২০১৬-১২-১০

মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯

হিন্দুরাষ্ট্রে কওমি শিক্ষার্থীরা ‘নিয়ন্ত্রণমুক্ত’ সুবিধা পেলে বাংলাদেশে কেন নয়: আল্লামা আহমদ শফী

OURISLAM24.COM
news-image

hathajari4

আওয়ার ইসলাম: দেশের শীর্ষ আলেম শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সভাপতিত্বে দেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড সমূহের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিবৃন্দের এক সভা ১০ ডিসেম্বর শনিবার সকাল ১০টায় দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসায় মহাপরিচালকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ, আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশ, তানজিমুল মাদারিস আদ-দ্বীনিয়া বাংলাদেশ, গওহর ডাঙ্গা বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া বাংলাদেশ এবং জাতীয় দ্বীনি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধিগণ শরীক হন।

সভার শুরুতেই পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত শেষে বেফাক সভাপতির প্রেসসচিব মাওলানা মুনির আহমদ গত ২৩ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া শাহ আহমদ শফীর ৬ পৃষ্ঠার চিঠির কপি পড়ে শোনান। এরপর এই চিঠির আলোকে কওমি বোর্ড প্রতিনিধিগণ নিজ নিজ বক্তব্য পেশ করেন। সভা পরিচালনা করেন, ঢাকা খিলগাঁও মাখজানুল উলূম মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা নূরুল ইসলাম।

বৈঠকে বেফাক সভাপতি আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসাসমূহ দারুল উলূম দেওবন্দের উসূল তথা নীতি-আদর্শ মতে পরিচালিত হয়। সনদের ইস্যুসহ যে কোন বিষয়ে দেওবন্দের নীতি-আদর্শের পরিপন্থী কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ যেভাবে পরিচালিত হয়, সনদের বিষয়ে দারুল উলূম দেওবন্দের নীতিমালা যেরকম, আমরা সেভাবে চলতে চাই। ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ সে দেশের সরকারের সাথে কোনরূপ দাপ্তরিক সম্পর্ক ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের শিক্ষাক্রমসহ সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতদসত্বেও হিন্দু অধ্যুষিত একটা দেশের সরকার স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেওবন্দসহ অন্যান্য কওমি মাদ্রাসার সনদকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে। ভারতের কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা অর্ধেক ভাড়া দিয়ে যাতায়াতসহ সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্যে প্রদেয় সকল সুবিধা ভোগ করছে।

তিনি বলেন, হিন্দু অধ্যুষিত একটা দেশে উলামা-মাশায়েখ ও মাদ্রাসা ছাত্ররা কোন ধরনের সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও বিধির আওতায় যাওয়া ছাড়াই যদি বিশেষ মর্যাদা ও সুবিধা পেয়ে থাকেন, এ পর্যায়ে আমাদের সরকারের কাছে জিজ্ঞাসা, তারা বৃহৎ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্যে ন্যুনতম ভারত সরকারের মতো মর্যাদা ও সুবিধা দিচ্ছেন কি?

তিনি বলেন, বেফাকসহ দেশের অন্যান্য কওমি বোর্ড ও বড় বড় মাদ্রাসা দাওরায়ে হাদীস উত্তীর্ণ ছাত্রদের সনদ দিয়ে থাকে। সরকার কওমি সনদকে মান দিতে চাইলে কোন কমিশন, নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে মান দিতে পারে। তবে সনদ স্বীকৃতির নামে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোনরূপ সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা আমরা মেনে নেব না।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী কওমী মাদ্রাসার দেওবন্দী নীতি-আদর্শ ও স্বকীয় বৈশিষ্ট বজায় রাখার বিষয়ে উপস্থিত বোর্ড প্রতিনিধিগণকে সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী আরো বলেন, ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দের মতো সনদের মান দিতে সরকার রাজি না হলে, ইংরেজ শাসনামল থেকে এ পর্যন্ত কওমি মাদ্রাসাসমূহ জনগণের সাহয্য-সহযোগিতা ও সমর্থন নিয়ে যেভাবে চলে আসছে, সেভাবেই চলবে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। নাগরিকগণ ধর্ম কীভাবে পালন করবেন, কীভাবে শিখবেন, কীভাবে শেখাবেন, তাতে সবার স্বাধীনতা রয়েছে। এই স্বাধীনতায় রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে না। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নাগরিকদের শিক্ষার্জনের স্বাধীন অধিকারে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।

আল্লামা সুলতান যওক নদভী বলেন, ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা কাসেম নানুতুভী (রাহ.) প্রণীত ৮ মূলনীতির মধ্যে ৭নং মূলনীতিতে সরকারের যেই কোন অংশীদারিত্ব কওমি মাদ্রাসার জন্যে ক্ষতিকর বলে লিখেছেন। এটা মেনে চলার ব্যাপারে আমাদের সকলকে মজবুত থাকতে হবে।

তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যে সরকারের এত আগ্রহ ভাল লক্ষণ নয়।

তিনি বলেন, কওমি সনদের স্বীকৃতি নয়, বরং সনদের মান গ্রহণের জন্যে হাটহাজারীর হুজুর যেসব শর্ত দিয়েছেন, তার সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত।

সভায় পটিয়া মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা আব্দুল হালিম বুখারী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া বেফাক সভাপতি শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর যে চিঠিটি পড়ে শোনানো হয়েছে, তার প্রতিটি শব্দ ও অক্ষরের সাথে আমি একমত পোষণ করি। হাটহাজারী হযরত অত্যন্ত সুন্দরভাবেই তাঁর বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, কোন ধরনের সরকারী কমিশন, কমিটি, কওমি শিক্ষা আইন, নিয়ন্ত্রণ ও সিলেবাসে হস্তক্ষেপ ছাড়া শুধু প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের বিদ্যমান সনদকে যদি সরকার মান দেয়, তবে গ্রহণ করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। এর বাইরে সনদের স্বীকৃতি নেওয়া সর্বাবস্থায় ক্ষতিকর হবে।

আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, কওমি মাদ্রাসার সনদের সরকারি মান না থাকায় আমাদের যে ক্ষতি রয়েছে, সরকারি মান গ্রহণ করা তার চেয়ে অনেক গুণ বেশী ক্ষতিকর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সনদের সরকারী স্বীকৃতি কখনোই কল্যাণকর হবে না। তিনি বলেন, কোন কমিশন গঠন, সিলেবাসে হস্তক্ষেপ ও সরকারী নিয়ন্ত্রণ ছাড়া শুধুমাত্র কওমি সনদের সরকারী মান দিলে গ্রহণ করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে আমাদের শর্ত মেনে সরকার যদি কওমি সনদের মান না দেয়, তবে সেটা দ্বিগুণ কল্যাণকর। আমাদের কোন ভুলের জন্যে যেন কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষতি হয়ে না যায়, সে জন্যে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ বলেন, আমি ইতিপূর্বেও বার বার বলেছি, শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী হুজুরের পা যেখানে, আমি ফরীদ উদ্দীনের মাথাও সেখানে যেতে পারবে না। আমি সর্বাবস্থায় তাঁর নির্দেশনা মতেই চলতে চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আল্লামা শাহ আহমদ শফী যে চিঠি দিয়েছেন, যে নিয়মের মধ্য দিয়ে সনদের মান নেওয়ার কথা বলেছেন, তার সাথে আমিও সম্পূর্ণ একমত। হুজুরের নির্দেশনা মতে দারুল উলূম দেওবন্দের সাথে আমাদের সম্পর্ককে আরো মজবুত করতে হবে।

তিনি বলেন, যে কোন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। সেটা বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসা সহজ হয়। আজকের বৈঠকে আমাদের সকল বোর্ড প্রতিনিধিগণ একসাথে বসে কথা বলছি, আমি মনে করি এটা বিশাল অগ্রগতি।

মাওলানা রূহুল আমীন বলেন, সনদের মানগ্রহণ সম্পর্কে বেফাক সভাপতি আল্লামা শাহ আহমদ শফী যে রূপরেখা চিঠিতে তুলে ধরেছেন, তার সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। তিনি সনদের মান গ্রহণের বিষয়ে বেফাক সভাপতির নেতৃত্বে সকল বোর্ডকে এক থাকার উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, অন্ততঃ প্রাথমিকভাবে সনদের মানগ্রহণের প্রশ্নে উপস্থিত সকল বোর্ড যেন ঐকবদ্ধ থাকতে হবে।

সভায় কওমি মাদ্রাসা বোর্ডসমূহের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদের সরকারি মান গ্রহণের বিষয়ে সকলের মতামত গ্রহণ করা হয়। এরপর আলোচ্য বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে সর্বম্মতিক্রমে সভায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়।

shofi

১নং সিদ্ধান্ত
শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (দা.বা.)এর নেতৃত্বে কওমি মাদ্রাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট ও স্বকীয় অবস্থান বজায় রেখে কোনরূপ সরকারি কর্তৃপক্ষ ও কমিশন গঠন এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যতিরেকে কওমি শিক্ষা পদ্ধতি, সিলেবাস ও মাদ্রাসা পরিচালনায় যে কোনরূপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়া কওমি মাদ্রাসা সমূহের দাওরায়ে হাদীসের সনদকে ইসলামিয়াত ও আরাবিয়াতের উপর এমএ-এর মান প্রদান করা হলে, উপস্থিত কওমি মাদ্রাসা বোর্ডসমূহ এবং অপরাপর কওমি মাদ্রাসাসমূহ সনদের মান গ্রহণের উপর একমত পোষণ করে।

২নং সিদ্ধান্ত
কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদের মান গ্রহণ সম্পর্কে উল্লিখিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে “কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদের মান বাস্তবায়ন কামিটি” নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকবেন- শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (দা.বা.)। উক্ত কমিটিতে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ থেকে ৭ জন, ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ থেকে ৩ জন, আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশ থেকে ৩ জন, তানজিমুল মাদারিস আদ-দ্বীনিয়া বাংলাদেশ থেকে ৩ জন, গওহর ডাঙ্গা বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া বাংলাদেশ থেকে ৩ জন এবং জাতীয় দ্বীনি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ থেকে ৩ জনসহ মোট ২২ জন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

৩নং সিদ্ধান্ত
আজকের সভায় গৃহীত ১নং সিদ্ধান্তের আলোকে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদের মান গ্রহণের বিষয়ে “কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদের মান বাস্তবায়ন কামিটি” ও সরকারী কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্যে ৫ সদস্যের একটি ‘লিয়াজো কমিটি’ গঠন করা হয়। লিয়াজো কমিটির সদস্যগণ হলেন- মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, মাওলানা মুফতী রূহুল আমীন, মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, মাওলানা মাহফুজুল হক ও মুফতী নূরুল আমীন।

সভায় গৃহীত উল্লিখিত সিদ্ধান্ত সমূহের উপর সম্মতি প্রদান করে উপস্থিত বোর্ড প্রতিনিধিগণ স্বাক্ষর করেন। সবশেষে বেফাক সভাপতি শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী মুনাজাত পরিচালনা করে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

আরআর

হাটহাজারীতে সম্মিলিত বৈঠক শেষ; গুরুত্বপূর্ণ ৩ সিদ্ধান্ত