191461

সাহিত্য এবং আমাদের দৌরাত্ম

শাহ উসামা।।

কলম। তিন বর্ণের ছোট একটি শব্দ। কিন্তু এর মূল্য অপরিসীম। এর মর্যাদা অনেক। কলম না থাকলে আমাদের মাঝে রত্নমূল্য জ্ঞানভাণ্ডার এবং ইলিমের অতুলনীয় মহাসম্ভার একত্রিত হতো না।

মূর্খতা, অজ্ঞতা এবং বর্বরতা ছড়িয়ে পড়তো চারিদিকে। কলম আল্লাহর দান। কলম দান করে তিনি আমাদের উপর কতো বড় ইহসান করেছেন, কতো বড় দয়া করেছেন তা কখনো কি আমরা ভেবেছি, কল্পনা করেছি? রাব্বুল আলামিন কলমের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু আজ আমরা কলমকে পরিত্যাগ করেছি। কলমের চর্চা-পরিচর্চাকে বন্ধ করে দিয়েছি।

বর্তমান সময়ে নাস্তিক মুরতাদ এবং আল্লাহর শত্রুরা কলম হাতে তুলে নিয়েছে। তারা নিজেদের মতো করে কলম পরিচালনা করছে । অশালীন ভাষায় বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল বইপুস্তক লিখে সমাজের মধ্যে অশ্লীলতা এবং মানুষের কাছে আধুনিকতার নামে অসভ্যতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফেসবুক টুইটার সহ বিভিন্ন ব্লগে তারা ইসলাম নিয়ে কটুক্তি করছে। রাসুলে পাক মুহাম্মাদে আরাবী সা. নিয়ে বিচিত্র ধরণের অবমাননাকর আর্টিকেল প্রকাশ করছে। পূর্নাঙ্গ ইসলামি জীবন ব্যবস্থার দিকে আঙ্গুল তোলছে। এছাড়া স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির পাঠ্যপুস্তকের পরতে পরতে নাস্তিক্যবাদীতার ছোঁয়া ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সব কিছু করছে তারা এই কলমেরই মাধ্যমে।

এই কলমই ছিল একদিন আমাদের পূর্বপুরুষদের হাতে। আমাদের আকাবীর আসলাফ উলামায়ে কেরামদের হাতে। কী সোনালী যুগ ছিল তখন।

কলমকে তারা ব্যবহার করেছেন সত্যের পক্ষে এবং অসত্যের বিপক্ষে। নিজ মাতৃভাষা এবং কলমের মাধ্যমে মানুষকে দ্বীনের দিকে আহবান করেছেন। সমাজকে আলোর সরুপথ দেখিয়েছেন। পাপের অন্ধকার থেকে বের করেছেন। সত্যের আপোষহীন সৈনিক ছিলেন তারা। বীর বিক্রমে ঝঙ্কার তোলতো তাদের সেই কলম। সর্বদাই কলম যুদ্ধে বাতিলের বিরুদ্ধে তারা বিজয়ী হয়েছেন।

সাম্প্রতিক বাংলা ভাষার অঙ্গনে আমরা এতো অবহেলিত কেন ? কেনো মানুষ আজ তাকায় আমাদের দিকে বাঁকা নজরে? কখনো কি জেনেছি? কিংবা জানার চেষ্টা-প্রচেষ্টা করেছি।

আমরা আজ অবহেলিত কারণ, আমরা কলমকে পরিত্যাগ করেছি। আজ আমরা অবহেলিত কারণ, পরিক্ষা ছাড়া কলম হাতে দু’চার পৃষ্ঠা লেখার মতো সময় হয় না আমাদের। আজ বাংলাভাষার অঙ্গনে আমাদের কাওমিয়ানদের অবস্থা খুবই সূচনীয়। বাংলাভাষা আমাদের মায়ের ভাষা। কিন্তু এই ভাষায় নবিজি (স.) কিংবা সাহাবীদের নিয়ে আমরা ১০ লাইন লিখতে পারি না। লিখলও মান সম্মত লেখা হয় না। ক্ষুদ্র একটি রচনায় বানান ভুলের বন্যা বসে যায় আমাদের।

অপরদিকে আমাদের শত্রুরা কলমকে হাতে তুলে নিয়েছে। আর কুদরতের ফয়সালা এটাই । কলম যার হাতে, শক্তি ও প্রতিপত্তি তার দখলে। ফলশ্রুতি কী দাঁড়ালো । সম্প্রতি দেশ ও সমাজের কাছে আমরা অবহেলা ও অবজ্ঞার পাত্র হয়ে আছি। আমাদের লেখাকে তারা লেখা হিসাবে গণ্য করতে চায় না। একুশে বইমেলায় আজ আমাদের লেখকদের বই ওঠতে দেয়া হয় না। ইসলামি স্টল বসতে দেওয়া হয় না। কেন? কেন এমনটা হলো। কারণ, কলমকে আমরা ছেড়ে দিয়েছি।

