২০১৯-০১-৩১

শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯

প্রাণের বইমেলায় ইসলামি বইয়ের স্টল চাই

OURISLAM24.COM
news-image

আরিফ রব্বানী

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই শুরু হয়ে যায় বাঙালির প্রাণের মেলা খ্যাত ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। এ মেলাকে ঘিরে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজ করে। শত ব্যস্ততার পরেও পহেলা ফেব্রুয়ারির আগেই কীভাবে বই ডেলিভারি দেওয়া যাবে সেই তোড়জোড়ও দেখা দেয় ছাপাখানাগুলোতে।

বলতে গেলে এ মাস এলেই বইপ্রেমীদের মাঝে অন্যরকম এক আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। প্রিয় লেখকদের বই হাতে পেতে পাঠকেরা কখনওবা দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করে। সেই অপেক্ষার ফল যখন ফেব্রুয়ারিতে আসে তখন খুশির অন্ত থাকে না। গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী, সায়েন্সফিকশন, শিশুতোষ ছড়া-গল্প এবং বিষয়ভিত্তিক নানান বইয়ের সমাহারে ভরে যায় মেলাপ্রাঙ্গণ।

এসব বই হাতে পেয়ে পাঠকবর্গের তৃষ্ণা নিবারণ হলেও প্রতিবারই উপেক্ষিত হয় ইসলামি বইপ্রিয় পাঠকরা। বিশেষ করে অভিভাবকগণের একটা সুপ্ত আশা থাকে, সন্তানদের চাহিদামাফিক বই কেনার সাথে সাথে কিছু ধর্মীয় বইপুস্তকও কিনার। কিন্তু সেই আশা মনেই থেকে যায়।

গতবছর বইমেলায় পরিবারসহ ঘুরতে আসা ‘মালেকা বেগম’ নামের এক নারীর সাথে কথা হয় যুগান্তর পত্রিকার এক রিপোর্টারের। কথাপ্রসঙ্গে সেই মহিলা দূঃখভরা কণ্ঠে বলেন, ‘বইমেলায় তো সবরকমের বইয়ের স্টল দেখলাম। কিন্তু অভিজাত ইসলামি প্রকাশনাগুলোর তেমন স্টল দেখলাম না। ছেলেমেয়েদের পছন্দের বই কিনে দিয়েছি। কিন্তু আমার পছন্দ করার মতো কোনো ইসলামি বই খুঁজে পেলাম না।’

ইসলামি বই খুঁজে না পাওয়ার দুঃখ শুধু মালেকা বেগমের একারই নয় বরং খুঁজলে এমন হাজারো মালেকা বেগম পাওয়া যাবে যারা ইসলামি বই না পাওয়ার হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে।

একুশে বইমেলা এটি কোনো বিশেষ শ্রেণির একার নয়। তাইতো দেখা যায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এ বইমেলায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। সবাই তার নিজ নিজ পছন্দের বই কিনে তৃপ্ত হলেও অতৃপ্ত থেকে যায় ধার্মিকপ্রিয় পাঠকেরা।

গত ‘১৮-এর বইমেলায় স্টলের সংখ্যা ছিল ৬৬২টি। কিন্ত তাতে ইসলামি বই প্রকাশকদের কোন স্টল নেই বললেই চলে। তবে অনোন্যপায় হয়ে কিছু কিছু প্রকাশক নিজেদের বই অন্য প্রকাশনীর স্টলে রেখে বিক্রি করে। কিন্তু এ কাজটি কতটা লজ্জা আর অপমানের তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বইমেলাতে ইদানীং মাদরাসা পড়ুয়া ছাত্রদের আনাগোনা বেশ চোখে পড়ার মতো। প্রিয় লেখকদের বই পেতে তারাও উৎসুক থাকে। তারাও চায় নিজেদের ঘরানার লেখকদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করতে। মনের ভাব আদানপ্রদান করতে। অটোগ্রাফসহ বই কিনতে। কিন্তু এই সৌভাগ্য আর হয়ে উঠে না।

নিজস্ব স্টল না থাকায় লেখকদের সমাগম যেমন কম থাকে তদ্রূপ পাঠকেরাও জানতে পারে না কে কবে মেলায় আসছে। ফলে লেখক-পাঠক মিলনমেলার অপরূপ দৃশ্য আর দেখা যায় না।

