1255

কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা : একটি পর্যালোচনা

অধ্যক্ষ মাওলানা মিযান বিন আযীয : ‘শিক্ষা’ মানুষের জন্য। মানুষ সম্পর্কে প্রাথমিক ন্যূনতম মূল্যায়ন ছাড়া কোনো শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব। কওমি মাদরাসার মূল্যায়ন হচ্ছে, মানুষ জীবজন্তু নয়। অতএব জীবের বৃত্তিস¤পন্ন ভোগী মানুষ তৈরি শিক্ষার লক্ষ্য হতে পারে না।

ইসলাম যেহেতু মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব গণ্য করে এবং মানুষ আল্লাহর খলিফা হিসাবেই ইহলৌকিক জগতে হাজির, অতএব প্রতিটি মানুষের এমন কিছু আধ্যাত্মিক বা দিব্যগুণ রয়েছে যার বিকাশ ঘটানোই শিক্ষার কাজ।

এটা অনস্বীকার্য যে, সমাজে বৃত্তিমূলক দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন আছে। যাকে আমরা সাধারণভাবে বলি সমাজে কিছু করে খাওয়ার শিক্ষা। কওমি মাদরাসা সামাজিক মানুষের এই চাহিদাকে মোটেও অস্বীকার করে না, কিন্তু মাদরাসার দায়িত্ব নয় কলকারখানা অফিস আদালতের জন্য শিক্ষার নামে শ্রমিক সরবরাহ করবার কারখানা চালানো। অথচ আধুনিক বা পুঁজিবাদী শিক্ষার এটাই প্রধান উদ্দেশ্য।

ইসলামি তালিমের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সাচ্চা মানুষ তৈরি করা; যার মধ্যে সর্বোচ্চ নৈতিক গুণাবলীর সন্নিবেশ ঘটবে। এই নৈতিকতার আদর্শ হচ্ছে নবীজীর অনুসৃত সুন্নাহ। এই দিক থেকে মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিকীকরণ কথাটার কোনো অর্থ হয় না। কারণ আধুনিক শিক্ষার ধারণা ও উদ্দেশ্য আর শিক্ষা সম্পর্কে কওমি মাদরাসার ধারণা ও উদ্দেশ্যের মধ্যে ফারাক আকাশ-পাতাল।

আধুনিক শিক্ষা মানুষকে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার গোলামে পরিণত করে। শুধু শ্রমিক তৈরি হবার দিক থেকে নয়, মানুষকে নীতি-নৈতিকতাবর্জিত ভোগী হিশাবে তৈরি না করলে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না। নীতি-নৈতিকতার চর্চা ও শিক্ষার্থীর মধ্যে তার বিকাশের প্রতি সবিশেষ মনোযোগ না দিলে কওমি মাদরাসা শিক্ষার বৈশিষ্ট্য কিছুই বোঝা যাবে না। কেন মাদরাসা শিক্ষার মধ্যে ‘আনুগত্য’, ‘আদব’ ও অন্যান্য সামাজিক-পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যবহারিক গুরুত্ব এত বেশি- এর মর্মও বোঝা যাবে না।

এই হলো কওমি মাদরাসা-শিক্ষার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। কিছু করে খাওয়ার জন্য শিক্ষার দরকার আছে অবশ্যই। কিন্তু বর্তমানে এটাকেই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হিশাবে পর্যবসিত করার চেষ্টা চলছে যা পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য। শিক্ষার অর্থ কিছু করে খাওয়ার শিক্ষা- কওমি মাদরাসা তা মানতে অস্বীকার করে এবং তাকে চ্যালেঞ্জ করেই কওমি মাদরাসা টিকে থাকে। মানুষ জীবমাত্র নয়। মানুষের এমন কিছু আধ্যাত্মিক বা দিব্যগুণ রয়েছে যার বিকাশ ঘটানোই শিক্ষার প্রধান কাজ।

সেপ্টেম্বর-এগারোয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইনটাওয়ার ও পেন্টাগনে হামলার পর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে অনন্ত যুদ্ধ শুরু হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই সেই সময়ের মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কন্ডোলিসা রাইস পাকিস্তানের কওমি মাদরাসাগুলোকে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের টার্গেট বানিয়েছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন যুদ্ধনীতি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ইকোনমিক্স টাইমস তাদের এক অনলাইন রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, মার্কিনিরা সামরিক ঘাটি থেকে যুদ্ধ পরিচালনাকে এখন সম্প্রসারিত করছে কওমি মাদরাসার ওপর। তাদের বিশেষ লক্ষ্য কওমি মাদরাসার কারিকুলাম বা পাঠ্যসূচি। মাদরাসায় যা পড়ানো হয় তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বদলে দিতে চায়।

বাংলাদেশের আলেমগণ কওমি মাদরাসা শিক্ষার সংস্কার চান না তা নয়, অবশ্যই চান। প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় সংস্কার হয়েছেও। সেটা হয়েছে ইসলামি তালিম সম্পর্কে তাদের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রেখে।

‘আধুনিক’ বা ‘যুগোপযোগী’ করার নামে মাদরাসার পাঠ্যক্রম বদলে দেওয়া এবং কওমি মাদরাসার আদর্শের পরিপন্থি শিক্ষাসূচি চাপিয়ে দেওয়া সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মাদরাসা শিক্ষার পাঠ্যসূচি বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ভূমিকা রাখতে চায়, সেটাও কন্ডোলিসা রাইস রীতিমতো ঘোষণা করেই জানিয়েছেন।

তার বয়ান হচ্ছে, ‘যে নৈরাশ্য থেকে সন্ত্রাসবাদের জন্ম হয় সেই সন্ত্রাস টেকে না যদি জগতে আশার সঞ্চার করা যায়। সেই আশার সঞ্চার করতেই মাদরাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রম বদলাতে হবে। সে কারণে মাদরাসার ছাত্রদের কেবল ‘কিছু করে খাওয়ার’ ব্যবহারিক শিক্ষা দিতে হবে।’

কন্ডোলিসার দাবি, কওমি মাদরাসার ছাত্ররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ঘৃণা করতে শেখে। ব্যবহারিক বা বৃত্তিমুলক শিক্ষা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ঘৃণা করতে শেখাবে না। ঘৃণার পরিবর্তে তাদের শেখানো হবে বৃত্তিমূলক শিক্ষা, বিভিন্নক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন। যেন তারা পুঁজিবাদের গোলাম হয়ে সাম্রাজ্যবাদের সেবা করে যেতে পারে। সূত্র : ইকোনমিক্স টাইমস)-

আমার মনে হয় সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী, মন্ত্রী-আমলা ও রাজনীতিবিদের কওমি শিক্ষার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ উসকে দেয়ার প্রধান কারণ এখানেই নিহিত।

লেখক : গবেষক

ad