192207

অনন্য বৈশিষ্ট্যে শাওয়াল মাস

মুহাম্মদ আল আমিন।।

হিজরী সনের বারো মাসের প্রতিটি মাসই নানা বিচারে গুরুত্ত্বপূর্ণ ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। মহান আল্লাহ প্রতিটি মাসকেই অন্য মাসের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। প্রতিটি মাসেরই ব্যতিক্রমী কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যে বৈশিষ্ট্যের কারণে তা অন্য মাসগুলোর তুলনায় অনন্য।

শাওয়াল মাস হিজরি সনের দশম মাস। আরবীতে বলা হয় ‘আশ শাউওয়াল আল মুকাররম’, অর্থাৎ সম্মানিত শাওয়াল মাস। রমজান পরবর্তী এ মাসটি বিভিন্ন দিক বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট।

এক. ঈদুল ফিতর: শাওয়াল মাস ঈদের মাস। রমজানের শেষে অনাবিল খুশি-আনন্দের আসমানি বার্তা নিয়ে আকাশে হেসে ওঠে শাওয়ালের নতুন চাঁদ। হৃদয়ে হৃদয়ে দোলে পবিত্র খুশির আলোক। এ মাসের প্রথম দিনটি ঈদের দিন। মুসলমানদের প্রধান দু’টি ধর্মীয় উৎসবের একটি তথা পবিত্র ঈদুল ফিতর এ মাসের প্রথম দিনে পালিত হয়। আম্মাজান আয়েশা রাযিঃ থেকে বর্ণিত— নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— প্রতিটি সম্প্রদায়ের আনন্দের দিন রয়েছে, আর এটি (শাওয়ালের প্রথম দিন বা ঈদুল আযহার দিন) আমাদের আনন্দের দিন। ( বুখারী: ৯৫২, মুসলিম : ৮৯২)

দুই. হজ্ব:

শাওয়াল মাস হজ্বের মাসসমূহের প্রথম মাস।শাওয়াল, জিলক্বদ, জিলহজ্ব; এ তিনটি হজ্বের মাস। মহান আল্লাহ বলেন— হজ্ব (এর সময়) নির্ধারিত কয়েকটি মাস। সুরা বাক্বারাহ: ১৯৭)

নির্ধারিত কয়েক মাস’এর ব্যাখ্যায় সকল সাহাবী ও তাবেয়ীগন শাওয়াল, জিলক্বদ ও জিলহজ্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে, জিলহজ্ব মাস পূর্ণটা নাকি প্রথম দশদিন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ( তাবারী, কুরতুবী: সংশ্লিষ্ট আয়াত)

ইমাম ইবনে কাসীর রহ. তার বিখ্যাত তাফসীরেগ্রন্থ ‘তাফসীর ইবনে কাসীর’ এ উল্লেখ করেছেন—’ ইমাম বুখারী রহ. বলেছেন— ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন— (নির্ধারিত কয়েকমাস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো) শাওয়াল, জিলক্বদ ও জিলহজ্বের প্রথম দশদিন। (ইবনে কাসীর: ১/ ৫৫৪) ইবনে আব্বাস, ইমাম শা’বী, ইবরাহীম নাখায়ী রহঃ গনও একথা বলেছেন। এটিই প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত। (তবারী)

অতএব শাওয়ালের প্রথম থেকে নিয়ে জিলহজ্বের দশ তারিখ পর্যন্ত হজ্বের সময়। শাওয়াল মাস হজ্বের সময় হওয়ার অর্থ হলো— কেউ চাইলে শাওয়াল মাস থেকে পবিত্র হজ্বব্রত পালনের উদ্দেশ্যে ইহরাম করতে পারে। ( হিন্দিয়া)