এত বিশাল মেলার কোনো ‘নীতিমালা’ থাকবে না এটা হতে পারে না। কিন্তু কোনো ইসলামি প্রকাশনী সেই নীতিমালা মেনে যদি স্টল বরাদ্দের আবেদন জানায় তাকে কেন স্টল দেওয়া হবে না? নব্বই সালের দিকে বাংলাবাজারের অভিজাত কিছু প্রকাশনীর স্টল বইমেলাতে দেখা গেলেও এখন আর সেগুলোরও দেখা মিলে না বলে অভিযোগ অনেকের।

কেন স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয় না এমন প্রশ্ন ছুড়লে ইসলামি ঘরানার প্রকাশনমালিকরা উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো কারণের কথাও বলতে পারে না। অনেকের দাবি শুধু ‘ইসলামি প্রকাশনী’ হবার কারণেই হয়তো আমরা বইমেলায় স্টল বরাদ্দ করতে পারি না।

অনলাইন ঘাঁটলে এমন কিছু তথ্য পাওয়া যায়, যার দ্বারা বুঝা যায় ‘বাংলা একাডেমি’র দায়িত্বশীলরা ইসলামি প্রকাশনীদের একটু বাঁকা চোখেই দেখে। ইসলামমনাদের আবেদন বা অভিযোগ তোয়াক্কাই করে না তারা।

গত ৬-২-২০১৭ তে আওয়ার ইসলাম থেকে ‘ইসলামি বই প্রকাশকদের দুঃখগাঁথা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা মুনাসিব মনে করছি, ‘বাংলাবাজারের প্রকাশনা জগতের বিভিন্ন লোকদের কাছে জানা গেল, বইমেলা কর্তৃপক্ষের কিছু লোক ইসলামিক স্টলগুলোর কথা উঠলেই ‘এখানে ইসলামিক স্টল থাকবে কেন!’ বলে চিল্লিয়ে ওঠেন। ভদ্রভাবে কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ এভাবে যুক্তি তুলে ধরেন যে, ‘আপনাদের জন্য তো ইসলামিক ফাউন্ডেশন বইমেলা আছে। তাছাড়া আপনারা হুজুর মানুষ, দেখেনই তো এখানকার পরিবেশ আপনাদের অনুকূলে না, ইসলামি প্রকাশনা হিসেবে আপনাদের জন্য ’ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ বইমেলাই অনুকূল, সুন্দর পরিবেশ’।

‘…..মাকতাবাতুল আশরাফের স্বত্ত্বাধিকারী আরো জানান, সকল ধরনের শর্ত ইত্যাদি পুরা করার পরেও কখনো কখনো তারা (একাডেমি) বলতো, ঠিক আছে। কিন্তু লটারিতে আপনাদের নাম আসেনি—এ বলে পাশ কাটাতো। অভিজাত প্রকাশনার এ মালিক আরো বলেন, পরে আমরা গোপনসূত্রে জানতে পেরেছি, লটারিতে ইসলামি প্রকশনাগুলোর নামই রাখা হয়নি!’

মোহাম্মদী লাইব্রেরি ও নাদিয়াতুল কুরআন বলেন, নিজেদের পরিচিত উচ্চ পদস্থ লোকদের দিয়ে কাজ চালালে জানতে পারি, ‘তারা (একাডেমি) আমাদের নাম পরিবর্তন করতে বলে, ’ইসলামি নাম’ এখানে (মেলায়) চলতে পারবে না বলে ব্যক্ত করে তারা।’

সাম্প্রদায়িকতার স্লোগানধারিদের থেকেই যদি অসাম্প্রদায়িক আচরণ পাওয়া যায় তখন আফসোসের অন্ত থাকে না। যদিও এসব অভিযোগ ‘বাংলা একাডেমি’র কাছে তুলে ধরলে তারা নাকচ করে দেয়। কিন্তু তাদের কাজের মাধ্যমে নাক ছিটকানোর একটা মনোভাব থেকেই যায়।

যদি অভিযোগ সত্যই না হবে তাহলে এতদিনেও ইসলামি প্রকাশনীর কোন স্টল দেখা যায় না কেন? কেন তাদের নিজস্ব শতাধিক এবং প্রতি বছর বিশের ওপরে বই প্রকাশ হবার পরও স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয় না? কেন ছাপা এবং বইয়ের মান উন্নত হওয়া সত্বেও বইমেলায় একটু জায়গা পায় না?

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমপ্রধান এই দেশে এমন দ্বিমুখী আচরণ সহ্য করা যায় না। আমরা সরকারের কাছে এর যথোচিত বিচার দাবি করি। প্রাণের বইমেলায় ইসলামি বই প্রকাশকদের স্টল বরাদ্দ চাই। তা নাহলে খোদ সরকারই সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা লালন করে বলেই আমাদের ধারণা হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী; জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম, ঢাকা।

আরআর