193001

‘করোনার অবসরে কওমি শিক্ষার্থীরা দাওয়াতি মেহনতে সময় দিন’

বেলায়েত হুসাইন ।।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী মহামারি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে দীর্ঘ তিন মাসের বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে সরকার। কবে নাগাদ এই মহামারি থেকে পরিত্রাণ মিলবে তার সঠিক কোন সমাধান কেউ দিতে পারছেনা। ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীদের অনাকাঙ্ক্ষিত অবসর আরও প্রলম্বিত হচ্ছে। অবসরে পৃথিবীর আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি যেমন হচ্ছে- এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক ক্ষতিরও আশংকা তৈরি হয়েছে। কেননা, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা।

এসব দিক লক্ষ্য রেখে দেশের বিশিষ্ট তিন শিক্ষাবিদ আলেম করোনার অবসরে শিক্ষার্থীদের দাওয়াতি মিশনে কাজের পরামর্শ দিয়েছেন। অবসর যেন অনর্থক না হয় এবং সময়টিতে যেন প্রতিটি শিক্ষার্থী আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি করতে পারে, একইসঙ্গে তাদের মাধ্যমে সমাজের মানুষের ধর্মীয়ক্ষেত্রগুলিতে উন্নতি হয়- সেজন্য তিনজন আলেমই তাদের জন্য দাওয়াতি কাজের আলাদা আলাদা নির্দেশনা ব্যক্ত করেছেন। তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত নিয়েই আজকের আয়োজন।

সুযোগ অনুপাতে সবসময়ই আমাদের দাওয়াতিকাজে সময় দেয়া উচিত: মাওলানা সালমান

রাজধানীর মিরপুরস্থ দারুর রাশাদ মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সালমান করোনার অবসরে শিক্ষার্থীদের দাওয়াতিকাজে মনোযোগী হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেছেন, চলমান মহামারিতে জীবনযাপন সীমিত হয়ে গেলেও আমাদের সবকিছুই চলছে, তো এই পরিস্থিতিতেও আমাদের দাওয়াতিকাজ গুরুত্বের সঙ্গে করা উচিত বলে আমি মনে করি। সেক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধ মেনে স্বল্প পরিসরে সুযোগ অনুপাতে দাওয়াতের কাজে শিক্ষার্থীরা অংশ নিতে পারে। একেবারে বসে না থেকে সীমিত আকারে হলেও দাওয়াতিকাজে মনোযোগী হলে- এটা শিক্ষার্থীদের জন্য দারুণ ফলদায়ক হবে বলে আমি আশা করছি।

তবে এই করোনার উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দাওয়াতিকাজে বিশেষ হিকমত অবলম্বনের প্রতি তাকিদ দিয়েছেন মাওলানা সালমান। যে এলাকায় দাওয়াতের যে পদ্ধতি চালু আছে সেটার অনুসরণ করে কাজ করার আহবান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট এই আলেমেদীন।

তিনি বলেন, করোনায় মাদরাসা বন্ধ থাকার সময়ে যদি দাওয়াতিকাজ সহ দীনের মৌলিক কাজসমূহ অব্যাহতভাবে বন্ধ থাকে তাহলে আমরা নিঃশেষ হয়ে যাবো- এজন্য সব তালিবুল ইলমের প্রতি আমার প্রত্যাশা সবাই আল্লাহর নিকট বেশি বেশি দোয়া করো যেন তিনি চলমান সঙ্কটময় পরিস্থিতি থেকে আমাদের মুক্তি দেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ফিরিয়ে দিয়ে একটি প্রাণবন্ত পৃথিবী উপহার দেন। আল্লাহ কবুল করেন। আমিন

দাওয়াতের জন্যও শিক্ষার্থীদের তাজা পড়াশোনা করার আহবান মুফতি মানসুর আহমাদের

রাজধানীর স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান বাইতুস সালাম মাদরাসা-উত্তরার শিক্ষাসচিব ও সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি মানসুর আহমাদ করোনার অবসরে শিক্ষার্থীদের দাওয়াতিকাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন, দাওয়াত ও তা’লীমের জন্যও তাদের তাজা পড়াশোনা করতে হবে। কেননা, প্রাপ্তবয়স্ক যে কোন মুমিনের কর্তব্য হচ্ছে নিজের ঈমান-আমলের প্রতি যত্নবান থাকার পাশাপাশি অন্যদের ঈমান-আমলের ফিকির করা। যেমনটি সূরা আসরে বলা হয়েছে। আর যাদেরকে আল্লাহ তাআলা অল্প-বিস্তর কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান দান করেছেন তাঁদের দায়িত্ব এক্ষেত্রে আরো বেড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম ইরশাদ করেন-
بلغوا عني ولو آية
-আমার পক্ষ থেকে পৌঁছিয়ে দাও, যদি একটি আয়াতও হয়। সহিহ বুখারি: ৩৪৬১