তিন. ছয় রোজা।

পবিত্র শাওয়াল মাসে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ছয়টি নফল রোজা রয়েছে। রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসে ছয়টি নফল রোজা রাখতে উম্মতকে সবিশেষ উৎসাহিত করেছেন। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রাযিঃ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন— রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— যে ব্যক্তি রমজান মাসের রোজাগুলো রাখল অতঃপর শাওয়াল মাসে আরও ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারাবছরই রোজা রাখল। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬৪, আবু দাউদ: ২৪৩৩, তিরমিজি : ৭৫৯)

মূলত হাদিস শরীফে পবিত্র কোরআনেরই একটি আয়াতের বক্তব্য বিবৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন—‘যে কেউ কোনো নেক আমল করবে তাকে তার দশ গুণ সওয়াব প্রদান করা হবে।’ (সুরা আল-আনআম: ১৬০)

সুনানে ইবনে মাজাহ’র এক হাদীসের মূল পাঠেই আয়াতটি বিবৃত হয়েছে। ( ইবনে মাজাহ: ১৭১৬) সুতরাং রমজানের এক মাসের ১০ গুণ হলো দশ মাস আর শাওয়াল মাসের ছয়দিনের দশগুণ হলো ৬০ দিন অর্থাৎ দুইমাস। অতএব যে ব্যক্তি রমজানের ত্রিশ রোজাসহ শাওয়ালের ছয় রোজা রাখবে সে বারো মাস তথা পূর্ণ একটি বছর রোজা রাখার সওয়াব অর্জন করবে।

তাছাড়া দুর্বল মানুষের যে কোনো কর্তব্য পালনে ভুল-ভ্রান্তি থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই পবিত্র রমজানের রোজার মতো শ্রেষ্ঠ একটি ইবাদত পালনেও নানা ধরণের অসঙ্গতি, ভ্রান্তি বা অপূর্ণতার ছাপ রয়ে যেতে পারে। সেই অপূর্ণতা বা ঘাটতির পরিপূরক হিসেবে অপরিমেয় রহমত ও বরকতের ভাণ্ডার নিয়ে হাজির হয় শাওয়ালের ছয় রোজা। রোজাদারের পুণ্য-পাল্লা ভারী করে দেওয়ার ক্ষেত্রে ছয় রোজা বিশ্বস্ত সহযোগীর ভূমিকা পালন করে।

চার. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আয়েশা রাযিঃ এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সবচে’ প্রিয় স্ত্রী আম্মাজান আয়েশা রাযিঃ এর সাথে শাওয়াল মাসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং এ মাসেই তিনি স্বামীর ঘরে আগমন করেন।

হযরত আয়েশা রাযিঃ বলেছেন— রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে শাওয়াল মাসে বিবাহ করেন, শাওয়াল মাসেই আমার সাথে মিলিত হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন স্ত্রী আমার চে’ বেশি সম্ভোগ্য ছিলেন? আয়েশা রাযিঃ তার বংশের মেয়েদের শাওয়াল মাসে বিবাহ দেওয়া ও শাওয়াল মাসে বাসরঘরে পাঠানো কে উত্তম মনে করতেন। (সহীহ মুসলিম : ১৪২৩, তিরমিজি,১০৯৩, নাসায়ী: ৩২৩৬)

প্রাচীন আরবের লোকেরা শাওয়াল মাসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে কুলক্ষণে মনে করত। আয়েশা রাযিঃ উক্ত হাদীসে সে অমূলক ধারণাকে খণ্ডন করেছেন। এখনো কোনো অঞ্চলের লোকেরা শাওয়াল মাসে বিবাহ করাকে কুলক্ষণে মনে করে, যা নিতান্তই অমূলক ও হাদীস পরিপন্থী।

এ হাদীসের ওপর ভিত্তি করে বহু ওলামায়ে কেরাম শাওয়াল মাসে বিবাহ করা ও বাসর করাকে মুস্তাহাব বলেছেন। ( শরহে নববী, সংশ্লিষ্ট হাদীস) আল্লাহ আমাদের ফযিলতপূর্ণ এ মাসটির যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার তওফিক দান করেন। আমিন।

শিক্ষার্থী, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া।

-এটি

ad