187045

মাদরাসার বাস দুর্ঘটনা: তদন্ত কমিটি গঠনের আভাস বেফাকের

রকিব মুহাম্মদ ।।

নাটোরে শিক্ষা সফর শেষে ফেরার পথে বাস দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে চার কিশোর তালিবে ইলম। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে প্রায় অর্ধ শতাধিক শিক্ষার্থী। এদের সকলেই রাজধানীর বেগুনবাড়ী জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার ছাত্র।

নিহতের মধ্যে ময়মনসিংহের ইয়াসিন আরাফাত (১৫) ও ইলিয়াস হুসাইন শরহে বেকায়া জামাতের ছাত্র ছিল এবং ফেনি জেলার খালেদ মাহমুদ (২২) হেদায়াতুন্নাহু জামাতে ও নেত্রকোনা জেলার ইমরান হুসাইন (১৬) তাইসির জামাতে পড়তো।

তাদের মৃত্যুতে শোকে কাতর সোশ্যাল মিডিয়া। আহতদের দেখতে হাসপাতালে গিয়েছেন বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ও রাজনৈতিক দলের নেতারা। এ ঘটনায় শোক জানিয়েছেন কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার ও আল হাইয়াতুল উলইয়া লিলজামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

এদিকে কওমি মাদরাসার কেন্দ্রীয় পরীক্ষা সামনে রেখে ঢাকার বাইরে শিক্ষা সফরের যৌক্তিকতা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রীবহন, বাস চালকের বেপরোয়া মনোভাব, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অপরিকল্পিত আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। নিহতদের স্বজনদের পক্ষ থেকেও সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আসছে একাধিক অভিযোগ।

দুর্ঘটনায় নিহত খালেদ মাহমুদের মামা মোহাম্মদ মুহসিন মাশকুর আওয়ার ইসলামকে বলেন, ‘পুরো শিক্ষা সফরটাই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। অপ্রাসঙ্গিক একটা সময়ে শিক্ষা সফর, ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত ছাত্র নিয়ে সফর করাটা অযৌক্তিক। এছাড়াও এতদূরের একটা জায়গায় গিয়ে আবার রাতারাতি ফেরার প্লানটা একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। কারণ, যে গাড়িটা চালাবে সেও তো মানুষ। ৩০০-৩৫০ কিলোমিটার সফর করে ফেরার জন্য যথেষ্ঠ প্রস্তুতিরও একটা ব্যাপার থাকে। গোটা সফরটাই ছিল অনিয়মে ভরপুর।’

তিনি বলেন, ‘মাদরাসাগুলোতে যেসব ঘটনা ঘটে এ বিষয়ে কারও কোনো মাধাব্যথা নেই। যেন আমাদের কোন বিচার নাই, আমাদের সিদ্ধান্তগুলো প্রশ্নাতীত। আমাদের সিদ্ধান্তগুলো রিভিউযোগ্য কিনা- খালিদদের ঘটনা কিন্তু আমাদের একটা প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দেয়। দায়িত্বশীলদের কাছে আমাদের দাবি থাকবে কেউ যদি ভুল কোনও সিদ্ধান্ত নেয় তাকে প্রশ্ন করা হোক। মাদরাসাগুলোও প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়, এই ট্যাবুটা ভাঙার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হোক। ’

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা সফর বিষয়ক নীতিমালা প্রণয়নের দাবিয়ে জানিয়ে খালিদের মামা বলেন, ‘কওমি মাদরাসা-আলিয়া মাদরাসা, স্কুল-কলেজসহ সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর শিক্ষা সফর করা হচ্ছে। যানবাহন, সড়ক ও প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনায় প্রাণ হারাচ্ছে শত শত শিক্ষার্থীরা। সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে, তারা যেন একটা নীতিমালা প্রণয়ন করে দেয়, শিক্ষা সফর থেকে যেন কোন খালেদকে লাশ হয়ে ফিরতে না হয়।’

এদিকে বেগুনবাড়ী মাদরাসার দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের আভাস দিলেন বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার মহাপরিচারক মাওলানা জুবায়ের আহমদ চৌধুরী। তিনি জানান, ‘আগামী ২২ তারিখ বেফাকের বৈঠক ডাকা হয়েছে। দুর্ঘটনা ও তদন্ত কমিটি গঠন করার বিষয়টি ওই বৈঠকে উত্থাপন করা হবে।’

পরীক্ষা সামনে রেখে শিক্ষা সফরের বিষয়ে মাদরাসার মুহতামিমকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে কিনা জানতে চাইলে বেফাক মহাপরিচালক বলেন, ‘সামনে বেফাক ও হাইয়ার কেন্দ্রীয় পরীক্ষা। ছেলেরা এখন পড়ালেখায় ব্যস্ত থাকবে। এ মুহুর্তে শিক্ষাসফর আয়োজনের বিষয়টা আমার বোধগম্য নয়।’

‘এটি একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অপরিকল্পিত কাজ। ভালো ইন্তেজাম না করে বাচ্চাদেরকে নিয়ে এভাবে শিক্ষা সফরে যাওয়ার ব্যাপারে বেফাক কর্তৃপক্ষ কোন সার্কুলেশন দেয়নি। ২২ তারিখের মিটিং-এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। কমিটি মনে করলে তদন্ত করতে পারে। তবে এটার কোন ফায়দা আছে বলে মনে হয় না; আমাদের লাগামহীন চলাফেরা এটা হলো মারাত্মক।’ যোগ করেন মাওলানা যুবায়ের আহমদ চৌধুরী।

নিহতদের স্বজনদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কী বলছে – তা জানার জন্য বেগুনবাড়ী জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার শিক্ষক মুফতি মুজিবুর রহমান চাঁটগামীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

উল্লেখ্য, শনিবার রাজধানীর বেগুনবাড়ী জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার পক্ষ থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে বার্ষিক শিক্ষা সফরে নাটোর যায় কর্তৃপক্ষ। রোববার সফর শেষে ঢাকা ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের কাশেম মোড়ে সিরাজগঞ্জের নলকা নামক স্থানে রাত ২ টায় ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলেই ২ জন এবং অপর ২ জন হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। এছাড়াও ছাত্র-শিক্ষকসহ ৩৭ জন গুরুতরভাবে আহত হয়।

আরএম/

 

ad