দ্বীনি দাওয়াতের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিজ পরিবার ও সমাজের লোকদের দিয়ে শুরু করা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর প্রকাশ্য দাওয়াতের ব্যাপারে যে আয়াতটি নাযিল হয়েছিল তা হচ্ছে এই-
وأنذر عشيرتك الأقربين -এবং আপনি আপনার নিজ খান্দানকে সতর্ক করুন। সূরা শুআরা:

মাদরাসা শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা ও সময়-সুযোগ অনুপাতে তাদের উপর কিছু দায়িত্ব বর্তায়। নিজ পরিবার ও সমাজের লোকদের ঈমান-আমলের ব্যপারে কিছু ফিকির করা তাদের কর্তব্য। বাসা-বাড়ীতে অবস্থানকালে তাদের হাতে এ সুযোগটা আসে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এ সুযোগটিকে দীর্ঘায়িত করছে। এটিকে ঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারলে ভালো ফল বয়ে আনবে। এ লক্ষ্যে নিজ পরিবার ও সমাজে যে কাজগুলো করা যেতে পারে-

এক, ঈমানের কালিমা যাদের অশুদ্ধ তাদেরকে তা শুদ্ধ করে শিখিয়ে দেয়া। দুই, ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদেরকে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়া।

তিন, ঈমানের জরুরি গুণগুলো নিয়ে আলোচনা করা ও আয়ত্ত করিয়ে দেয়া। যেমন- ইখলাস, সবর, শোকর, তাওয়াক্কুল ইত্যাদি। এ বিষয়ে রিয়াযুস সালিহীন নামক কিতাবটির শুরু অংশের সহায়তা নেয়া যেতে পারে। হযরত থানভী রহ. এর তা’লীমুদ্দীন নামের কিতাবটির শেষ দিকে সারগর্ভ আলোচনা আছে।

চার, পবিত্রতা বিষয়ক মৌলিক মাসআলাগুলো তাদেরকে শেখানো। বর্তমানে এমন মানুষের সংখ্যা কম নয় যারা জরুরি মাসআলাগুলো জানে না আবার লজ্জায় কারো কাছে জিজ্ঞাসাও করে না।

পাঁচ, নামাযের জরুরি মাসায়েল আলোচনা করা। এ ক্ষেত্রেও সমাজে অনেক অজ্ঞতা আছে। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে। অনেক মহিলা আছেন যারা সাধারণ পোশাকে নামায পড়েন। নামাযে শরীরের কতটুকু ঢাকতে হয় তা জানেনই না। এমন মহিলাও আছেন যারা কোন রকম ওযর ছাড়াই সব নামায বসে পড়েন।
তালিবুল ইলম ভায়েরা মাসায়েলের জন্য নিজেদের পঠিত সহজ কোন ফিকহের কিতাবের সহায়তা নিতে পারেন।

ছয়,কুরআন মাজিদ সহিহ করে পড়ানোর মেহনত করা। যারা সহিহ তিলাওয়াত করতে পারে না তারা অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয়। অন্ততঃ কয়েকটি সূরা যেন সহিহ করে সবাই পড়তে পারে সে ফিকির করা। সাত,নামাযের ভিতরে যেসব দুআ-যিকির আছে সেগুলো সহিহ করে শেখানো।

আট, ঈমানদারের জন্য ইসলামে নিষিদ্ধ বিষয়গুলো সম্পর্কেও মৌলিক ধারণা থাকা জরুরি। এগুলোও গুরুত্বের সাথে আলোচনায় আসা দরকার। রিয়াযুস সালিহীনের শেষ দিকে এ সম্পর্কিত দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে। তা’লীমুদ্দীনেও সুন্দর আলোচনা আছে।

নয়, নামাযের পর, সকাল-সন্ধায় ও দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে মাসনুন দুআ ও যিকির আছে। যেগুলোর ব্যাপারে আমরা অনেকেই উদাসীন। অথচ এগুলো বেশ বরকতপূর্ণ; নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। এই মাসনুন দুআ ও যিকিরগুলো শেখা ও শেখানো দরকার।

দশ, প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগের যে মেহনত ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে মহল্লায় চালু আছে তাতেও অংশগ্রহণ করতে হবে। এতে সবকিছুতে একটা পূর্ণতা আসবে।

স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় রেখে উপরে উল্লেখিত কাজগুলোর যতটুকু সম্ভব আমরা করতে পারি। সবশেষে বলবো দাওয়াত ও তা’লীমের জন্যও তাজা পড়াশোনা করতে হবে। যেন যখন যতটুকু বলি তা নিশ্চিত জানা থেকেই বলি। আল্লাহ তাআলা তাওফিক দান করুন। আমীন।

আলেমদের জীবনটাই দাওয়াত-নির্ভর, সর্বাবস্থায় দাওয়াতী মেহনতের বিকল্প নেই: মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমি

