয়া কমিটমেন্ট ঠিক রাখতে পারেনি, বাস্তব কথা হলো, এখানকার মাদরাসাগুলির কালচার বাংলাদেশের মতই!

আওয়ার ইসলাম: সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠলেন কিভাবে?

মীর হোসাইন: দারুল উলুম মিশিগান থেকে চলে আসার পর আমি আমার নিজস্ব প্রচেষ্টায় বাড়ি কিনে মোহাম্মদিয়া মিশিগান নাম দিয়ে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করি। মোহাম্মদিয়া নামটি নির্বাচন করার পেছনেও একটি কারণ ছিল, আবুল হাসান আলী নদভী রহ. আমাকে নারায়নগঞ্জে এ নামে একটা মাদরাসা করতে বলেছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকার রাষ্ট্রীয় সকল নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এখনো যথাযথভাবে চলছে সকলের দোয়ায়। আলহামদুলিল্লাহ।

এখানে আরেকটি কথা আপনাকে বলি, আমি বর্তমানে আমার নিজস্ব অর্থায়নে ক্রয় করা ওই বাড়ি মোহাম্মদিয়া মাদরাসার নামে ওয়াকফ করে দিয়েছি।

আওয়ার ইসলাম: মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার আগ্রহ পেয়েছেন মূলত কোথা থেকে?

মীর হোসাইন: অল্প বয়সে পরিবারে থেকেই মূলত এ আগ্রহ জন্মে। পরবর্তিতে নদওয়াতুল উলামায় যখন গিয়েছি তখন আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. একান্ত সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে সেখান থেকে আরো বেশি সমাজ সেবার প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়েছি।

আওয়ার ইসলাম: ব্যাপকভাবে সমাজসেবার সূচনা করেন কবে থেকে?

মীর হোসাইন: আমি আগেই আপনাকে বলেছি ছোট কাল থেকেই আগ্রহ ছিল আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার। মূলত এই চেতনাবোধ থেকেই ১৯৯৯ সালে মীর ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করি।

এরপরে যখন আমি আমেরিকাতে চলে আসি তখন মিশিগানে থাকাকালীন অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল। তবে মিশিগান থেকে ফ্লোরিডায় চলে এলে আমার মনে হলো, আমরা যে কষ্টটা এখানে করছি আমাদের ছেলে-মেয়েদের এরকম কষ্ট আর করতে হবে না। হয়তো তারা আরো ভাল কিছু করবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু তাদের যদি বাংলাদেশের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি মায়া-মমতা, দায়িত্ব কর্তব্য আমরা শিখিয়ে না দিয়ে যাই তবে একদিন তারা তাদের বাবার দেশ মায়ের দেশকে ভুলে যাবে। চোখের সামনে এমন অসংখ্য পরিবার প্রতিনিয়ত দেখছি।যা বাস্তবে ঘটছে।

আমেরিকাতে অনেক পরিবার এমন রয়েছে তাদের ছেলে-মেয়েরা দেশকে ভুলে ভুলে গেছে! দেশের প্রতি তাদের কোন ভালোবাসা নেই ! মায়া মমতা নেই। মূলত এ দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যপকভাবে বাংলাদেশের অবহেলিত মানুষের জন্যে কাজ শুরু করি। নিজের পরিবারকে এর সাথে সম্পৃক্ত করি।

আলহামদুলিল্লাহ্‌ আমেরিকায় আমার নিকট আত্মীয়দের অনেকেই থাকেন। আমি তাদের সাথে বিষয়টি শেয়ার করলে তারাও যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। দেশের প্রতি ভালোবাসার নতুন অর্থ খুঁজে পান।

বর্তমানে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে মীর ফাউন্ডেশন নামেই সরকারি নিবন্ধন নিয়ে বাংলাদেশে নানাবিধ কার্যক্রম চলছে।

আওয়ার ইসলাম: বাসমাহ ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু কখন কিভাবে?

মীর হোসাইন: মীর ফাউন্ডেশন নামে আমাদের কার্যক্রমের পরিধি ক্রমেই বাড়ছিল এরই মাঝে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমরা আশ্রয় গ্রহণ করতে আরম্ভ করলে তাদের জন্যে কিছু করার প্রয়োজন অনুভব করি। বিষয়টি সবার নজরে আনার পর সবার কাছ থেকেই বেশ ভাল সহযোগিতা পাই।

আরেকটা বিষয় বিশেষ করে বলতে চাই তা হলো, রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে আমি প্রথমত সম্যক অবগত ছিলাম না। পরে বাংলাদেশের একজন আলেমের মাধ্যমে বিস্তারিত জানতে পারি এবং সেই আলেমের মাধ্যমেই রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ শুরু করি।