সাহিত্যচর্চা বন্ধ করেছি। ইসলামের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কি নেই আমাদের কাঁধে। তবে কেন আমরা বসে আছি কলম ছেড়ে। নাস্তিক্যবাদীরা সমাজে অসভ্যতা ছড়ানোর জন্য কি আল্লাহ কলম দান করেছেন? আমাদের কি আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে না! কী জবাব দেবো তখন?

আমরা অন্যান্য ভাষা শিখব। আরবী, উর্দু শিখব। কিন্তু এর মানে এই না, নিজের মায়ের ভাষায় সাহিত্য সংস্কৃতি দিয়ে পাঁচ সাত লাইন লেখার যোগ্যতা রাখব না। আরবী উর্দু শিখব জ্ঞানার্জনের জন্য। কিন্তু তা বিলাতে হবে বাংলাভাষা দিয়েই।বাংলার মানুষের কাছেই। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক নবি রাসুলকে স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন। যেন তারা নিজের কওমকে স্পষ্ট ভাবে আল্লাহর বাণী শুনাতে পারেন। বুঝাতে পারেন। আবুল হাসান আলী মিয়া নদবী (রাহ্) আমাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন আমাদের মধ্যে একজন ট্যাগুর পয়দা হলো না? কেন আপনারা বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ইমাম না হয়ে মুক্তাদী হবেন? এর কী জবাব আছে আমাদের কাছে?

যুগে যুগে আমাদের পূর্বসূরিগণ যুগের চাহিদা ও দাবী অনুযায়ী তারা বাতিলের সাথে লড়াই করেছেন। বাতিল যখন যে অস্ত্র নিয়েছে, আমাদের পূর্বসূরিরাও তখন সেরকমই অস্ত্র উঠিয়েছেন।
এ যুগে বাতিলের বিরুদ্ধে আমাদের প্রথম ও প্রধান ক্ষেত্র হলো শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। কিন্তু আমরা বাংলাভাষার আলিম সমাজ কি নিজস্ব ভাষাজ্ঞান, সাহিত্যবোধ ও সাংস্কৃতিক যোগ্যতা অর্জন করেছি? কখনো কি সে চিন্তাও করেছি?

হ্যাঁ, ইদানীং কিছু আলেম/ক্বওমীয়ান কলম ধরেছেন। সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন, পুস্তকাকারে প্রকাশও করছেন, কিন্তু বড্ড দেরিতে। এটা আরো আগে শুরু করা উচিত ছিল, অনেক আগে। কিন্তু আমরা বুঝতে দেরি করে ফেললাম, যদিও অধিকাংশই এখনো বুঝতে রাজী নন। যারা বুঝেছেন তাদের সংখ্যা খুবই স্বল্প। যদি আগে থেকে আমাদের সবাই বুঝতেন তাহলে বর্তমান সময়ে একুশে বইমেলায় ইসলামি স্টল বসায় বাঁধা বিপত্তি দেয়ার স্পর্ধা কেউ দেখাতে পারতোনা। কিন্তু তারা স্পর্ধা দেখায়, আমরাই সেই সুযোগ তাদের দিয়েছি।
এখনো পরিবর্তন সম্ভব যদি তরুণ ক্বওমীয়ানরা এগিয়ে আসে। যদি তারা দলে দলে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হাতে কলম তুলে নেয়, তাহলেই সম্ভব।

পরিশেষে এটাই বলতে চাই। হে তরুণ! হে নবারুণ! চলো, ওঠো! হাতে কলম তুলো এবং লেগে যাও নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় । ফুটিয়ে তুলো নিজের লেখাকে সাহিত্যের ছোঁয়া দিয়ে, শব্দের শাহাজাদী দিয়ে। প্রস্তুত করো নিজেকে একজন কলম সৈনিক হিসেবে । বাতিলের সাথে নেমে পড়ো কলম যুদ্ধে এবং ছিনিয়ে আনো আমাদের সেই ঐতিহ্য, সেই খ্যাতি। ছিনিয়ে আনো ঐতিহাসিক বিজয়। বাংলা সাহিত্যে আমরা ঘটাতে হবে বিপ্লব। হ্যাঁ আমরাই একদিন ঘটাবো নতুন বিপ্লব।

লেখক- শিক্ষার্থী- জামিয়া দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া, বি-বাড়ীয়া।

-এটি

ad