200644

মহানবি সা. গির্জার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করেছিলেন!

মুসা আল হাফিজ
লেখক, কলামিষ্ট

রহমতের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমীপে নিরাপত্তা চেয়েছিলেন গির্জার প্রতিনিধি। তিনি দিয়েছিলেন নিরাপত্তানামা। ৬২৮ সালের সেই নিরাপত্তানামা এখনো সুরক্ষিত আছে মিসরের সেন্ট ক্যাথরিন গির্জায়। এ গির্জার প্রতিনিধি মদীনা থেকে রহমতের নবীর নিরাপত্তাপত্র নিয়ে আসেন, যাতে রয়েছে ইসলামের সহনশীলতা এবং ভিন্নধর্মী শান্তিকামী নাগরিকদের প্রতি ইসলামী রাষ্ট্রের কল্যাণী নীতির নির্দেশনা।

খালিজ টাইমস সেই অঙ্গীকারপত্রকে সামনে এনে ইসলামের সংখ্যালঘু নিরাপত্তানীতিকে স্পষ্ট করতে চেয়েছে। (ঐতিহাসিক আল্লামা মাকরেজির (ওফাত: ৮৪৫ হি.) তারিখুল আকবাত বা আলকাউলুল ইবরিজি ছাড়া প্রাচীন কোনো গ্রন্থে এ অঙ্গীকার পত্রের বিবরণ পাইনি। অনেকেই বলেছেন এটি বানানো, দায়েশের মোকাবেলার জন্য এটি বানানো হয়েছে। অনেকেই প্রমাণ করেছেন, বহু শতাব্দী ধরে এ অঙ্গীকারনামা মুসলিম সালতানাতে সুরক্ষিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে উসমানী সুলতানগণ এর ভিত্তিতে অমুসলিম নাগরিকদের সাথে আচরণ করতেন।

সুলতান প্রথম সেলিম ১৫১৭ সনে মিসর বিজয় করে ক্যাথরিন গির্জা থেকে এই অঙ্গীকারনামার অনুলিপি নিজের কাছে নিয়ে যান। তুর্কি ভাষায় এর অনুবাদ করান। রাজকীয় এক দরোজার সামনে একে ঝুলিয়ে রাখেন। উদ্দেশ্য ছিলো বরকত হাসিল করা। এর মূলকপি থেকে যায় গির্জায়।

অঙ্গীকারপত্রের নিচে লেখা আছে, মসজিদে নববীতে আলী রা. স্বহস্তে এটি লিখেন। এই অঙ্গীকারপত্রের সাক্ষী হিসেবে আছেন নবীয়ে করিম সা. এর বিভিন্ন সাহাবা। যাদের মধ্যে আছেন আবু বকর রা., ওসমান রা., আলী রা., আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব রা., যুবাইর বিন আওয়াম রা.।

মিসরের সিনাই এর এদারাতুল বুহুস ওয়ান নাশর এর প্রধান এবং প্রত্নতত্ত্ব বিশারদ ড. আবদুর রহিম রায়হান বলেন, সেন্ট ক্যাথরিনের পাদ্রীরা এই অঙ্গীকারনামাটি সংরক্ষণ করে আসছেন আল্লাহর রাসূলের সা. অঙ্গীকারপত্র বলেই। হাজার বছরের প্রাচীন হরিণের চামড়ায় তার এক অংশ সংরক্ষিত। পুরনো কাগজেও তা অনুলিখিত। বিভিন্ন অনুলিখনের মধ্যে মিলের অভাব আছে, আছে কিছু ভুলও। অনুলিখকদের ভুলগুলোর একটির সাথে আরেকটির কোনো মিল নেই। এর ভাষারীতি নিয়েও প্রশ্ন ও বিতর্ক আছে।

তবে এর প্রাচীনতম কপি আছে তিনটি। প্রথম কপিটি ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় সোলায়মানের মাধ্যমে সুরক্ষিত হয়। যার সময়কাল ছিলো ১৫২০-১৫৬৬ খ্রি.। দ্বিতীয় কপিটিও প্রাচীন। কিন্তু এর সময়কাল জানা যায় না। তৃতীয় কপিটি অনুলিখনের সময়কাল সম্ভবত ১৫৬১ খ্রি.।

চুক্তিপত্রে রয়েছে একটি সিল মোহর। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই দাবি করেন, এটি নবীয়ে করিম সা. এর সিল মোহরের সাথে হুবহু মিলে যায়। এ ভিত্তিতে এর নির্ভরযোগ্যতার যুক্তি পেশ করেন তারা।

সেন্ট ক্যাথরিনের সংরক্ষণাগারে আছে ২০০ সন্ধিচুক্তিপত্র, যা প্রেরণ করেন বিভিন্ন মুসলিম খলিফা। এগুলোর মধ্যে আছে ১৬১৮ সালে প্রেরিত সুলতান মোস্তফা প্রথম এর ফরমান। এ ফরমানে সুলতান লিখেন, পবিত্র সেই অঙ্গীকারপত্রের কারণে সুলতান মোস্তফা বিন মুহাম্মদ এর ফরমান। এতে এখানকার অমুসলিম নাগরিকদের সুরক্ষার ওয়াদা করা হয় এবং বলা হয় তা করা হবে, সেই পবিত্র অঙ্গীকারের ভিত্তিতে।