মীর ফাউন্ডেশন যেহেতু আমার নামের সাথে মিলিয়ে নাম রেখেছিলাম, অবশ্য এতে কোন উদ্দেশ্য ছিল না তবুও একটু বেমানান মনে হওয়ায় সকলের পরামর্শে মীর ফাউন্ডেশনের অধীনে ‘বাংলাদেশ আমেরিকান সোসাইটি অফ মুসলিম এইড এন্ড হিউমিনিটি’ (BASMAH) যার সংক্ষিপ্ত হলো বাসমাহ এর যাত্রা শুরু হয়।

‘বাসমাহ’ নামকরণের পেছনে একটা বড় কারণ হলো আরবী ‘বাসমাহ’ শব্দের অর্থ হলো ‘হাসি’ (Smile) আর বাসমাহ ফাউন্ডেশন সমাজের পিছিয়ে পড়া অবহেলিত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চায়।

আওয়ার ইসলাম: সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে কখনো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন?

মীর হোসাইন: অসহায় মানুষের জন্যে কাজ করতে গিয়ে কখনো বড় ধরণের বাধার সম্মুখীন হইনি তবে সমস্যা হলো বাংলাদেশে বিশ্বস্ত, কর্মঠ ও আমানতদার মানুষ পাওয়া সহজ নয়! এটা আমার কাছে সব চেয়ে বড় বাধা মনে হয়।

সমাজ সেবার মনোভাব আছে এমন বিশ্বস্ত পাওয়াই যায় না; আমানতদার না হলে সেবামূলক কাজ সম্পৃক্ত হয়ে সুষ্ঠভাবে কাজ করা সম্ভব নয়।

আওয়ার ইসলাম: সামাজিক সংগঠন বাসমাহ ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?

মীর হোসাইন: আপনি হয়ত জেনে থাকবেন আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাহেবের সাথে দেখা করেছিলাম। মন্ত্রীমহোদয়ের কাছে বাসমাহ ফাউন্ডেশন এর সরকারি অনুমোদের আবেদন জানালে তিনি খুব সহজেই তা করে দেন এবং প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের অবহেলিত অসহায় মানুষদের নিয়ে কাজ করায় বাসমাহ পরিবার উৎসাহ দেন এবং ধন্যবাদ জানান।

বাসমাহ ফাউন্ডেশন এখন বাংলাদেশ এবং আমেরিকা উভয় দেশের সরকার অনুমোদিত একটি ইসলামিক এনজিও। আমাদের কাজগুলি একটু ভিন্ন রকম আমরা কোন অস্থায়ী কাজের প্রতি আগ্রহী নই। আমরা স্থায়ী কিছু করতে চাই যার মাধ্যমে সমাজে অবহেলিত অসহায় মানুষ তাদের এই কষ্টের জীবন থেকে স্থায়ী মুক্তি পায়।

মীর ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যে রংপুর এবং কুড়িগ্রামে সেলাই প্রশিক্ষণ সেন্টারের মাধ্যমে শেলাই মেশিন বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে যার মাধ্যমে স্থায়ী ইনকাম সম্ভব হবে। রোহিঙ্গাদের মাঝেও প্রচুর সেলাই মেশিন বিতরণ করেছি এর মাধ্যমে স্ব-নির্ভর জীবন-যাপনে অব্যস্ত হবে।

শুধু তাই নয় বাসমাহ ফাউন্ডেশন আলেম-উলামা মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন তাদের নিয়ে কাজ করতে বেশি আগ্রহী, কিন্তু তাদের তো এগিয়ে আসতে হবে আলেমরা এগিয়ে আসলে আমরা সমাজের অবহেলিত মানুষের কাছে সহজেই পৌঁছুতে পারব বলে মনে করি।

আওয়ার ইসলাম: ভবিষ্যত প্রজন্ম যারা সমাজ সেবা করতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে আপনার কোন নির্দেশনা?

মীর হোসাইন: দেখুন যারা সমাজের অসহায় দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায় তাদের আমি স্বাগত জানাই। তবে আমানতদারী পরিশ্রম করার ইচ্ছা এবং ধৈর্য না থাকলে এ কাজে না আসাই ভালো।

আওয়ার ইসলাম: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে কষ্ট করে সময় দেওয়ার জন্য।

মীর হোসাইন: আপনাকেও ধন্যবাদ আওয়ার ইসলামকে ধন্যবাদ, দোয়া করবেন যেন মৃত্যু পর্যন্ত আমানতের সাথে সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারি।

আরআর

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *