fbpx
           
       
           
       
জীবনের প্রথম রোজা
জুন ০৭, ২০১৬ ২:৩৫ অপরাহ্ণ

মাহ্দী খান অয়ন : তখন খুব ছোট ছিলাম। ক্লাস ওয়ানে পড়ি। নাকের ডগায় পরীক্ষা। পবিত্র রমজান মাসও সামনে। পরীক্ষা-রমজান একসাথে। ছোট ছিলাম বলে রোজা রাখার অনুমতি ছিল না। সবার সবসময় একটাই ফন্দি, কীভাবে ভুলিয়ে-ভালিয়ে আমাকে খাওয়ানো যায়।

গত বছর রমজানে দেখেছিলাম, আমার সমবয়সীরা দু’ একটি রোজা রাখে। সবাই তাদের আদর করে। আর উপহার দেয়। আমার খুব ইর্ষা হতো। তাই, এবার আমার মনটা শক্ত হলো। প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। পূর্ণ ইরাদা করলাম। সবগুলো রোজা রাখার জন্য।

আর, আব্বু-আম্মুর কাছে রোজা রাখবো বলে আবদার করলাম। কেঁদে কেঁদে। তাঁরা রাজী হলেন। আর বলে দিলেন, তিনটি রোজা রাখতে পারো। এর বেশি না। কেননা, সামনেই পরীক্ষা।

দুই.
আগামীকাল থেকে রোজা। আব্বু অনেক কিছু কিনে আনলেন। ইফতারির জন্য। এদিকে আব্বুর ব্যবসার মৌসুম। খুব ব্যস্ততা। রাতে আসেন। বারোটা একটার দিকে। শোবার আগে আম্মুকে বললাম, সেহরিতে ডেকে দেয়ার জন্য। আম্মু বললেন, ঠিক আছে। চিন্তা করলাম, আব্বুকেও বলা দরকার। কিন্তু, কীভাবে?

তখন ফোনের প্রচলন ছিল খুবই কম। তাই চিঠি লেখা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। কী আর করার, চিঠিই লিখলাম। আব্বুর কাছে। ভাঁজ করলাম। সুন্দর করে। রেখে দিলাম আব্বুর টেবিলঘড়ির নিচে। বুদ্ধি করে। যাতে, এ্যালার্ম দেয়ার সময় চিঠিটা আব্বুর হাতে পড়ে।

তিন.
অয়ন! অয়ন!! ওঠো! সেহরির সময় হয়েছে। সেহরি করবে না! ওঠো বাবা! আব্বুর ডাক। খুব খুশি হলাম। খুশিতে, ঘুম ছিল যতো চোখে, সব উড়ে গেলো এক নিমিষে। উঠলাম। অজু করলাম। সবার সাথে বসলাম। তৃপ্তিভরে সেহরি করলাম।

‘সেহরির সময় শেষ! আর খাবেন না!!’ মুয়াজ্জিন সাহেবের কণ্ঠ। ভেসে আসছে মসজিদের মাইক থেকে। আব্বুর সাথে মসজিদের পথ ধরলাম। ফজরের নামাজ আদায় করলাম। বাসায় এলাম। ঘুম দিলাম। বিশাল লম্বা চওড়া ঘুম!

চার.
সকাল দশটা। সবাই ঘুম থেকে উঠেছে। প্রথম রোজা উপলক্ষে, স্কুল বিরতি দিয়েছিলো। তাই স্কুল থেকে দেয়া বাড়ির কাজ করতে বসলাম। আম্মু বললেন, ‘জানো বাবা! রমজান মাসে একটি নেক আমল করলে, তার ছাওয়াব সত্তর গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়’ সুবহানাল্লাহ্!! তাই, কায়দা-আমপারা নিয়ে বসলাম। পড়লাম। বেশি ছাওয়াবের আশায়।

গোসল করলাম। মসজিদে গেলাম। আব্বুর সাথে। জোহর নামাজ আদায় করার জন্য। ইমাম সাহেব দাঁড়ালেন। নামাজ শেষে। কথা বলেলন, রোজা সম্পর্কে। খুব দামি দামি। বললেন, ‘আল্লাহ্ বলেছেন, রোজা আমার জন্য। আর এর প্রতিদান আমি নিজেই।’

নিজের অজান্তেই হৃদয়ের গহীন থেকে বেরিয়ে এলো, সুবহানাল্লাহ!! এতো উত্তম প্রতিদান!! মসজিদ থেকে ফিরলাম। আম্মু বললেন, ‘দুপুরে একটু বিশ্রাম কর। আছরের আগে উঠবে। তোমার আব্বুর সাথে নামাজ পড়তে যাবে।’

পাঁচ.
আছরের সময় হলো। আব্বুর সাথে মসজিদে গেলাম। আছর নামাজ আদায় করলাম। ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত অবস্থায়। আব্বুর হাত ধরে বাজারে গেলাম। ফলমূল আরো অনেক কিছু কিনলাম। বাসায় আসলাম। দেখলাম, আম্মু রকমারি ইফতারের, বাহারি আয়োজন করছেন। খুব ইচ্ছে করছিল, একটু খাই। কিন্তু, নাহ! আমি প্রতিদান হিসেবে আল্লাহকে পেতে চাই।

ছয়.
ইফতারির সময় ছুঁই ছুঁই। আমার আর তর সইছে। ইশ! কখন যে মুয়াজ্জিন সাহেব আজান দেবেন?!
আব্বু বললেন, ‘আসো! দু ‘আ করি। এ সময় রোজাদারের দু ‘আ ফেরানো হয় না।’
দু ‘আ করলাম। মন প্রাণ ভরে। আমার জন্য। আমাদের জন্য। সবার জন্য।
মসজিদের মিনার থেকে ভেসে এলো আজানের ধ্বনি। সুমধুর। পূতঃ পবিত্র। আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!!..
আব্বু বললেন,
– দু ‘আ পড়ে, খাওয়া শুরু কর।
– আব্বু! কী দু ‘আ?
– এভাবে বল, হে আল্লাহ্! আমি আপনার জন্যই রোজা রেখেছি। আর আপনার দেয়া রিজিক থেকেই ইফতার করছি।
দু ‘আ পড়লাম। আব্বু বললেন, ‘প্রথমে খেজুর খাও। তারপর পানি পান কর। এটা হলো, আমাদের প্রিয় নবীর, প্রিয় সুন্নাত।’
আহ! ইফতার কী মজা! কত্তো স্বাদু!! আমার শিরা-উপশিরা সতেজ হয়ে উঠলো।

আল্লাহর কী অপার মহিমা! অফুরন্ত তাঁর নেয়ামত! কত বরকতপূর্ণ ইফতার আর সেহরি! কত মহামাণ্বিত এ মাস!

ওই দিনের মত এত সুস্বাদু খাবার, আমি আর কোনোদিনও খাইনি!
ওই দিনের মত এতো সুন্দর আর পবিত্র দিন, আমার জীবনে আর কখনো আসেনি।

আরও পড়ুন : অন্যকেউ কাজা রোজা আদায় করতে পারবে?

সর্বশেষ সব সংবাদ