মহানবি সা. এর পত্রসঙ্কলন আল ওয়াসায়িকুস সিয়াসিয়্যাহ এর ৫৫৪ পৃষ্ঠায় মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ হায়দারাবাদী রহ. এই অঙ্গীকারনামার আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন এর তিন অনুলিপির। তিনি উদ্বৃতি দেন রওজাতুল মাআরিফ এর। এবং উল্লেখ করেন চতুর্থ আরেকটি কপির কথা। যে কপিটির সম্পর্কে খ্রিস্টানদের দাবি, আর্চ বিশপ জিব্রিল এর কাছে প্রিয় নবি সা. তা দান করেন।

সুরইয়ানী ও কিবতী খ্রিস্টানদের আনুগত্য সাপেক্ষে নিরাপত্তার জন্য। এ পত্র অনুলিখিত হয়েছে কুফি লিপিতে। একে সম্বন্ধিত করা হয় হজরত মুয়াবিয়া রা. এর দিকে। এটি সুরক্ষিত আছে তুরস্কের মারদিনে।

শায়খ হামিদুল্লাহ লিখেন, তুরস্কের আরযেরুম ইউনিভার্সিটিতে রয়েছে এর একটি কপি। যাতে মুল্লা চেলেবি নামে বিখ্যাত কাজী আলেম মুহাম্মদ বিন আলী রহ. এবং রুহা নগরীর কাজী নকী ফজলী যাদাহ এর শাহাদাহ রয়েছে। দুই কাজী এতে লিখেন, অঙ্গীকারপত্রের প্রাচীন পত্রে যা আছে, তার অনুকরণেই এটি লিখিত শরীয়তের মূল উতসের সাথে আছে এর সামঞ্জস্য। এর প্রামাণ্যতায় কোনো ত্রুটি নেই। এর বিষয় ও অর্থের মধ্যে কোনো বিচ্যুতি নেই।

আলোচিত এই অঙ্গীকারপত্রে দাবি করা হয় যে, প্রিয় নবীর পক্ষ থেকে আলী রা. লিখেন-
‘এ এক বার্তা; মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে। এ বার্তা সে সব খ্রিস্টানের প্রতি, যারা চুক্তিতে অংশীদার। তারা কাছে থাকুক বা দূরে, পূর্বে থাকুক বা পশ্চিমে, আরবে থাকুক বা অনারবে, চেনা হোক বা অচেনা, আমরা তাদের সঙ্গে আছি। প্রকৃতপক্ষে তাদের সুরক্ষা দিয়ে যাবো আমি, আল্লাহর বান্দারা, সাহায্যকারীরা ও আমার অনুসারীরা। কারণ এ খ্রিস্টানরা আমার নাগরিক।

আল্লাহর শপথ! আমি এমন সব তৎপরতার বিরুদ্ধে, যা তারা অপছন্দ করে। তাদের ওপর বিশেষ কোনো বিধি-নিষেধ থাকবে না। তাদের বিচারকদের চাকরিচ্যুত করা হবে না এবং তাদের সন্ন্যাসীদের তাড়ানো হবে না গির্জা থেকে।

তাদের ধর্মীয় স্থাপনা কেউ ধ্বংস করবে না, ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। কিংবা সেখান থেকে কোনো কিছু ছিনিয়ে আনবে না মুসলিমদের জন্য। যে এমনটি করবে, সে আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে এবং তার নবীর অবাধ্য হবে। নিশ্চয়ই তারা আমার মিত্র এবং তারা যেসব বিষয়ের সম্মুখিন হওয়াকে ঘৃণা করে, আমি তা থেকে তাদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিচ্ছি । কেউ তাদের ভ্রমণে বা যুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধ্য করবে না; বরং মুসলিমরা তাদের জন্য যুদ্ধ করবে। কোনো খ্রিস্টান নারীর অনুমতি ছাড়া কোনো মুসলিম তাকে বিয়ে করতে পারবে না। (বিয়ের পর) প্রার্থনার জন্য তাকে চার্চে যেতে বাঁধা দেওয়া যাবে না। খ্রিস্টানদের চার্চের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে। কেউ চার্চ সংস্কার বা তার পবিত্রতা রক্ষায় বাঁধা দেবে না। পৃথিবী যতদিন টিকে থাকবে, কোনো মুসলিম এই অঙ্গীকারনামার অবাধ্য হবে না।’

জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদটা কোথায়? সংখ্যালঘুদের জন্য এর চেয়ে উত্তম কোনো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তো সেখানে নেই!

এমডব্লিউ/

আপনার বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন- 01640523566