193353

‘প্রিয় উস্তাদ, মুহাদ্দিসে কাবির, হযরত নোমান আহমদ রহ.: কিছু স্মৃতি, কিছু কথা’

মাওলানা মামুনুল হক।।
শাইখুল হাদিস, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া ঢাকা।

১৯৮৮সালের কথা৷ আমরা হযরত শায়খুল হাদীস রহঃ এর নেতৃত্বে জামিয়া রাহমানিয়ার স্থায়ী নিজস্ব ভূমির সন্ধানে মোহাম্মদী হাউজিং থেকে সাত মসজিদ এলাকায় স্থানান্তর হই৷ ঐতিহাসিক সাত মসজিদ লাগোয়া জমিটি জামিয়ার জন্য কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়৷ আর অস্থায়ীভাবে নূর হোসেন সাহেবের নির্মাণাধীন বিল্ডিং এবং সাত মসজিদ সংলগ্ন টিনসেড ঘর তৈরি করে মাদরাসার কার্যক্রম চালানো হয়৷

ঐ সময়ে আমরা নাহবেমীর জামাতে পড়ি৷ টিনসেডের ঘরে বেড়ার পার্টিশন দিয়ে একেক জামাতের জন্য আলাদা আলাদা ঘর তৈরি করা হয়৷ আমাদের বেড়ার অপর প্রান্তেই ছিল জালালাইন জামাতের অবস্থান৷ জামিয়ার জন্য তখন নতুন শিক্ষকের প্রয়োজন৷ রাহমানিয়া মাদরাসায় তখন শিক্ষক রাখার পদ্ধতি ছিল প্রাথমিক তথ্য যাচাই ও মৌখিক ইন্টারভিউয়ের পর মূল পর্ব হলো পরীক্ষামূলক সবক পড়ানো৷ আমরা নিচের জামাতের ছাত্র হিসাবে তত কিছু বুঝতাম না৷

শুধু শুনলাম দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে ফারেগ অনেক যোগ্য একজন নতুন শিক্ষক নিয়োগের আলোচনা চলছে ৷ তার সবক জালালাইনে৷ আমরা নাহবেমীর জামাতের ছাত্ররা তত কিছু না বুঝলেও জালালাইনের সেই সবকের আওয়াজ স্পষ্ট শুনতাম৷ আর চমৎকার উপস্থাপনার ভঙ্গি তন্ময় হয়ে উপভোগ করতাম৷ কখনো কখনো এমন সাধও মনে জাগতো, আহা যদি এই উস্তাদের কাছে আমাদের দরস হতো!

কিন্তু আমাদের নিচের জামাতে এত বড় উস্তাদের সবক হবে না মনে করে হতাশ হতা ৷ আর অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকতাম, আমরা যখন উপরের জামাতে উঠব তখন হুজুরের কাছে পড়ব৷

এভাবেই হযরত নোমান সাহেব হুজুরের প্রতি ভিন্ন এক ভালো লাগার অনুভূতি মনে স্থান করে নিয়েছিল৷ হুজুরের পড়ানোর স্টাইল ভালো লাগত তখন থেকেই৷ এরপর তো এক সময় হুজুরের কাছে পড়ার স্বপ্ন পুরন হলো৷ নূরুল আনোয়ার, সুল্লামুল উলূম, শরহে আকাইদ আর সর্বশেষে তিরমিযী শরীফ ২য় খণ্ডের সবক পড়ার সৌভাগ্য হাসিল হলো আলহামদুলিল্লাহ৷

হুজুর লেখালেখি করতেন৷ নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে নতুন প্রজন্মের যে সকল আলেম লেখালেখির জন্য কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন, নোমান সাহেব ছিলেন তাদের অন্যতম৷ বাংলা ইসলামী সাহিত্যের কিংবদন্তি মাওলানা মহিউদ্দিন খান সাহেব এই নবীন প্রজন্মকে লেখালেখির পথ দেখাতেন৷ শিখিয়ে দিতেন লেখালেখির কৌশল৷ নোমান সাহেব ছিলেন সেই কাফেলার এক উজ্বল নক্ষত্র৷ বাংলা ভাষায় ইলমে দ্বীনের খেদমত করার অদম্য স্পৃহা নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন এ পথে৷

হুজুর আমাদেরকে স্বপ্নের কথা শোনাতেন, ওলামায়ে কেরাম যেন বাংলা লেখালেখিতে এমন এগিয়ে আসে যে, বাংলা কোনো বইয়ে হাত দিলেই যেন কোনো আলেমের লিখিত বই হাতে উঠে আসে৷ কোনো ছাত্র লিখতে চেষ্টা করলে হুজুর খুব উৎসাহ দিতেন৷ সহযোগিতা করতেন৷ নিজেও প্রচুর লিখতেন৷

