190159

দিন শেষের সত্য কথা: আমাদের কোনো মিডিয়া নেই

মুফতি এনায়েতুল্লাহ।।

দেশে করোনার প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর আলেম-উলামা বিশেষ করে কওমি ঘরানার আলেমরা মিডিয়া দ্বারা নানাভাবে নিগৃহের শিকার হচ্ছেন। করোনার কারণে ঘোষিত গণছুটিতে মসজিদে জামাত-জুমা বন্ধ, তারাবিতে মুসল্লির সংখ্যা সীমিতকরণসহ করোনায় আক্রান্তের লাশ কবর দেওয়া হবে না জ্বালিয়ে দেওয়া হবে-এই বিতর্কের মাঝে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দেশবরেণ্য ইসলামি আলোচক মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারীর জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি এবং এরপর কথিত একটি টেলিটেপ ফাঁস ও করোনায় মৃতদের দাফনকারী প্রতিষ্ঠান আল মারকাজুল ইসলামীকে জড়িয়ে মনগড়া রিপোর্ট করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ের এসব বিতর্কে যৌক্তিক কোনো বিষয় উপস্থাপিত হয়নি। যেমন ধরুন করোনায় মৃতদের লাশ দাফন করা হবে না পুড়িয়ে ফেলতে হবে- সংক্রান্ত আলোচনায় উপস্থাপিকা ও একজন সাংবাদিক আলোচক লাশ পোড়ানোর পক্ষে বলছেন। অন্যদিকে ওই আলোচনায় একজন চিকিৎসক বলছেন কবর দেওয়ার কথা।

পরবর্তী সময়ে কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা লাশ কবর দেওয়াকে বেশি নিরাপদ বলেই অভিমত দিয়েছেন। তাই বলা চলে তাদের আলোচনা রিপোর্টগুলো মোটেও তথ্যানুসন্ধানী ছিল না। অনেকটা গায়ের জোড় খাটিয়ে আলোচনায় আনা হয়েছে।
আগেও নানা সময়ে নানাভাবে মিডিয়া দ্বারা আক্রান্ত হতে দেখা গেছে আলেম-উলামাদের।

তাদের মধ্যে বিভিন্ন দল-উপদল থাকায় কারও ওপর মিডিয়া আক্রমণ শানালে তিনি কোন গ্রুপের, কোন মতের, কোন আদর্শের এসব ভেবে সম্মিলিতভাবে কখনও প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি।

আলেমদের বিভক্তিকে পুঁজি করে এক শ্রেণির সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী ও টক শো’র আলোচক সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে প্রায়ই আলেমদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। আলেমদের বিষোদগার, তাদের বিরুদ্ধে ইনিয়ে-বিনিয়ে সংবাদ, সংবাদ ভাষ্য, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, আলোচনা ও পর্যালোচনার নামে রুচিহীন, আক্রমণাত্মক, অসত্য ও অশালীন প্রতিবেদন ও নিবন্ধ প্রকাশ ও প্রচার হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো- এসবের ঘটনায় সৃষ্ট ক্ষোভ প্রশমনে প্রোপাগান্ডাকারীরা সেভাবে এগিয়ে আসেননি। আলেম-উলামারাও উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিবাদ করেননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছুটা প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কিছু হয়নি। কয়েকদিন থেমে আবারও তাদের পুরোনো চরিত্রে ফিরতে দেখা গেছে।

অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল, অনলাইন মিডিয়া, ইউটিউব চ্যানেল, কমিউনিটি রেডিওসহ গণযোগাযোগ ও তথ্য প্রবাহের গতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো মাধ্যমই আলেমদের আস্থায় আসতে পারেননি। আলেমরাও সেভাবে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করতে পারেননি।

অনেকটা গা ছাড়া ভাবের কারণে আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে বারবার। যদিও সংখ্যা বিবেচনায় আলেম-উলামা, মসজিদ-মাদরাসার সংখ্যা কম নয়, রাজনীতি, সমাজসেবায় আলেমরা পিছিয়ে নন। তারপরও তাদের প্রতি এমন বিমাতাসুলভ আচরণের হেতু খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

অপ্রতিরোধ্য গণমাধ্যম জগতে আলেম-উলামাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। অথচ মিডিয়া বিশ্বকে ধাবিত করছে প্রচণ্ডগতিতে। রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে শুরু করে স্নায়ুযুদ্ধ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ, অস্ত্রযুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন সাধনের ক্ষেত্রে মিডিয়া অপরিহার্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