রাজধানীর মিরপুরস্থ উচ্চতর ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দিরাসাহ্ আল ইসলামিয়্যাহ্-ঢাকা এর পরিচালক ও দেওবন্দের শাইখুল হাদিস আল্লামা কমরুদ্দিন আহমাদ গৌরখপুরীর বিশিষ্ট খলিফা মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমি বলেছেন, আলেমদের জীবনটাই দাওয়াত-নির্ভর, সর্বাবস্থায় দাওয়াতী মেহনতের বিকল্প নেই। আজকের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের বড় বড় আলেম- এজন্য পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে করোনার অবসর দাওয়াতি কাজের জন্য শিক্ষার্থীদের দারুণ সুযোগ। বাড়িতে অবসর কাটানো প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন এই সুযোগ কাজে লাগায় আমি এই আহবান করবো।

করোনার সময়ে দাওয়াতের পদ্ধতিটি কেমন হবে জানতে চাইলে তরুণ প্রতিভাবান এই আলেম বলেন, কাসেম নানুতুবীর রূহানি সন্তান আর ইলয়াস রহ. এর আদর্শ শিষ্যদের প্রত্যেকেরই সকাল-সন্ধ্যা, গতি-স্থিতি, চলাফেরা, আসা-যাওয়া,আগমন প্রস্থান,কথাবার্তা ইত্যাদি স্বাভাবিক জীবনটাই যেন অন্যদের কাছে ঈর্ষনীয় আকর্ষনীয় আর অনুস্মরণীয় হয়। এটা হবে সবচেয়ে বড় দাওয়াত এবং অব্যর্থ দাওয়াত।

চরিত্র-মাধুর্য দিয়ে মানুষকে দীনমুখী করাকেই সবচেয়ে উপকারী দাওয়াতিকাজ মনে করেন মুফতি মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমি। এছাড়া, বাস্তবিক ময়দানে দাওয়াতিকাজের জন্য শিক্ষার্থীদের কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, প্রথমত প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন দীনের বুনিয়াদি তা’লীম তথা একান্ত মৌলিক বিষয়াদি যেমন পবিত্রতা, নামায, রোযা,কাফন-দাফন, মাইয়্যেত, জানাযা, ঈদ, কুরবানি, বিবাহ-শাদি, আচার,অনুষ্ঠান, পরিবার ও গার্হস্থজীবন, দোকানদারি, ব্যবসা-বানিজ্য, জায়েজ নাজায়েজ, হালাল হারাম ইত্যকার জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়াবলী মানুষকে হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়ার কার্যকর চেষ্টা করে।

এক্ষেত্রে মুহিউসসুন্নাহ হযরহ শাহ্ আবরারুল হক হারদুঈ রহ. এর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত মজলিসে দাওয়াতুল হক প্রণীত পুস্তকাদিকে সামনে রেখে তার কারিকুলামও অনুসরণ করা যেতে পারে।

দুই, এলাকাভিত্তিক দাওয়াত ও তাবলীগের চলমান মেহনতকে আরো গতিশীল ও বেগবান করার ফিকির করা। পুরনো সাথীদের মাঝে তাবলীগের পাশাপাশি তা’লীমে দ্বীনের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা।

তিন, একেবারে কমবয়সী ছেলেদের থেকে অবিবাহিত পর্যন্ত এলাকার সকল ছেলেদের ‘দীনি যেহেন ছাযি’ তথা রিলেজনাল মোটিভেশন বা ধর্মীয় মানুষিকতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা।

চার: উপমহাদেশীয় মুসলমানদের নতুন প্রজন্মের ধর্মবান্ধবতা নষ্ট হওয়ার পিছনে মৌলিকভাবে ভূমিকা রাখছে আধুনিক কিন্ডারগার্টেন, প্রেপ স্কুল ইত্যাদি। সুতরাং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সকালের মক্তবের নেযাম পুনরায় চালু করার চেষ্টা করা।

পাঁচ, তাসাউফ-তাযকিয়াও দাওয়াতের একটি অংশ এবং আকাবির আসলাফের রেখে যাওয়া আমানত। পরিবেশ অনুকূল থাকলে এবং যথোপযুক্ত কাজের মানুষ থাকলে এদিকেও কিছু কাজ করা।

ছয়, স্থানীয় দায়িত্বশীল উলামায়ে কেরামের নিগরানি ও রাহনুমায়ীতে মাহরাম মহিলা মাদরাসার ছাত্রিদের সহযোগিতায় মহিলাদের মাঝে দাওয়াত,তা’লীম এবং তাযকিয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা।

সাত, কোন এলাকায় অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি কার্যক্রমের পথ ও পদ্ধতির উপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউকে পাওয়া গেলে সেখানের সকল ছাত্রদেরকে শেখানোর ব্যবস্থা করা। স্কুল কলেজের ছাত্ররাও শিখতে পারে।

উপরোক্ত কাজগুলি করতে পারলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর উভয় জগতের জীবনই রঙিন হয়ে ওঠবে ইনশাআল্লাহ!

-এটি

ad