এমন একটা সময় ছিল যে, মাদরাসার কোনো ছুটি মানেই নোমান সাহেব হুজুরের নতুন কোনো বই প্রকাশ হওয়া৷ একটা পর্যায়ে এসে হুজুর মাদরাসার পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত কিতাব সমূহের ব্যখ্যাগ্রন্থ রচনা ও অনুবাদের কাজে হাত দেন৷ এই কাজে হুজুরের পারঙ্গমতা এতটাই বেশি ছিল যা এক কথায় বিস্ময়কর৷ আশ্চর্য দ্রুততার সাথে বিশেষত অনুবাদের কাজ করেছেন হুজুর৷ হুজুরের দক্ষতা এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে, উর্দূ-আরবী কিতাব হাতে নিয়ে অনর্গল অনুবাদ বলে যেতেন আর দ্রুতগতির কম্পোজার তা কম্পোজ করে দিত৷

ব্যস এরপর শুধু প্রুফ চেক করে দিলেই পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে ছাপার উপযুক্ত হয়ে যেত৷ হুজুর দাওরা হাদীসের ছয় কিতাবেরও ব্যখ্যার কাজ করেছেন৷ এত দ্রুত এই কাজগুলো করেছেন, দেখে মনে হত হুজুরের কোনো তাড়া আছে৷ আসলেই তো তাড়া ছিল মালিকের দরবারে চলে যাওয়ার! কিন্তু আমরা তখন বুঝতে পারিনি৷

সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙ্গে হুজুরের চলার গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে গিয়েছিল৷ অন্যথায় বেশ দ্রুতগতিতে চলতে অভ্যস্ত ছিলেন হুজুর ৷ হুজুরের সেই চলার ভঙ্গিমাও ছিল চমৎকার৷ আজও চোখে ভাসে, সাত মসজিদের পাশ দিয়ে বিদ্যুৎবেগে ছুটে চলছেন তিনি৷ হয়তো যাচ্ছেন কোথায় কিংবা ফিরছেন কোনো জরুরি কাজ সেরে৷

আরবী সাহিত্যে উচ্চাঙ্গের দক্ষ ছিলেন হুজুর৷ আমাদের জামিয়ায় কোনো বড় আলেম মেহমান বিদেশ থেকে তাশরীফ আনলে হুজুর তার জন্য মানপত্র রচনা করতেন৷ দেওবন্দের শাইখুল হাদীস হযরত সাঈদ আহমদ পালনপুরীর শুভাগমনে হুজুর যে মানপত্র উপস্থাপন করেছিলেন তার শব্দমালা এখনও যেন আমার কানে গুঞ্জরিত হয়৷

আব্বাজান হযরত শায়খুল হাদীস রহঃও হুজুরকে খুব ভালোবাসতেন৷ অনেক সময় নিজে কোনো মাহফিলে যেতে না পারলে স্থলাভিষিক্ত হিসাবে নোমান সাহেব হুজুরকে পাঠিয়ে দিতেন৷ হুজুরের আলোচনার ভঙ্গিও ছিল ব্যতিক্রম ও আকর্ষনীয়৷

বহুগুণের অধিকারী আমার প্রিয় উস্তাদে মুহতারাম হযরত নোমান সাহেব মাত্র ত্রিশ বছরের মত সময়ে এত অবদান রেখে গেছেন যা বিস্ময়কর৷ অবশেষে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন ৷ তখনও তিনি আপন গতিতে চালিয়ে গেছেন কাজ৷ একাধিক মাদরাসায় সিনিয়র মুহাদ্দিস বা শায়খুল হাদীস হিসাবে দরস দানের পাশাপাশি লিখে গেছেন বহু দরসী ও গায়রে দরসী গ্রন্থ৷

জীবনের শেষ সময়গুলো কেটেছে অসুস্থতার মাঝে৷ দীর্ঘ দীর্ঘ সময় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে থেকেছেন৷ জীবন সায়াহ্নে স্মৃতিও অনেকটা বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল৷ আমি ১৪ই অক্টোবর হজ্বসফর থেকে ফিরে দেখতে গিয়েছিলাম হুজুরকে৷ দুচারটি অপরিচিতের মত কথা হয়েছিল তখন৷ সেটাই ছিল হুজুরের সাথে আমার আখেরী সাক্ষাত৷

আজ আমি যখন মাহফিলের উদ্দেশ্যে ময়মনসিংহের পথে রওয়ানা হয়ে অনেক দূর পথ চলে এসেছি, মোবাইল ফোনে পেলাম হুজুরের মৃত্যুর শোকসংবাদ৷ রাত সাড়ে দশটায় সাত মসজিদে জানাযার এন্তেজাম, সেটাও জানলাম৷ কিন্তু এতদূর থেকে মাহফিল শেষ করে ফেরাও সম্ভব হলো না৷ অগত্যা ভগ্নহৃদয়ে মুক্তাগাছার মাহফিলে উপস্থিত শত শত ইসলামপ্রিয় আলেমদের মুহিব্বীন মানুষদেরকে নিয়ে সূরা ফাতেহা আর সূরা এখলাস তেলাওয়াত করে হাদিয়া পৌঁছে দিলাম৷ দোয়াও করলাম হুজুরের মাগফিরাত ও দরজাবুলন্দীর জন্য৷ কবূল কর মালিক ইয়া আরহামাররাহিমীন৷ আমীন৷

-এটি

ad