আমাদের আলেমরা মিডিয়ার এই গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন কি না- সেটা গবেষণার দাবি রাখে। এই আলোকে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আলেমদের সামাজিক কাজের অবদান, রাজনৈতিক ভূমিকা, শিক্ষার প্রসার, মানবসেবা, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ আর কতকাল মনুষ্য দৃষ্টির আড়ালে রাখা হবে? সমাজের বসবাসকারী অন্য দশজন মানুষের মতো, অন্য সংগঠনগুলোর মতো, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো সমানভাবে দেশ ও দশের সেবার পরও তাদের দাবিয়ে রাখা হবে? এখানে এককভাবে কি মিডিয়া দায়ী? না আলেমদেরও কিছুটা দায় আছে? আমি দ্বিতীয় দিকটি নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

প্রথম কথা হলো- মিডিয়া হচ্ছে আধুনিক প্রচার মাধ্যমের অন্যতম বাহন। তাই বর্তমান সময়ে কোনো রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও সম্প্রদায়ের জন্য সংবাদমাধ্যমকে গুরুত্ব না দেওয়ার অর্থ হলো- এসব দল, সংগঠন কিংবা সম্প্রদায়ের অস্তিত্বহীনতার ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া। জনমত গঠন থেকে শুরু করে নিজেদের পথ চলায় মানুষকে সহযোগী করতে, কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য অর্জনে এগিয়ে যাওয়ার পথে সাধারণ জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে মিডিয়া একটি শক্তিশালী মাধ্যম- এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। জনসাধারণের সঙ্গে কর্মীদের তুলনায় যোগাযোগ স্থাপনের কাজ মিডিয়ার মাধ্যমে করা সম্ভব। এটা নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই।

সুতরাং মিডিয়া এড়িয়ে চলার অর্থ হলো- নিজেদের ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। আর এই জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিণাম কখনোই শুভকর কিছু নয়। এটা অন্তত আলেম-উলামাদের থেকে অন্যরা আর কেউ সেভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। নানা ইস্যুতে গত এক দশকে যেভাবে আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে আলেম-উলামাদের, তাতে চরমভাবে অক্ষম অনেক আলেমকেও আক্ষেপ নিয়ে বলতে শুনেছি, আহ! আজ যদি আমাদের একটা পত্রিকা থাকত! এই যে আক্ষেপ, এটা ঘোচানোর পরিকল্পনা কি নেতৃস্থানীয় আলেমদের আছে?

দ্বিধা ছাড়াই বলে যায়, না, নেই। কেন নেই, এর উত্তরে নানা মুনি নানা মত দেবেন। বিবিধ শঙ্কা আর উদ্বেগের কথা বলবেন। কিন্তু দিন শেষে এটাই চরম সত্য কথা, আমাদের কোনো মিডিয়া নেই। আমরা কোনো মিডিয়া গড়ার স্বপ্ন দেখি না।

একটি উদাহরণ দিই। সমাজে প্রভাববিস্তারকারী আলেম-উলামা, ইমাম-খতিব ও বক্তাদের নিয়ে ইদানীংকালে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক সংবাদ লেখা হচ্ছে। এর বিপরীতে কিন্তু সেভাবে কাউকে নিয়ে ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশন করা হয়নি। এর সরল অর্থ, আমি পচে গেছি, কিংবা এই পচা সমাজে ভালো মানুষ কেনো থাকবে?

এখন আলেমদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কোনটা চান। আলেমদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদ যে কেবলমাত্র অনলাইনে সীমাবদ্ধ তা নয়, শীর্ষস্থানীয় কোনো কোনো দৈনিক, প্রভাবসৃষ্টিকারী টেলিভিশন স্টেশনগুলোও প্রচার করেছে ফলাও করে। আগেও বলেছি, আলেমদের পক্ষ থেকে এর তেমন জোরালো কোনো প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে দেখা যায়নি। তবে, আলেমদের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন।

আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখনও বিকল্প মিডিয়া হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সুতরাং এই পার্থক্যটা বুঝতে হবে। সেটা অবশ্য ভিন্ন আলোচনা।

লেখক: মুফতি এনায়েতুল্লাহ, সাংবাদিক

-ওআই/আবদুল্লাহ তামিম

ad